লাভোরাঁ’র হিমঅ্যামিবোমা


শীর্ষছবি: আমাদের রক্তের লোহিত রক্ত কনিকার (লাল) মধ্যে ম্যালেরিয়ার পরজীবি Plasmodium falciparum (হাই পাওয়ার ম্যাগনিফিকেশনে); যে ছয়টি ম্যালেরিয়ার পরজীবি মানুষের ম্যালারিয়ার কারন তার মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়ানক।  লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে ঢুকে এরা হিমোগ্লোবিনকে খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে এবং বংশবৃদ্ধি করে।একসময় কোয়ের পর্দা ছিড়ে বের হয়ে আসে অন্য লোহিত রক্ত কনিকাকে আক্রমন করতে। (ছবি: Lennart Nilsson/ National Geographics)

“…With tears and toiling breath,
I find thy cunning seeds,
O million-murdering Death.”
(fragment of poem by Ronald Ross, written in August 1897, following his discovery of malaria parasites in anopheline mosquitoes fed on malaria-infected patients)

 His writings are a model of clarity and completeness: every sentence is precise and unambiguous. His manner was like his writing – to the point, exact and decisive. He was regarded with affection and admiration by all who came into contact with him. Ronald Ross  in Laveran’s obituary (1923).

আমার কিছু কথা: যারা বিজ্ঞানের ইতিহাস ভালোবাসেন, তারা হয়তো আমার মতই কোন কিছুর সম্বন্ধে পড়তে গেলে, তার ইতিহাসটা জানতে তীব্র একটা আগ্রহ বোধ করেন। ম্যালেরিয়ার রোগের কারন যে পরজীবি, সেটির সম্বন্ধে আমি প্রথম পড়ি মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে, এরপর যখন চিকিৎসা অনুজীব বিজ্ঞানে পড়েছি তখন আরো একবার। সহস্র বছর ধরে মানুষের পরিচিত এই রোগটির জীবানু যিনি খুজে পেয়েছিলেন তার সম্বন্ধে জানার একটা বাড়তি কৌতুহল ছিল। ছাত্র ছাত্রীদের মাইক্রোবায়োলজী টিউটোরিয়ালে বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা নেবার সময় আমি মাঝে মাঝেই জানতে চাইতাম, তারা কি জানে ম্যালেরিয়ার এই পরজীবিটাকে কে প্রথম খুজে পেয়েছিলেন; অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর তাদের না জানলেও কোন ক্ষতি নেই; আমার ব্যক্তিগত ইন্টারেষ্ট থেকেই শুধু বলতাম। তবে ম্যালেরিয়ার একটা আবিষ্কার মোটামুটি সবারই পরিচিত, সেটা হলো স্যার রোনাল্ড রস এর, যিনি ম্যালেরিয়ার জীবানুর বিস্তারের সাথে মশার সম্পর্কটি খুজে বের করেছিলেন। কিন্তু রসের আবিষ্কারের প্রায় দুই দশক আগেই কিন্তু এই পরজীবি প্রোটোজোয়াটা আবিষ্কার করেছিলেন ফরাসী চিকিৎসক শার্লে লুই আলফোঁস লাভোরাঁ, আর এই আবিষ্কারের সাথেই প্যারাসাইটোলোজীর একটা বড় অংশ প্রোটোজুয়োলজীর বিশাল ক্ষেত্রটি উন্মোচিত হয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে এত বড় আবিষ্কার করার পরও, তাকে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রাম করতে হয়েছে বহুদিন, এমনকি নিজের দেয়া প্রথম নামটাও প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি নানা কারনে। ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পেলেও বহুদিন  ছিলেন গবেষনা থেকে দুরে। অভিমান করে সামরিক বাহিনীর চাকরী ছাড়ার পর পরই, সেই প্রথম আবিষ্কারের প্রায় ২৭ বছর পর মনের মত করে স্বাধীনভাবে গবেষনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন, সেই সময়টাতে তিনি আরো কিছু পরজীবি প্রোটোজোয়া নিয়ে অসাধারন কিছু কাজ করেন। তার কাজের সুফল আমরা এখনো পাচ্ছি। ব্যক্তিজীবনে ভীষন নীতিবান এই দেশপ্রেমী মানুষটি নোবেল পুরষ্কারের প্রায় পুরো টাকা খরচ করেছিলেন পাস্তুর ইনস্টিটিউটের একটি ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ল্যাবরেটরী বানাতে।  নীচের লেখাটায় আমি ম্যালেরিয়ার  ইতিহাসের কিছু মাইলস্টোনও ছোবার চেষ্টা করেছি আলাফোঁস লাভোরাঁর জীবনের প্রেক্ষাপটে।

Continue reading “লাভোরাঁ’র হিমঅ্যামিবোমা”

