অ্যাটেনবরো’র মাদার ফিশ: যৌন সঙ্গম ও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিবর্তনের উষালগ্ন


শীর্ষ ছবি: শিল্পীর চোখে Materpiscis attenboroughi (Attenborough’s Mother Fish); সুত্র:   John A long et al. Live birth in the Devonian period (Vol 453|29 May 2008| doi: 10.1038/ nature06966); (  Illustration by B. Choo)

মুল: John Albert Long এর The dawn of the deed ( ‍Scientific American, January 2011);  বাড়তি তথ্য সুত্র:  John A long et al. Live birth in the Devonian period (Vol 453|29 May 2008| doi: 10.1038/ nature06966); Devonian arthrodire embryos and the origin of internal fertilization in vertebrates (Vol 457 |2 6 February 2009| doi: 10.1038/ nature07732); Per Ahlberg et al. Pelvic claspers confirm chondrichthyan-like internal fertilization in arthrodires (Vol 460| 13 August 2009| doi: 10.1038/nature08176);  কাজী মাহবুব হাসান: আমাদের এই প্রাচীন  শরীর ;

অষ্ট্রেলিয়ার প্যালিওন্টোলজিষ্ট জন অ্যালবার্ট লং মাছের বিবর্তন নিয়ে গবেষনা করছেন বহু বছর ধরে। ফসিল বা জীবাশ্ম মাছ এবং উত্তর-পশ্চিম অষ্টেলিয়ার বিখ্যাত জীবাশ্ম ক্ষেত্র ডেভোনিয়ান পিরিয়ডের ( Devonian Period) গোগো ফরমেশন এর তিনি একজন বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ। মাছের বিবর্তন সম্বন্ধে জীববিজ্ঞানীদের ধারনার বেশ কিছু মৌলিক অবদান এসেছে তারই গবেষনা থেকে;  যেমন: Gogonasu‍s এবং Materpiscis ; মাছ থেকে টেট্রাপডদের বিবর্তনের ক্ষেত্রে Gogonasu‍s ফসিলটি এবং মেরুদন্ডী প্রানীদের প্রজনন প্রক্রিয়ার বিবর্তন প্রক্রিয়া বুঝতে Materpiscis  মুল ভূমিকা রেখেছে।  সর্বমোট ১৮ বই লিখেছেন তিনি; ২০১০ এ প্রকাশিত হয়েছে তার সর্বশেষ বই The Rise of the Fishes ( John Hopkins University Press) এর দ্বিতীয় সংস্করণ। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লস এন্জেলেস কাউন্টির মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির রিসার্চ এবং কালেকশনের ভাইস চেয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। এই লেখাটি তিনি লিখেছিলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের এর জানুয়ারী ২০১১ সংখ্যায়।

ভূমিকার পরিবর্তে: বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে ইন্টারনাল ফার্টিলাইজেশন (Internal Fertilization) বা আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ ( যখন কোন পুরুষ প্রানীর পুংজননকোষ বা স্পার্ম স্ত্রী প্রানীর শরীরের অভ্যন্তরে স্ত্রীজননকোষ বা ডিম্বানুর সাথে মিলিত হয় নিষিক্ত করার লক্ষ্যে) প্রক্রিয়াটির আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগে; হাঙ্গর এবং তাদের সমগোত্রীয় কিছু মাছের প্রজাতির মধ্যে। কিন্তু প্রায় গত একদশকে বেশ কিছু মাছের জীবাশ্মর আবিষ্কার এবং গবেষনা  ইঙ্গিত করছে যে, কপুলেশন বা সঙ্গম (( জীববিজ্ঞানে কপুলেশন শব্দটি ব্যবহৃত হয় সাধারনত: মানুষ নয় এমন প্রানীদের যৌন সঙ্গমকে ব্যাখ্যা করতে, যে প্রক্রিয়ায় পুরুষপ্রানী শরীর থেকে জননকোষ বা স্পার্ম স্ত্রী প্রানীর শরীরে ভিতরে অবস্থিত নিষিক্ত হবার ‍অপেক্ষায় থাকা ডিম্বানুর কাছে পৌছে দেয়া হয়)  এবং জন্ম হবার আগ পর্যন্ত্ ভ্রুনকে মা প্রানীর শরীরে বহন করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল আরো প্রাচীন একটি মাছের গ্রুপে এবং আরো অনেক মিলিয়ন বছর আগেই। এই আবিষ্কার আমাদের নিজেদের জনানঙ্গ সহ বেশ কিছু আভ্যান্তরীন অঙ্গগুলোর বিবর্তন প্রক্রিয়ার বিষয়টিকেও আলোকিত করেছে।

গোগো স্টেশনে একদিন:

২০০৫ সালে আগষ্ট মাসের এক গরম শুষ্ক দিনে গোগো স্টেশনের লম্বা ঘাসে ভরা ঘোড়া চরানোর জন্যএকটা ঘেরা মাঠে অষ্ট্রেলিয়ার জীবাশ্মবিদ জন অ্যালবার্ট লং তার টিম নিয়ে বের হয়েছিলেন মাছের ফসিল সন্ধানে; গোগো স্টেশন,উত্তর পশ্চিম অষ্ট্রেলিয়ার ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত একটি  বিশাল গবাদীপশুর খামার। বর্তমানে এই শুষ্ক জায়গাটি কোন জলজ প্রানীর বসবাসের জন্য আদৌ উপযোগী না,কিন্তু প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন বছর আগে,লেট ডেভোনিয়ান পিরিয়ডে এই জায়গাটা ঢাকা ছিলো একটি অগভীর সমুদ্রে এবং গোগোতে ছিল সুবিশাল একটি ট্রপিক্যাল রীফ,যেখানে বসবাস করতো অসংখ্য প্রজাতির আদিম মাছ সহ নানা ধরনের সামুদ্রিক প্রানীরা। সৌভাগ্যক্রমে,এই সব প্রানী শরীরের অনেক অবশিষ্ঠাংশ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের পরেও এখনও টিকে আছে এখানে। কাটাযুক্ত স্পাইনিফেক্সদের  ঝোপ আর চুপ চাপ শুয়ে থাকা ডেথ অ্যাডার সাপের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেসবলের চেয়ে একটু বড় আকারের লাইম স্টোনের নডিউল-যাদের উৎপত্তি হয়েছে স্থানীয় শেলের (Shale) এর বহু মিলিয়নের বছরের ইরোশোন বা ক্ষয়ের মাধ্যমে। এদের কোন কোনটির মধ্যে পাওয়া যায় প্রাচীন মাছের জীবাশ্ম, যারা বহু মিলিয়ন বছর আগে এই আদিম রিফে একসময় বসবাস করতো। সাধারনত:এই শুকনো মাটিতে ফসিল মাছের সন্ধানে অভিযানে তাদের দিন কাটাতে হয় কাঙ্গিত ফসিলের গুপ্তধনের সন্ধানে, এই সব লাইম স্টোন নডিউলগুলো ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখে।

