প্রাণীজগতে সমলিঙ্গ যৌন আচরণ এবং বিবর্তন:


শীর্ষছবি: লেসান অ্যালবাট্রস, পাখীদের মধ্যে যারা দীর্ঘমেয়াদী সমলিঙ্গ সম্পর্ক তৈরী করে। ছবিতে এ প্রজাতির জুটি বাধা দুটি স্ত্রী সদস্যকে দেখা যাচ্ছে। (সুত্র: TUI DE ROY/MINDEN/FLPA, New Scientist, December 2009)

শুরুর কথা: প্রাণীজগতের অসংখ্য গ্রুপে বিদ্যমান সমলিঙ্গ যৌন আচরনগুলো বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছিল বহুদিন আগেই এবং তা নিয়ে জীববিজ্ঞানীরা নতুন করে ভাবতে শরু করেছেন তাও বেশ অনেক দিন হলো। ব্যপকহারে বিস্তৃত এধরনের সমলিঙ্গ যৌন আচরনগুলো কি আসলেই বিবর্তনের একটি ধাধা, নাকি  প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি শক্তি যা বিবর্তনের পরিনতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম ? বিজ্ঞানীদের কাছে এই ক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্নটি হলো, কেনই বা তাহলে সমলিঙ্গ যৌন আচরন বিবর্তিত হবে, যখন স্পষ্টতই এটি বিবর্তনের মুল নীতির পরিপন্হী। কিন্তু আসলেই কি তাই? অনেক জীববিজ্ঞানী কিন্তু তা মনে করেন না, যেমন, রিভারসাইডে ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী মারলিন জুক (Marlene Zuk) এবং নাথান বেইলী (Nathan W. Bailey, তাদের মতে প্রাণীজগতে বিদ্যমান এধরনের আচরনের বিবর্তনীয় কিছু কারন আছে এবং যে সমস্ত প্রজাতিতে এর হার তুলনামুলকভাবে বেশী,প্রমান করা সম্ভব হয়েছে যে, তাদের বিবর্তনের ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরন বিবর্তনের অন্যতম একটি চালিকা শক্তি।