লাভোরাঁ’র হিমঅ্যামিবোমা

একটি অসাধারণ বইয়ের ছোট কাহিনি

শীর্ষছবি: চার্লস ডারউইনের On the Origin of Species  এর প্রথম সংস্করণ।( সুত্র:  ইন্টারনেট)

I am infinitely pleased & proud at the appearance of my child. Charles Darwin
(When Darwin first saw the finished volume, bound in green cloth) 

বিজ্ঞানের ইতিহাসের বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি হলো চার্লস ডারউইনের লেখা  On the Origin of Species বইটি; ১৮৫৯ সালে ২৪ নভেম্বর বইটি প্রকাশ করেছিলেন লন্ডনের প্রকাশক জন মারে। নীচের লেখাটি  এই বইটির প্রকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে। জীববিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের প্রায় সব শাখায়, ১৫২ বছর আগে প্রকাশিত এই বইটির প্রভাব বলার অপেক্ষা রাখেনা।

Continue reading “একটি অসাধারণ বইয়ের ছোট কাহিনি”

একটি অসাধারণ বইয়ের ছোট কাহিনি

প্রজেক্ট ৫২৩ এবং ম্যালেরিয়ার নেমেসিস


শীর্ষ ছবি: তু ইয়ুইয়ু  (ছবি: Simon Griffiths, New Scientist, November 2011)

It is scientists’ responsibility to continue fighting for the healthcare of all humans. What I have done was what I should have done as a return for the education provided by my country. Tu Youyou

মুল:  তু ইয়ুইয়ুর সাথে নিউ সায়েন্টিষ্ট এর সাংবাদিক ফিল ম্যাককেনার একটি সাক্ষাৎকার এবং ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত তথ্য অবলম্বনে।

২০১১ সালের আগ পর্যন্ত তু ইয়ুইয়ু ( Tu youyou) ছিলেন মুলত‍ঃ অপরিচিত একটি মানুষ তার স্বদেশ এবং বিদেশে। এতো বড় একটা আবিষ্কারের পরও কয়েক দশক ধরে অন্তরালেই ছিলেন এই চীনা ফার্মাকোলজিষ্ট; অথচ যার আবিষ্কার প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মানুষের জীবন বাচিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা হিসাবে। ২০০৫ এ যুক্তরাষ্ট্রের দুই ম্যালেরিয়া গবেষক তাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্ঠায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন, বর্তমানে ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধ, আর্টিমিসিনিন এর আবিষ্কারক কে ছিলেন। তাদের মাধ্যমেই অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসেন এই নিবেদিত প্রাণ চীনা গবেষক, তু ইয়ুইয়ু। আশি বছর বয়স্ক, তু ইয়ুইয়ু এখনও কাজ করছেন, বর্তমানে চায়না অ্যাকাডেমী  অব চাইনীজ মেডিকেল রিসার্চ এর চীফ সায়েন্টিষ্ট এবং ডক্টরাল স্টুডেন্টদের টিউটর ‍হিসাবে। চীনা অ্যাকাডেমিক মহলে তু ইয়ুইয়ু পরিচিত Professor of three none’s বা তিনটি না‘র অধ্যাপক হিসাবে, তার নেই কোন স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী ( ১৯৭৯ র আগে চীনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর প্রচলন ছিল না),  নেই কোন দেশের বাইরে কোন গবেষনা বা পড়াশোনা করার অভিজ্ঞতা ( তার সময়ে কম্যুনিষ্ট চীন মুলত: বিচ্ছিন্নই ছিল সারা বিশ্ব থেকে) এবং তিনি কোন প্রফেশনাল চাইনীজ অ্যাকাডেমীর সদস্য নন। এ বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে  Lasker~DeBakey Clinical Medical Research Award এ সন্মানিত করা হয় তাকে।

Continue reading “প্রজেক্ট ৫২৩ এবং ম্যালেরিয়ার নেমেসিস”

প্রজেক্ট ৫২৩ এবং ম্যালেরিয়ার নেমেসিস

ভালোবাসা, নিউরোবায়োলজী কি বলে….

শীর্ষ ছবি: গবেষণায় দেখা গেছে রোমান্টিক ভালোবাসা এবং মায়ের ভালোবাসা ব্রেনের বেশ কিছু একই অংশগুলোকে সক্রিয় করে; নিউরোবায়োলজিষ্টদের ধারনা মানুষের মধ্যে জুটি বাধা বা পেয়ার বন্ডিং  মা এবং তার সন্তানের সম্পর্ক বা ম্যাটেরনাল বন্ডিং এর ব্রেন মেকানিজম বা স্নায়বিক প্রক্রিয়াটিকে সামান্য কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভবত বিবর্তিত হয়েছে। (ইলাসট্রেশন:  জি বেকার,  সুত্র: Love: Neuroscience reveals all. Nature. 457(8 January 2009)

There is always some madness in love. But there is always some reason in madness. Friedrich Nietzsche