সেই সময় গোগো রিফের যে মাছের গোত্রটিকে সবচেয়ে বেশী দেখা যেত,তারা হলো মাথায় আর কাধে বর্মে মত হাড়ের প্লেটে ঢাকা প্লাকোডার্ম  (Placoderm বা plated skin)গ্রুপের মাছ। এরা একেবারে শুরুর দিকে আদি চোয়াল সহ মেরুদন্ডী প্রানীদের একটি গ্রুপ, যাদের আবির্ভাব হয়েছিল সিলুরিয়ান পিরিওডের শুরুর ‍দিকে, এবং ডেভোনিয়ান পর্বেই এদের ব্যপক বিস্তৃতি হয় অনেকগুলো প্রজাতিতে। যদিও আজ তাদের কোন অস্তিত্ব নেই কিন্ত এই প্লাকোডার্মরা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে প্রায় ৭০ মিলিয়ন বছর ধরে,তাদের সেই সময়ে তারাই ছিল সবচেয়ে সফলতম মেরুদন্ডী প্রানী। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে বিতর্ক করে আসছেন, অন্য মেরুদন্ডী প্রানীদের সাথে এই প্ল্যাকোডার্মরা আসলে ঠিক কিভাবে সম্পর্কযুক্ত। জন লং এর টিমের গোগোতে এই অভিযান প্রথমতঃ সেই প্ল্যাকোডার্মদের ফসিলের খোজে, যা এই প্রশ্নটি এবং মাছের বিবর্তন নিয়ে ‍বিজ্ঞানীদের আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

ঐ বিশেষ দিনটিতে লং ও তার সহযোগীরা তাদের দিনভর প্রচেষ্ঠার পুরষ্কার হিসাবে খুজে পেয়েছিলেন একটি লাইমস্টোন নডিউল,যার ভিতরে জীবাশ্ম হয়ে আছে প্রায় পুরো একটি মাছের শরীর। প্রথম দেখাতে যদিও সেদিন ফসিল মাছটির অ্যানাটমিতে এমন কোন বিশেষ বৈশিষ্ট লং চোখে পড়েনি বরং মনে হয়েছে আরো একটি প্ল্যাকোডার্মের ফসিল তার সংগ্রহে যোগ হলো, পরবর্তীতে ল্যাবে নিয়ে একে এই লাইমস্টোনের সমাধি থেকে মুক্ত করে ভালো করে স্টাডি করতে হবে। সেদিন কিন্তু লং ভাবতেই পারেননি, যে তাদের খুজে পাওয়া এই সাধারন একটি ফসিল, মেরুদন্ডী প্রানীদের জীববিজ্ঞানের খুবই অন্তরঙ্গ একটি বিষয় – যৌন সঙ্গম এবং আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ারে উৎপত্তি – সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের বহুদিনের ধারনা আমুল বদলে দেবে।

এ পর্যন্ত গবেষকদের দীর্ঘদিনের ধারনা ছিল,ইন্টারনাল ফার্টিলাইজেশন বা আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ এবং শিশুর জন্ম পর্যন্ত ভ্রুনকে মা’র শরীরের ভিতর লালন করার এই দুটি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষায়িত প্রজনন প্রক্রিয়া, যার প্রথম উৎপত্তি হয়েছিল হাঙ্গর এবং তাদের সমগোত্রীয় প্রজাতিগুলোর মধ্যে (যে গ্রুপের নাম  Chondrichthian বা কনড্রাইখথিয়ান) মোটামুটি প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগে; কনড্রাইখথিয়ান গ্রুপের প্রথম প্রানীর বিবর্তনের প্রায় ৭০ মিলিয়ন বছর পর। এই সময়ের আগে, ধারনা করা হতো মাছের প্রজনন সীমাবদ্ধ ছিল বা স্পনিং  (Spawning) বা পানির মধ্যে ডিম্বানু আর শুক্রানু ছড়িয়ে বা কোন নির্দিষ্ট স্থানে জমা করার মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াটা স্পষ্টতই একটি নৈব্যাক্তিক প্রক্রিয়া, যেখানে ডিম্বানু ও শুক্রানু তৈরীকারী স্ত্রী ও পুরুষ সদস্য সরাসরি জড়িত থাকে না। একজন স্ত্রী প্রানী পানিতে ডিম্বানু বা ডিম  ছেড়ে দেয় বা কোথাও জমা করে রাখে, পরে পুরুষ সদস্যরা তাদের শুক্রানু ‍ত্যাগ করে সেই ডিম্বানুগুলোকে নিষিক্ত করে এবং ভ্রুণের বিকাশ প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হয় শরীরের বাইরে। কিন্তু ২০০৫ সালে খুজে পাওয়া সেই মাছের ফসিলটি এবং গোগো সহ পৃথিবীর অন্য স্থানে পাওয়া অন্যান্য আরো প্ল্যাকোডার্ম প্রজাতির মাছের উপর গবেষনার সাম্প্রতিক ফলাফল বলছে,সঙ্গম বা কপুলেশন এবং জীবন্ত শিশুকে প্রসব করা এই অন্তরঙ্গ জীববিজ্ঞানীয় প্রক্রিয়াটির উৎপত্তি হয়েছে , বিজ্ঞানীদের আগের ধারনাকৃত সময় থেকে আরো অনেক মিলিয়ন বছর আগেই । এবং কনড্রাইখথিয়ানদের চেয়েও প্রাচীন একটি মেরুদন্ডী প্রানীদের গ্রুপে প্রক্রিয়াটি প্রথম আবির্ভুত হয়েছিল।


যৌন সঙ্গমের উৎপত্তি:বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মাছের গ্রুপ প্ল্যাকোডার্মরা বেচে ছিল আজ থেকে প্রায় ৩৭৫ মিলিয়ন বছর আগে লেট ডেভোনিয়ান পর্বে । মেরুদন্ডী প্রানী হিসাবে তারাই প্রথম স্পনিং বা ডিম পানিতে ত্যাগ করে শরীরের বাইরে তা নিষিক্ত এবং ভ্রুন বিকাশ করার প্রচলিত প্রজনন প্রক্রিয়ার বদলে,  সঙ্গম এবং আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরন ও শরীরের অভ্যন্তরে ভ্রুনের বিকাশ সহ সন্তান প্রসব করার প্রজনন প্রক্রিয়ার সুচনা করেছিল। যদিও এভাবে প্রজননকারী প্রানীদের স্পনিং এর মাধ্যমে প্রজনন করা প্রানীদের অপেক্ষায় সন্তান সংখ্যা অনেক কম,কিন্তু তাদের প্রসব করা শিশুরা ছিল আকারে বড় এবং বৈরী পরিবেশে অনেক কষ্টসহিষ্ণু। এই প্রক্রিয়াকে প্রজননের কৌশল হিসাবে বেছে নেয়াটা এদের বেচে থাকার সংগ্রামে দিয়েছিল একটি বাড়তি বিবর্তনীয় সুবিধা,কারন সেই সময়ের ডেভোনিয়ার সমুদ্রে শিকারী মাছের কোন কমতি ছিলনা।  (সুত্র: Illustration by Peter Trusler; January 2011, Scientific American)

এমনিতেই অবাক না হওয়াটাই কঠিন,বিশেষ করে যখন কোন গুরুত্বপুর্ণ বৈশিষ্ট যে সময়ে উদ্ভব হয়েছিল বলে ধারনা করা হতো, পরবর্তীতে নতুন গবেষনায় তা সেই সময়ের আরো অনেক আগেই বিবর্তিত হয়েছিল বলে সুস্পষ্ট প্রমান মেলে। কিন্তু এই গবেষনাগুলোয় প্রাপ্ত ফলাফলের গুরুত্ব যখন শুধুমাত্র মামুলী বিস্ময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তীতে আরো সুস্পষ্ট প্রমান মেলে যে,এই প্ল্যাকোডার্মরা যে লিনিয়েজ থেকে চার হাত-পা বা লিম্ব ( Limb) সম্বলিত প্রানীদের (যেমন টেট্রাপড,মানুষ সহ) উদ্ভব হয়েছে, সেই আদি বংশধারার সাথে সরাসরি সম্পুক্ত। এজন্যই আদি প্ল্যাকোডার্মদের যৌন অঙ্গ প্রত্যঙ্গর গঠন ও অবস্থান পর্যবেক্ষন করলে আমরা নিজেদের প্রজনন তন্ত্রের ও শরীরের অন্যান্য কিছু অংশের আদিমতম অবিকশিত রুপ বা রুডিমেন্ট দেখতে পাই। এবং সময়ের সাথে এই অ্যানাটমি পরিবর্তিত হয়ে কেমন করে বর্তমান রুপ পেয়েছে সে সম্বন্ধেও স্পষ্ট  একটি ধারনাও পাই। প্ল্যাকোডার্মদের জোড়া পেলভিক ফিনগুলো যা এদের পুরুষ সদস্যদেরকে সহায়তা করে স্ত্রী সদস্যদের শরীরের ভিতরে শুক্রানু স্থানান্তর করার জন্য,সেটাই কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে  হয়েছে টেট্রাপডদের জননাঙ্গ এবং পা। আর চোয়াল বা জ (Jaw) যা মুলত:প্রথমে বিবর্তিত হযেছিল এ‌ইসব পুরুষ মাছদের সঙ্গমের সময় স্ত্রী মাছদের ধরে স্থির রাখার জন্য,শুধুমাত্র পরবর্তীতে তা বিবর্তনের চাপে দায়িত্ব নিয়েছে খাদ্য প্রক্রিয়াকরনের (যেমন, কাটা,চাবানো ইত্যাদি); মনে হচ্ছে , যৌন সঙ্গম, আসলেই সব কিছু বদলে দিয়েছিল।


অষ্ট্রেলিয়ায় প্রাপ্ত  একটি প্ল্যাকোডার্ম ফসিল Austrophyllolepis ; দেখা যাচ্ছে যে পুরুষদের পেলভিক গার্ডল বা শ্রোণীচক্র থেকে মাংস ঢাকার একটি বর্ধিত অঙ্গ ছিল,যার নাম ক্ল্যাসপার;এরা এই দুটি ক্ল্যাসপারকে পালাক্রমে স্ত্রী মাছের শরীরে প্রবেশ করাতো শুক্রানুকে স্ত্রী শরীরের ভিতর থাকা ডিম্বানুগুলোকে নিষিক্ত করার লক্ষ্যে স্থানান্তর করার উদ্দেশ্যে। (সুত্র: Illustration by Peter Trusler; January 2011, Scientific American)

মা মাছের সন্ধানে:

গোগোর ফসিলগুলো বিশেষভাবে বিখ্যাত কারন, এখানে পাওয়া ফসিলগুলো খুবই ভালোভাবে সংরক্ষিত। এছাড়া  অন্য বেশীর ভাগ মাছের ফসিলগুলো, যারা সাধারণত:চ্যাপ্টা হয়ে থাকে,গোগোর ফসিলগুলো কিন্ত‍ু অন্যরকম। এখানে প্রায়ই ফসিল মাছগুলোর ত্রিমাত্রিকভাবে তাদের আদিম আকৃতিতে সংরক্ষিত থাকে।  লাইমস্টোনের নডিউলের মধ্যে প্রস্তরীভুত হয়ে থাকা মাছের কঙ্কালটা পুরোপরি আলাদা করাটা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।  মাছের কঙ্কালকে অক্ষত অবস্থায় মুক্ত করতে প্রথমে ধীরে ধীরে লাইমস্টোনের ম্যাট্রিক্সটাকে দ্রবীভুত করতে হবে খুব হালকা মাত্রার ভিনেগার বা অ্যাসেটিক অ্যাসিড ব্যবহার করে। ২০০৫ এর আগস্টে সেই উষ্ণদিনে লং এর টীমের পাওয়া সেই ফসিলকে পুরোপুরি পরিষ্কার করা সম্ভব হয় নভেম্বর ২০০৭ সালে। ফসিল মাছটির সুগঠিত শক্ত চোয়াল আর খাওয়া চাবানোর জন্য দাত থেকে লং এবং তার প্রধান সহযোগী কেট ট্রিনায়স্টিক (এখন অষ্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত),প্রায় ম্যাকারেল মাছের মত আকারের এই ফসিল মাছটিকে প্ল্যাকোডার্মদের অন্তর্গত টিক্টোডনটিড (Ptyctodontid) পরিবারের একটি প্রজাতি হিসাবে ‍চিহ্নিত করেন। আমরা যে টিক্টোডনটিডদের একটি প্রজাতির প্রায় অক্ষত ফনিল পেয়েছি, শুধু এই ব্যাপারটাই কিন্তু বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল যথেষ্ঠ সুখবর। কারন টিক্টোডনটিড গ্রুপ সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল এমনিতেই কম এবং লং এর টীমের খুজে পাওয়া ফসিলটা দেখে মনে হচ্ছিল সম্ভবত এটি টিক্টোডনটিডদের একটি নতুন প্রজাতি। কিন্তু লং এর আরো কিছু আবিষ্কার কিছুদিনের মধ্যেই এই ফসিল মাছটিকে আরো বেশী গুরুত্বপুর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসলো।