মুল:  Semir Zeki,The neurobiology of love; Federation of European Biochemical Societies (FEBS) Letters 581 (2007) এবং  Larry J. Young : Love, Neuroscience reveals all. Nature, 457(8): January 2009;  এছাড়া ব্যবহৃত বাড়তি তথ্য সুত্র (ডায়াগ্রাম এবং কিছু বিশ্লেষণ): Andreas Bartels, Semir Zeki: The neural basis of romantic love (NeuroReport:2000;vol 11(17):3829, Andreas Bartels, Semir Zeki: The neural correlates of maternal and romantic love;NeuroImage; 2004(21):1155; Larry J Young, Zuoxin Wang, The neurobiology of pair bonding. Nature Neuroscience (2004): 7(10):1048 ;

ভূমিকার আগে: রোমান্টিক ভালোবাসা এবং মায়ের ভালোবাসা নিঃসন্দেহে অসাধারন সুখকর আর রিওয়ার্ডিং একটি অভিজ্ঞতা। এই দুটোই প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সে কারনেই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ কিছু  বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়ার সাথে এরা ঘনিষ্টভাবে জড়িত;  অথচ এই আচরনগুলোর স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের গবেষনা অপেক্ষাকৃত নবীন। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত কিছু অগ্রগতি, যেমন: fMRI(ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স ইমেজিং) এ ক্ষেত্রে গবেষনার একটি নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছিল ৯০ এর দশকের শুরুতে। নতুন এই ব্রেন ইমেজিং টেকনিকগুলো নিউরোবায়োলজিষ্টদের কোন সাবজেক্টিভ (ব্যাক্তি নির্ভর) অনুভুতির সরাসরি স্নায়বিক পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে, যেমন: রোমান্টিক এবং মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রে। ৯০ দশকের শেষের দিকে ডঃ জেকি ও তার সহযোগীরা আমাদের ব্রেনে রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলো খোজার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে তার গবেষনায়ে যুক্ত হয় সন্তানের প্রতি মার ভালোবাসার নিউরোবায়োলজিক্যাল ভিত্তি । দেখা যায় এই দুই ধরনের গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক আমাদের ব্রেনের কিছু বিশেষ এলাকা স্বতন্ত্র ভাবে সক্রিয় বা অ্যাক্টিভেট করে। আবার ওভারল্যাপিংও হয়, যেমন ব্রেনের কিছু কিছু এলাকা এই দুই ভালোবাসার ক্ষেত্রেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যে এলাকা গুলো আমাদের ব্রেনের রিওয়ার্ড মেকানিজমের সাথে জড়িত। এখানে আমাদের ব্রেনের গুরুত্বপুর্ণ  দুটি রাসায়নিক পদার্থ বা নিউরো হরমোন অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিনের রিসেপ্টরের (রিসেপ্টর হলো কোষের ঝিল্লীতে থাকা একটি অনু, যার সাথে নির্দিষ্ট কোন রাসায়নিক অনু যুক্ত হতে পারে) বাহুল্যও থাকে এখানে। এই গবেষনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো যখন এই দুই ধরনের ভালোবাসা ব্রেনের কিছু অংশকে সক্রিয় করে, এরা তার সাথে ব্রেনের কিছু অংশকেও নিষ্ক্রিয় বা ডি অ্যাক্টিভেট করে: সেই অংশগুলো আমাদের নেতিবাচক আবেগের সাথে জড়িত, এছাড়াও আছে সামাজিক জাজমেন্ট এবং মেন্টালাইজিং ( অর্থাৎ অন্য মানুষদের ইনটেনশন বা উদ্দেশ্য এবং ইমোশন সম্বন্ধে আমাদের নিজেদের মেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট) প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রনকারী কিছু অংশ। নিউরোবায়োলজিষ্টরা মনে করেন এই মানুষের সম্পর্ক বা অ্যাটাচমেন্টগুলো সৃষ্টিতে এধরনের একটা পুশ-পুল মেকানিজম কাজ করে, যে নেটওয়ার্কগুলো আমাদের ব্রেনে অন্যমানুষ সম্বন্ধে ক্রিটিক্যাল সামাজিক অ্যাসেসমেন্ট এবং নেগেটিভ ইমোশন সৃষ্টি করে, সেটাকে নিষ্ক্রিয় বা নিয়ন্ত্রনে এনে সামাজিক  দুরত্বকে অতিক্রম করতে সহায়তা করে, যা বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে তৈরী করে বন্ধন ব্রেনের রিওয়ার্ড সার্কিট্রিকে ব্যবহার করে। এই নিউরোবায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়াগুলো ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, কাউকে প্রেরণা দেবার ক্ষেত্রে বা তীব্র সুখের অনুভুতি দিতে ভালোবাসার অসীম শক্তিকে।

Continue reading “ভালোবাসা, নিউরোবায়োলজী কি বলে….”

ভালোবাসা, নিউরোবায়োলজী কি বলে….