ফসিলের পাথুরে কাঠামো থেকে  আরো একটু বেশী লাইমস্টোন সরানো হলে মাইক্রোস্কোপের নীচে মাছের ফসিলটির লেজের গোড়ার দিকে অদ্ভুত কিছু স্ট্রাকচার বা গঠন লং এর চোখে পড়লো, বিশেষ সেই  কাঠামোগুলো আরো ভালো করে  দেখার জন্য যখন তিনি উচ্চ ক্ষমতার মাইক্রোস্কোপের নীচে রাখলেন, লং তখন দেখতে পেলেন, খুব ছোট আকারের একটি চোয়াল,আর তারপাশে ছড়ানো ছিটানো খুবই ছোট ছোট কিছু হাড়। তখনই ব্যাপারটা দিনের আলোর মত স্পষ্ট হলো তার কাছে, এবং তিনিও সেই তথাকথিত বিশেষ ইউরেকা মুহুর্ত অনুভব করলেন, যা ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়ে অনেক বিজ্ঞানী তাদের সারা জীবনে হয়তো একবারই অনুভব করেন। গঠনগুলোর কাঠামোতে আলাদা কোন কিছু না থাকলে, লং হয়তো স্বাভাবিক ক্ষেত্রে এই হাড়গুলোকে দেখে ধরে নিতেন,এগুলো হয়তো এই প্রাচীন মাছটির গ্রহন করা শেষ খাদ্যর কোন অবশেষ। কিন্ত ছোট সেই চোয়ালটির কিছু প্রধান বৈশিষ্ট বড় মাছটির চোয়ালের মত হুবুহু একই রকম,তাছাড়া ছোট চোয়ালটি ছিল অক্ষত, এমনকি এখনও আংশিকভাবে সংযুক্ত। সমস্ত চিহ্ন বলছে এই মিনিয়েচার চোয়ালের হাড়গুলো ছিলো এই মাছটির ভিতর বাড়তে থাকা কোন ভ্রুণের,অবশ্যই তার খাদ্য না। এছাড়াও লং আরো যেটা দেখতে পেয়েছিলেন তা হলো প্যাচানো সুতার মতো একটা জিনিস যা ছোটো এই হাড়গুলোর চারপাশে একে জড়িয়ে আছে। স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ নীচে রেখে লং খুব দ্রুতই এই জিনিসটিকে শনাক্ত করতে পারলেন, মিনেরালাইজড হয়ে যাওয়া নাড়ী বা আম্বিলিক্যাল কর্ড হিসাবে,যা ভ্রুনকে ইয়োক স্যাক থেকে পুষ্টি যোগান দিত।  ব্যাপারটা অবশেষে স্পষ্ট হয়ে গেল,লং এর টীম ২০০৫ সালের সেই দিনটিকে একটি ৩৭৫ মিলিয়ন বছর প্রাচীন একটি অন্তসত্ত্বা মা মাছ এবং  সেই সাথে সবচেয়ে প্রাচীনতম মেরুদন্ডী প্রানীর ভ্রুণ খুজে পেয়েছিলো। লং  তার সহযোগীরা  এই নতুন প্রজাতির মাছের নাম রাখেন Materpiscis atteboroughi  যার অর্থ অ্যাটেনবোরো’র মা মাছ, বিবিসি প্রকৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানের নির্মাতা উপস্থাপক এবং ন্যাচারালিস্ট ডেভিড অ্যাটেনবরো’র সন্মানে,যিনি তার ১৯৭৯ সালে নির্মিত ধারাবাহিক প্রামান্যচিত্র  life on Earth এ প্রথম বারের মতো অষ্ট্রেলিয়ার গোগো ফসিল সাইটকে সারা পৃথিবীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।


ছবি: Materpiscis attenboroughi এর হলোটাইপ। সাদা বক্স এরিয়ার মধ্যেই আছে ভ্রুণটি। (সুত্র: Long et al. Vol 453|29 May 2008| doi:10.1038/nature06966)

উপরের ছবিটির আংশিক স্কীমাটিক ডায়াগ্রাম (ভ্রুনের অবস্থার দেখানো হয়েছে) ( সুত্র: http://scienceblogs.com/pharyngula/2008/05/29/ materpiscis_lg.jpg)


উপরের ছবির সাদা বক্স এলাকাটার ক্লোজ আপ। পাশে স্কীমাটিক আউটলাইন। ( umb:  আম্বিলিক্যাল কর্ড); ফসিল হয়ে যাওয়া প্রাচীন Materpiscis মাছের পেটে ভ্রুণ; ছবিতে ভ্রুণের ছোট ছোট হাড় এবং আম্বিলিক্যাল কর্ড বা নাড়ী দেখা যাচ্ছে। এটাই প্রথম পাওয়া সবচে প্রাচীন কোন প্রানীর ফসিল, যারা সঙ্গম এবং সন্তান প্রসব করতো।(সুত্র: Long et al. Vol 453|29 May 2008| doi:10.1038/nature06966)

বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মা: Materpiscis attenboroughi ; প্ল্যাকোডার্ম এই ফসিলটি, ম্যাটারপিসিসকে পাওয়া গেছে শরীরের অভ্যন্তরে ভ্রুণসহ। যা প্রমান করে এই মাছগুলো তাদের পুর্বপুরুষদের মতো শরীরের বাইরে ডিম না পেড়ে, শরীরের ভিতর তাদের ডিম্বানু নিষিক্ত করাতো এবং ভ্রুন বিকশিত হবার পর তাদের সন্তান প্রসব করতো । সুত্র: illustration by Jen Christiansen (Materpiscis);  Long et al. Vol 453|29 May 2008| doi:10.1038/nature06966) 

অবশেষে Materpiscis  টিক্টোডনটিড সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ দিনের রহস্যর সমাধান করে। ১৯৩০ এর শেষের দিকে স্কটল্যান্ডে খুজে পাওয়া টিক্টোডনটিডদের একটি পুরুষ সদস্যদের ফসিলে ব্রিটিশ অ্যানাটোমিস্ট ডি.এম.এস.ওয়াটসন প্রথম দেখেছিলেন,এসব মাছগুলোর পেলভিক ফিনকে সাপোর্ট দেয়া পেলভিস বা শ্রোণীচক্র থেকে তরুণাস্থির একটি দীর্ঘ বর্ধিতাংশ বের হয়ে আসে। জীবিত থাকাকালীন এই তরুনাস্থির বর্ধিতাংশ হয়তো মাংশ এবং চামড়ায় ঢাকা থাকত এবং অঙ্গ তৈরী করতো অনেকটা একজোড়া ক্ল্যাসপারের মত, যা বর্তমানে জীবিত সকল  কন্ড্রাইখথিয়ান গ্রুপের মাছদের পুরুষ সদস্যদের থাকে। যারা এদের যে কোন একটাকে সঙ্গমের সময় স্ত্রী সদস্যের ভিতরে প্রবেশ করায় শুক্রানুদের স্থানান্তর করতে। কিন্তু স্কটিশ টিকটোডন্টিড ফসিলটির এই ক্ল্যাসপারগুলো ঢাকা হাড়ের প্লেটে,অর্থাৎ এরা শক্ত,অনমনীয় ও দেখতেও ভালো ছিলনা। এছাড়াও যদিও সব কন্ড্রাইখথিয়ানদের ক্ল্যাসপারের মাথায় আশের মত দেখতে হুক থাকে যা সঙ্গমের সময় এদের ক্ল্যাসপারকে ঠিক জায়গামত ধরে রাখে, কিন্তু টিকটোডন্টিড সেই ফসিলটির ক্ষেত্রে এগুলো এতো বেশী সুস্পষ্ট, প্রকট ছিল যে,আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল যে তারা সঙ্গমে সহায়তা করার বদলে বেশী বাধার সৃষ্টি করতো।

ছবি: উপরে Incisoscutum ritchiei  এর ফসিল। নীচে  পেলভিক গার্ডলের ‍ স্কীমাটিক ড্রইং। পেলভিক ফিনের অংশ ব্যাসিটেরিজিয়ামের সাথে লাগানো থাকতো একটি কার্টিলেজ। সুত্র: ( সুত্র: Long et al, Vol 457|26 February 2009| doi:10.1038/nature07732)


ছবি: Austrophyllolepis ritchiei  এর ফসিল। পেলভিক গার্ডলের ‍ও পেলভিক ফিনের অংশ ব্যাসিটেরিজিয়ামের সাথে লাগানো থাকতো একটি কার্টিলেজ।( সুত্র: Long et al, Vol 457|26 February 2009| doi:10.1038/nature07732)


ছবি: হাঙ্গরদের পেলভিক বোন ও ক্ল্যাসপারের সাথে প্ল্যাকোডার্মদের তুলনামুলক অ্যানাটোমি। (সুত্র: http://www.aussmc.org/documents/LongmediaFeb25.pdf)

পরবর্তীতে খুজে পাওয়া টিক্টোডনটিডদের আরো ফসিলেও একই বৈশিষ্ট চোখে পড়ে,যা বিজ্ঞানীদের আবারা ভাবায়,আসলে কি এই মাছগুলো তাদের এই অদ্ভুত ক্ল্যাসপারটা তাদের স্ত্রী সদস্যদের ভিতরে ঢোকাতো,নাকি এদের ব্যবহার করতো সঙ্গমের সময় জোড় বাধা বা সঙ্গীনি মাছকে ধরে রাখার জন্য;অথবা এগুলো সম্ভাব্য সঙ্গীনিদের আকর্ষন করার জন্য একধরনের সুচালো শারীরিক অলঙ্করণ। কিন্তু ঐ  সময় পর্যন্ত পাওয়া ফসিল রেকর্ড এর উপর ভিত্তি করে জীবাশ্মবিদদের পক্ষে নিশ্চিৎভাবে বলার কোন উপায় ছিলনা টিক্টোডনটিডরা সঙ্গম নাকি স্পনিং বা শরীরে বাইরে ডিম পাড়ার মাধ্যমে তাদের প্রজনন সম্পন্ন করতো। কিন্তু লং এর  খুজে পাওয়া এই মা মাছ আর তার ভ্রুন  সন্দেহাতীত ভাবেই  প্রমান করেছে, কমপক্ষে কিছু টিক্টোডনটিড প্রজাতির প্রজনন কৌশল ছিল, আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ এবং জীবিত সন্তান প্রসব।

Materpiscis সম্বন্ধে এই আবিষ্কার,  লং এবং তার সহযোগীদের জন্য আবারও গোগো থেকে তাদের খুজে পাওয়া টিক্টোডনটিডদের ফসিলগুলো আরো ভালো করে পর্যবেক্ষন করার জোরালো কারন হয়ে দাড়ায়। কারন  আরো সুক্ষ পর্যবেক্ষন করে তারা নিশ্চিৎ হতে চেয়েছিলেন এদের কোনটির মধ্যে এরকম ধরনের ভ্রুণের অস্তিত্ত্ব আগে তাদের চোখ এড়িয়ে গেছে কিনা?  যথারীতি তাদের অনুসন্ধানে তাদের খুজে পান একটি ফসিল, প্রায় ২০ বছর আগে লং এর খুজে পাওয়া এই ফসিলটি টিক্টোডনটিডদের অন্য একটি গ্রুপ Austroptyctodus এর একটি সদস্য মাছের। ‌প্রথম আবিষ্কৃত ভ্রুনটাকে রোসেটা স্টোন ধরে, অনেক উচুমাত্রার ম্যাগনিফিকেশনের নীচে ফসিলটিকে পরীক্ষা করতে গিয়ে লং স্পষ্ট কিছু বৈশিষ্ট শনাক্ত করলেন। যা অনেক আগে আমি ব্যাখ্যা করেছিলাম, সম্ভবত: খুলে যাওয়া মাছের স্কেল বা আশ হিসাবে, কিন্তু আসলে তারা কোন ভ্রুনের ছোট ছোট অস্থি। আমরা আরো একটি প্রাচীন মাকে খুজে পেলাম, যে তার জীবনের শ্রেষ্ট সময়ে মারা যায়  তিনটি ভ্রুণ তার গর্ভে নিয়ে।


Austroptyctodus gardineri ; আরো একটি প্রাচীন  মা মাছের ফসিল, এখানে তিনটি ভ্রুন আছে ( সুত্র:  Long et al. Vol 453|29 May 2008| doi:10.1038/nature06966) 

২০০৮ সালে লং এবং তার সহযোগীরা নেচার জার্নালে তাদের খুজে পাওয়া গর্ভবতী  টিক্টোডনটিডদের বিবরণ প্রকাশ করার পর তারা গোগো তে পাওয়া অন্য আরো প্ল্যাকোডার্মদের প্রজাতির ফসিলগুলো নিয়ে আবার গবেষনা শুরু করেন। তাদের গবেষনা সুস্পষ্টভাবে প্রমান করে যে,  টিক্টোডনটিডরা সঙ্গম এবং জীবিত সন্তান প্রসব করার মাধ্যমে তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতো। কিন্ত্‍ু এরা প্ল্যাকোডার্ম পরিবারের সাতটি গ্রুপের একটি মাত্র। তাহলে এই নতুন প্রজনন প্রক্রিয়া কেমন বিস্তার এবং প্রচলন ছিল?  লং ও তার সহযোগীরা নজর দিলেন প্ল্যাকোডার্মদের আরেকটি জেনাস Incisoscutum দের দিকে। যাদের আগেই শনাক্ত করা হয়েছিল,  পেটে কিছু ছোট মাছের হাড় মত কিছু জিনিস পাওয়া যাবার কারনে। এবং যথারীতি এই ফসিলটি এবং এই জেনাসের আরো একটি ফসিলেও তারা খুজে পেলেন ভ্রুণ এর অস্তিত্ব।


Incisoscutum ritchiei আরো একটি প্ল্যাকোডার্ম ফসিল স্পেসিমেন যার ভেতরেও পাওয়া গেছে ভ্রুণের ফসিল। সুত্র: Long et al; Vol 457|26 February 2009| doi:10.1038/nature07732

Incisoscutum হলো প্ল্যাকোডার্মদের সবচেয়ে বড় গ্রুপ Arthrodires  এর সদস্য। এই গ্রুপে এ পর্যন্ত্য ৩০০ র বেশী প্রজাতির সন্ধান মিলেছে; এবং এর মধ্যে আছে সবচেয়ে বড় আকারে প্ল্যাকোডার্ম প্রজাতিটি, ভীতিকর, প্রায় ৬ মিটার লম্বা Dunkleosteus;  লং এবং তার সহযোগীদের আবিষ্কারের আগে, কারোরই জানা ছিলনা, আর্থ্রোডিরদের পুরুষ আর স্ত্রী সদস্যদের মধ্যে বাইরের অ্যানোটোমিকাল কোন পার্থক্য আছে কিনা এবং তাদের প্রজনন প্রক্রিয়াটাই বা কেমন। লং এর টীমের খুজে পাওয়া ভ্রুণটি অস্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রমান করে Incisoscutum রা তাদের প্রজনন সম্পন্ন করে আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পরবর্তীতে গোগো এবং অন্য অনেক জায়গায় খুজে পাওয়া ফসিল পর্যবেক্ষন করে তারা প্রমান করতে সক্ষম হন আর্থ্রোডির পুরুষদেরও একজোড়া ক্ল্যাসপার ছিল, যা তাদের এধরনের (আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরণ) প্রজনন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতো। ২০০৯ সালে নেচার জার্নালে লং এর টীম ‍তাদের গবেষনার ফলাফল পকাশ করেন আরো দুটি রিপোর্টের মাধ্যমে। এভাবে প্রমানিত হয় প্ল্যাকোডার্মদের সাতটি প্রধান গ্রুপের অন্তত দুটি গ্রুপ, বিশেষ করে যে গ্রুপটা ছিল সবচে সফল, তাদের প্রজনন প্রক্রিয়ার কৌশল ছিল সঙ্গম এবং আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া; এবং এই পক্রিয়ার উদ্ভব হয়েছে  পরবর্তীতে হাঙ্গর এবং অন্যান্য কন্ড্রাইখথিয়ানদের এই প্রজনন কৌশল ব্যবহার করার প্রায় ২৫ মিলিয়ন বছর আগেই।

 সেক্সুয়াল রেভ্যুলুশন:

 গবেষনার বিভিন্ন পর্যবেক্ষনের আলোকে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্ল্যাকোডার্মরাই প্রথম অন্তরঙ্গ যৌন প্রজনন প্রক্রিয়া (সঙ্গম, ভ্যন্তরীন নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া, সন্তান প্রসব) শুরু করেছিল। এছাড়াও বর্তমানে একটা পরিষ্কার ধারনাও হয়েছে মেরুদন্ডী প্রানীদের পারিবারিক বৃক্ষে এদের অবস্থানটা ঠিক কোথায় হতে পারে। এর আগের প্রধান তত্ত্বটি ছিল, প্ল্যাকোডার্ম থেকে চোয়ালযুক্ত মেরুদন্ডী প্রানীদের জীবিত দুটি গ্রুপের একটি বিবর্তিত হয়েছে: হাঙ্গর এবং তাদের কন্ড্রাইখথিয়ান স্বগোত্রের অন্যান্যরা। কিন্তু নতুন এই আবিষ্কারগুলো এবং ২০০৯ সালে বার্লিন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মার্টিন ব্রাজোর আদি মেরুদন্ডী প্রানীদের বিবর্তন ভিত্তিক পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষনা প্রস্তাব করছে: প্ল্যাকোডার্মরাই আদি কন্ড্রাইখথিয়ান এবং বর্তমানে বিলুপ্ত এক ধরনের মাছ অ্যাকান্থোডিয়ান এর আদি পু্র্বপুরুষ হতে পারে। কিছু কিছু অ্যাকান্থোডিয়ান প্রজাতিকে প্রথম হাড় বিশিষ্ট মাছের পুর্বপুরুষ হিসাবে ভাবা হয়ে থাকে। যে লিনিয়েজ থেকে পরবর্তীতে মানুষ সহ, সব চতুষ্পদী প্রানীর আবির্ভাব হয়েছে।


 বিবর্তনীয় প্রাসঙ্গিকতায় পারিবারিক  বন্ধন: প্ল্যাকোডার্মরা আদি প্রানী হিসাবে সরাসরি অবস্থান করছে চার লিম্ব বা হাতপা বিশিষ্ট প্রানীদের ( যেমন: টেট্রাপড, মানুষ ) লিনিয়েজে বা বংশধারায়। যদিও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে প্ল্যাকোডার্মদের মধ্যে, হাড় বিশিষ্ট মাছরা বা বোনী ফিশ যারা এদের পরবর্তীতে এসেছে, তাদের বেশীর ভাগ আগের প্রজনন প্রক্রিয়া- ডিম পাড়া বা স্পনিং- এ ফিরে গেছে। হাড় বিশিষ্ট মাছ বা বোনী ফিশদের থেকে পরবর্তীতে চতুষ্পদীদের বিবর্তনের সাথে সাথে আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ারও চলন শুরু হয়, এমন পেলভিক বা কোমরের হাড়ের অ্যানাটোমি যা উত্তরাধিকার সুত্রে প্ল্যাকোডার্মদের থেকে পাওয়া ( ক্ল্যাসপার সহ, যা তারা সঙ্গমের সময় ব্যবহার করতো) পরবর্তীতে টেট্রাপডদের কোমর, পা এবং জননাঙ্গ বিবর্তনের মুলভিত্তি রচনা করে। ক্ল্যাসপারের পরিবর্তে টেট্রাপোডদের দুই লোব বিশিষ্ট জননাঙ্গ বিবর্তিত হয়, যেমন হেমিপেনেস এমন কি পেনিসও। উপরের ডায়াগ্রামে দেখানো হয়েছে প্রধান প্রধান মেরুদন্ডী প্রানীদের গ্রুপগুলোর মুল প্রজনন প্রক্রিয়া। (সুত্র: Illustration by Brown Bird Design, January 2011, Scientific American)

যৌন প্রজনন বলতে আমরা যা বুঝি ও জানি, তার উৎপত্তি সংক্রান্ত এই পুনসংশোধিত দৃশ্যপটটি অবশ্য কিছু গুরুত্বপুর্ন নতুন প্রশ্নের জন্মও দিয়েছে। লং ও তার সহযোগীরা এরপর নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন, এই যৌন সঙ্গম প্রক্রিয়াটির প্রজনন প্রক্রিয়ার কৌশল হিসাবে আবির্ভাব কিভাবে পরবর্তীতে মেরুদন্ডী প্রানীদের বিবর্তনের উপর প্রভাব ফেলেছিল। লং তার নিজের গ্রুপ এবং অন্য গবেষকদের তুলনামুলক অ্যানাটোমিক গবেষনা থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী আগেই সন্দেহ করেছিলেন টেট্রাপড পেছনের লিম্বগুলো ( পা) এবং জননাঙ্গ বিবর্তিত হয়েছে আদি মাছদের কোমরের পেলভিক গার্ডল ( ক্ল্যাসপার সহ) বা শ্রোনী চক্র থেকে। এই তত্ত্বটির সবচেয়ে জোরালো প্রমানটি এসেছে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্টিন জে কনের নেতৃত্বে বেশ কিছু গবেষনায়; ২০০৪ সালে কনের টীম দেখিয়েছে যে, Hoxd13 জিন, যা বর্তমানে জীবিত সকল চোয়ালযুক্ত মাছের  পেকটোরাল এবং পেলভিক ফিন তৈরীর সাথে সংশ্লিষ্ট, সেই একই জিন স্তন্যপায়ীদের হাত পা এবং জননাঙ্গ বিকাশের সময়ও সক্রিয় অংশগ্রহন করে, যা ইঙ্গিত করে আমাদের পা এবং যৌনাঙ্গ আদি মাছের পেলভিক গার্ডল থেকেই বিবর্তিত হয়েছে।

যদি নতুন গবেষনা প্রমান করে প্ল্যাকোডার্মরা আমাদের পু্র্বপুরুষ প্রানী ছিল,তাহলে স্পষ্টত ঐসব বৈশিষ্টও এসেছে এসব মাছের কাছ থেকে। ‍পরবর্তী লং ও তার সহযোগীরা খোজার চেষ্টা করলেন প্ল্যাকোডার্মদের থেকে আমরা আর অন্য কি অ্যানাটোমিক্যাল বৈশিষ্টি উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছি। বর্তমান সময়ের হাঙ্গর মাছদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এদের পুরুষ হাঙ্গররা তাদের সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গীনিকে প্রথমে নানা আচরনের মাধ্যমে মুগ্ধ করতে হয় বা কোর্টিং করতে হয়, সঙ্গম করার লক্ষ্যে জোড় বাধার আগে। যেমন হোয়াইট-টিপড রিফ পুরুষ হাঙ্গররা তাদের সঙ্গীনির মুগ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করে স্ত্রী হাঙ্গরের পিঠ, ঘাড়, তারপর তার পেক্টোরাল ফিনে কামড় দিয়ে, এইভাবে কামড়ে ধরার ব্যাপারটা পরবর্তীতে সঙ্গমের সময় তার সঙ্গীনিকে শক্ত করে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এরকম কিছু সঙ্গমপুর্ব আচরনগুলো পর্যবেক্ষন করে লং এবং তার সহযোগীরা ধারনা করছেন যে, হয়তো চোয়াল বা জ (jaw), খাদ্য প্রক্রিয়াকরন অর্থাৎ খাবার ছেড়া বা চেবানো বা জন্য বিবর্তিত হয়নি, যা অনেক বিজ্ঞানী এতদিন মনে করে আসছিলেন বরং প্রজনন সাফল্যর উন্নতির জন্যই সম্ভবত তাদের বিবর্তন হয়েছে। এ ধরনের একটি নতুনত্ব (আদি চোয়াল) ভিত্তি রচনা করেছিল পরবর্তীতে খাদ্য চেবানোর কাজে ব্যবহৃত হবার জন্য বিবর্তনীয় চাপের সফল প্রয়োগ ঘটাতে। যদিও বেশীর ভাগ হাড়বিশিষ্ট মাছ (বোনী ফিশ)  আবার পুরোনো প্রজনন প্রক্রিয়া স্পনিং বা ডিম পাড়ার কৌশলে ফিরে গেছে, সুতরাং চোয়াল ব্যবহার করার আর প্রয়োজন হয়নি প্রজননকালে, তারা আগে থেকেই তাদের পু্র্বপুরুষ প্ল্যাকোডার্মদের কল্যানে চর্বন প্রক্রিয়ায় পুর্বঅভিযোজিত ছিল ।(স্থলজ প্রানীদের মধ্যে আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া পুনর্বিবর্তিত হয় প্ল্যাকোডার্মদের থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া কোমরের পেলভিক-ফিন গার্ডল কাঠামোর উপর ভিত্তি করে, এই কৌশল স্থলজ প্রানীদের প্রজননের  প্রয়োজনে পানির কাছে ফিরে যাওয়া থেকে মুক্তি দেয়); আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া যে প্রথম উদ্ভব হয়েছিল প্ল্যাকোডার্মদের মধ্যে, হাঙ্গরদের মধ্যে না এবং প্ল্যাকোডার্মরা যে হাড়বিশিষ্ট মাছদের পু্র্বপুরুষ, এই তথ্যগুলো প্রাণীদের লিনিয়েজে যেখান থেকে মানুষ এসেছে সেখানে বিজ্ঞানীদের প্রথম বারের মতো পরীক্ষামুলকভাবে প্রাথমিক একটি যোগসুত্র তৈরী করার সুযোগ দিয়েছে সঙ্গম এবং  চর্বন প্রক্রিয়া বা চেবানোর মধ্যে।

 বিবর্তনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে, লং এবং তার সহযোগীদের যে বিষয়টা দৃষ্টি এড়ায়না  তা হলো, সঙ্গমের উৎপত্তির এই নতুন সময়কাল এবং আর্থ্রোডির প্রজাতির মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্রতার বিস্ফোরনের যোগসুত্র মেলানো সম্ভব- ফসিল রেকর্ডে চোয়াল যুক্ত মেরুদন্ডীদের মধ্যে এটাই প্রথম দেখা কোন প্রজাতির বড় ধরনের বৈচিত্রতার বিস্ফোরন যাকে বলা হয় স্পেসিস অ্যাডাপটিভ রেডিয়েশন (Adaptive radiation)। মেরুদন্ডী প্রানীদের স্পনিং থেকে আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরনের এই  কৌশল পরিবর্তন কি তবে এই বৃহৎ বিবর্তনীয় পরিবর্তনের মুল চালিকা শক্তি হতে পারে?  এ বিষয়ে গবেষনার খোজ করতে গিয়ে লং অন্য কিছু গবেষকদের গবেষনায় এই ধারনার সমর্থনে খুজে পেলেন গুরুত্বপুর্ন কিছু ক্লু । ২০০৪ সালে স্কটল্যান্ডের সেইন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শেন ওয়েব এবং তার সহযোগীরা রিপোর্ট করেন, গুডেইড নামের মাছের একটি গ্রুপ, যাদের বসবাস নেভাদা এবং  পশ্চিম-মধ্য  মেক্সিকোতে সাধারণত অগভীর পানির নদীতে; প্রায় ১৬.৮ মিলিয়ন বছর আগে পৃথক দুটি লিনিয়েজে ভাগ হয়ে গিয়েছিল এরা ।এদের একটি গ্রুপ পানিতে ডিম পাড়ার বা স্পনিং এর মাধ্যমে প্রজনন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে এবং এরা পরবর্তীতে বিভক্ত হয়েছে মাত্র ৪টি প্রজাতিতে। কিন্তু এদের আরেকটি গ্রুপ যাদের প্রজনন কৌশল হিসাবে তাদের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছিল একধরনের আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া, বর্তমানে এই গ্রুপটিতে আছে মোট ৩৬ টি প্রজাতি; এছাড়া Bythitoidei বা বাইথিটোয়াডেই নামের আরেক গ্রুপ মাছ,  যাদের তিনটি লিনিয়েজ আছে, সেখানেও একই প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। যে লিনিয়েজে আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া বিবর্তিত হয়েছে তাদের আছে ১০৭টি প্রজাতি, অপরদিকে অন্য যে দুটি লিনিয়েজ এখনও স্পনিং কে ধরে রেখেছে, তাদের একটিতে আছে ২২টি প্রজাতি, আরেকটিতে মাত্র ৩টি। দেখা যাচ্ছে যারা এই দুই গ্রুপের লিনিয়েজে যারা আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া কৌশল গ্রহন করেছে, স্পনিং গ্রুপ অপেক্ষা তাদের মধ্যে প্রজাতির বৈচিত্রতার সংখ্যাও বেশী এবং  এই বিষয়টা লং এবং ‍তার সহযোগীরা যে হাইপোথেসিসটি প্রস্তাব করেছেন তা সঠিক পথেই আছে সেটাই ইঙ্গিত করছে।

 আর্থ্রোডিরদের প্রজাতি রাডিয়েশনের মুল চালিকা শক্তি আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়া; প্রথম দৃষ্টিতে আমাদের এই প্রস্তাবটা মনে হতে পারে বিপরীতমুখী বা অসামন্জস্যপুর্ণ। তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, স্পনিং বা ডিম পাড়ার প্রক্রিয়ায় সাধারনতঃ হাজার হাজার ডিম পাড়া হয়, যা স্পষ্টতই আভ্যন্তরীর নিষিক্তকরন প্রক্রিয়ার চেয়ে আরো অনেক বেশী পরবর্তী প্রজন্ম তৈরী করবে আর জীবিত সন্তান প্রসবের প্রক্রিয়ায় যেখানে মা মাছকে প্রচুর পরিমানে শক্তি বিনিয়োগ করতে হয় প্রতিবার অল্প কয়েকটি সন্তানকে লালন করার জন্য। আর পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যা যত বেশী হবে তত বেশী সুযোগ থাকবে  জিনের সংমিশ্রন হবার যা পরবর্তীতে প্রজাতি উদ্ভবের সুচনা করতে পারে।  কিন্ত‍ু ডেভোনিয়ান পিরিওডের সেই সময় বেশীর ভাগ মাছের খাদ্যই ছিল অন্য মাছ, আর ডিম থেকে বের হওয়া ছোট, দুর্বল মাছের বাচ্চারা ছিল প্রথম এবং সহজতম শিকার। সুতরাং এরকম একটি পরিবেশে যে প্রজনন কৌশলের মাধ্যমে ‌কোন মা মাছ তার শরীরের ভেতরে অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যক সন্তানকে শারীরিক ভাবে বড় না হওয়া পর্যন্ত লালনপালন করে, তারাই তাদের সন্তানকে প্রজননক্ষম হওয়া পর্যন্ত বেচে থাকার একটা বাড়তি সুযোগ করে দেয়। সম্ভবত এটাই আর্থ্রোডিরদের একটা গুরুত্বপুর্ণ বিবর্তন সুবিধা দিয়েছিল সমসাময়িক অন্য কোন গ্রুপের তুলনায়।

উপসংহারের বদলে:

মেরুদন্ডী প্রানীদের আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরন প্রক্রিয়ার উৎপত্তি এবং এর বিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের ‍ উত্তর জানা বাকী। যেমন, বিজ্ঞানী এখনো জানেন না ঠিক কিভাবে প্ল্যাকোডার্মরা স্পনিং থেকে আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরন প্রক্রিয়ায় কৌশলকে গ্রহন করেছে তাদের প্রজনন কৌশল হিসাবে। যেহেতু বাস্তবে সেটা দেখা সম্ভব না, বিজ্ঞানীরা শুধু ধারনা করতে পারি প্রাচীন সামুদ্রিক পরিবেশে এই গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তনকে;  শুধুমাত্র মেকানিক্যাল দিক থেকে ব্যাপারটা দেখলে, হতে পারে এটা প্রথম শুরু হয়েছিল ডিম পাড়ার সময় পুরুষ ও  স্ত্রী মাছের পাশাপাশি আসার মাধ্যমে, হয়তো সেই আচরনের প্রধান লক্ষ্য ছিল, নিষিক্ত করনের বা ফার্টিলাইজেশন হারে সাফল্যের ক্ষেত্রে একটা উচু হার অর্জন করা অর্থাৎ বেশী পরিমান ডিমকে নিষিক্ত করা নিশ্চিৎ করা  কিংবা নিষিক্ত হয়ে ডিমগুলোকে দুজনে মিলে ভালোভাবে রক্ষা করা। হয়তো এর মাঝে কোন একটা অন্তবর্তীকালীন পর্যায় ছিল, যখন পানির মধ্যে ডিম পাড়ার করার বদলে পুরুষ বা স্ত্রী মাছ ডিমগুলো একসাথে বহন করা শুরু করেছিল, এখনও কিছু মাছ তা করে, যেমন সীহর্সরা, যারা একটা পাউচের মধ্যে ডিম রেখে তাদের প্রতিপালন করে।কিংবা হয়তোবা সুসংগঠিক পেলভিক ফিন ব্যবহার করে শুক্রানুদের ডিম্বানুদের কাছে সঠিক ভাবে পৌছে দেয়ার জন্য পুরুষ মাছদের স্ত্রী মাছদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। এই ব্যবস্থাটার উপর পরে হয়তো প্রাকৃতিক নির্বাচনী চাপ প্রয়োগ হয়েছিল আরো দীর্ঘ, লম্বা পেলভিক ফিন লোবের উদ্ভবের, যা পরবর্তীতে রুপান্তরিত হয় ক্ল্যাসপারে।

 কিন্তু প্রজনন প্রক্রিয়ার সময় স্নায়বিক যে ফ্যাক্টরটি, যা পুরুষ মাছদের তাদের পেলভিক ফিনের একটা অংশ স্ত্রী মাছের ভিতরে প্রবেশ করানোর তাড়না সৃষ্টি করে, হয়তো এই ডেসায়ার বা ইচ্ছাটা একটি প্রাকৃতিক নির্বাচনেরই একটি বাই প্রোডাক্ট, যা স্ত্রী মাছদের শরীরের বাইরে ডিম পাড়ার আগেই নিষিক্ত করার ব্যাপারে প্রাকৃতিক নির্বাচনী চাপ প্রয়োগ করেছিল, এবং এভাবে এই প্রক্রিয়াটা কোন একটি পুরুষ মাছের ডিম নিষিক্ত করার প্রতিযোগিতায় অন্য পুরুষদের হারানো সুযোগও বাড়িয়ে দেয়। রাসায়নিক এবং স্নায়বিক সংকেতগুলো  যা হাঙ্গর ও অন্যান্য মাছদের মেটিং বা সঙ্গমের জন্য জোড় বাধার আচরনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সে বিষয়গুলো নিয়ে আরো গবেষনা ভবিষ্যৎ আমাদের হয়তো আরো কিছু ধারনা দিতে পারে স্ত্রী ও পুরুষমাছের সঙ্গমের জন্য কাছাকাছি আসার প্রথম ধাপটা আসলে কেমন করে বিবর্তিত হয়েছে।

কিছু ভিডিও:

অ্যাটেনবরো’র মাদার ফিশ: যৌন সঙ্গম ও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিবর্তনের উষালগ্ন

2 thoughts on “অ্যাটেনবরো’র মাদার ফিশ: যৌন সঙ্গম ও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিবর্তনের উষালগ্ন

  1. সাংঘাতিক !! ….

    সত্যের প্রতি মানুষের বিশ্বাস জন্মাবে আশা করি…. অন্ধকারের পিছনে ছোটা আর কত কাল…..

    লেখা বরাবরের মতই অসাধারন…

    শুভকামনা চিরদিনের জন্য ….

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s