প্রাণীজগতে সমলিঙ্গ যৌন আচরনগুলোর বিষয়টি মিডিয়ার বিশেষ নজরে আসে ২০০৪ সালে, যখন নিউ ইয়র্ক সেন্ট্রাল জু‘তে জোড় বাধা দুটি পুরুষ চিনস্ট্র্যাপ পেইঙ্গুন (Chinstrap Penguin: Pygoscelis antarcticus) ,রয় আর সাইলো একসাথে তাদের দত্তক নেয়া একটি ডিমে তা দিয়ে যত্ন করে বড় করেছিল তাদের পালক মেয়ে পেঙ্গুইন ট্যাঙ্গোকে। জীববিজ্ঞানীরা জানতেন পেঙ্গুইনদের মধ্যে এমন সমলিঙ্গ দম্পতির দেখা মিলেছে পৃথিবীর আরো অনেক দেশের চিড়িয়াখানায়। পরবর্তীতে আবার ২০০৯ এর জুনে মিডিয়াতে প্রানী জগতে সমলিঙ্গ যৌন আচরনের বিষয়টিকে আবার আলোচনায় নিয়ে আসে উত্তর জার্মানীর ব্রেমারহেভেন জুওলজিক্যাল পার্কের আরেকটি সমলিঙ্গ পুরুষ হামবোল্ট পেঙ্গুইন (Humboldt Penguin: Spheniscus humboldti) দম্পতি: জি এবং ভিয়েলপাঙ্কট (সেখানকার তিন সমলিঙ্গ পুরুষ দম্পতির একটি), যখন তারা একসাথে দত্তক নেয়া ডিমকে ত্রিশ দিন তা দেবার পর দেখাশুনা করা শুরু করে নবজাতক পেঙ্গুইনটিকে। এরপরের কয়েকটি বছর মিডিয়াতে আরো অসংখ্য উদহারন এসেছে প্রাণীজগতের বিভিন্ন পরিবারে সমলিঙ্গ যৌন আচরনের বিষয়টির। প্রানীজগতে এ ধরনের আচরনের সর্বব্যাপিতা বর্তমানে সুস্পষ্ট। জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকজনই এই বিষয়ে গবেষনা করছেন।আর সেই সব গবেষনার মুলসুত্র গুলো একসাথে করে এবং এ ধরনের আচরনের একটি বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা খুজতে রিভারসাইডের ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী মারলিন জুক (Marlene Zuk) এবং নাথান বেইলী (Nathan W. Bailey) একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ২০০৯ সালের  Trends in Ecology and Evolution  জার্ণালে :  Same-sex sexual behavior and evolution (24: 8:2009)। সেখানে তারা বেশ কিছু প্রজাতির মধ্যে এ ধরনের সমলিঙ্গ সম্পর্কর উদহারন একটি নৈর্ব্যাক্তিক আলোচনায় নিয়ে আসেন,যে বিষয়ে বেশ কিছু গবেষনালব্ধ উপাত্ত বিদ্যমান:এদের মধ্যে যেমন আছে, ডাঙ্গ ফ্লাই, কাঠঠোকরা বা উডপেকার, তেমনি আছে বাইসন কিংবা জাপানী ম্যাকাক প্রজাতির বানর। নীচের এই লেখাটি মুলত: তাদের সেই প্রবন্ধটির অনুবাদ প্রচেষ্টা। বাড়তি তথ্য সুত্র: নিউসায়েন্টিস্ট এর প্রকাশিত কেট ডগলাসের Homosexual selection (ডিসেম্বর ২০০৯)এবং আরো দুটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ: কে ই লেভান এবং তার সহযোগীরা,Testing multiple hypotheses for the maintenance of male homosexual copulatory behaviour in flour beetles: J . EVOL. BIOL . 22 (2009) এবং  জন হান্ট ও তার সহযোগীরা, Male–male competition, female mate choice and their interaction:  determining total sexual selection: J . EVOL. BIOL . 22 (2009) ; স্পষ্টতই বেশ কিছু পরিভাষা বা কনসেপ্ট এর ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে যতটুকু পারা যায়, তারপরও অনেক কিছু পরিবর্তন করা হয়নি, বা শুধুমাত্র লিঙ্ক যোগ করেছি;তাই যে কোন ধরনের প্রশ্ন আশা করছি যারা কষ্ট করে পড়বেন তাদের কাছ থেকে ।
Continue reading “প্রাণীজগতে সমলিঙ্গ যৌন আচরণ এবং বিবর্তন:”

প্রাণীজগতে সমলিঙ্গ যৌন আচরণ এবং বিবর্তন:

অ্যাটেনবরো’র মাদার ফিশ: যৌন সঙ্গম ও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিবর্তনের উষালগ্ন


শীর্ষ ছবি: শিল্পীর চোখে Materpiscis attenboroughi (Attenborough’s Mother Fish); সুত্র:   John A long et al. Live birth in the Devonian period (Vol 453|29 May 2008| doi: 10.1038/ nature06966); (  Illustration by B. Choo)

মুল: John Albert Long এর The dawn of the deed ( ‍Scientific American, January 2011);  বাড়তি তথ্য সুত্র:  John A long et al. Live birth in the Devonian period (Vol 453|29 May 2008| doi: 10.1038/ nature06966); Devonian arthrodire embryos and the origin of internal fertilization in vertebrates (Vol 457 |2 6 February 2009| doi: 10.1038/ nature07732); Per Ahlberg et al. Pelvic claspers confirm chondrichthyan-like internal fertilization in arthrodires (Vol 460| 13 August 2009| doi: 10.1038/nature08176);  কাজী মাহবুব হাসান: আমাদের এই প্রাচীন  শরীর ;

অষ্ট্রেলিয়ার প্যালিওন্টোলজিষ্ট জন অ্যালবার্ট লং মাছের বিবর্তন নিয়ে গবেষনা করছেন বহু বছর ধরে। ফসিল বা জীবাশ্ম মাছ এবং উত্তর-পশ্চিম অষ্টেলিয়ার বিখ্যাত জীবাশ্ম ক্ষেত্র ডেভোনিয়ান পিরিয়ডের ( Devonian Period) গোগো ফরমেশন এর তিনি একজন বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ। মাছের বিবর্তন সম্বন্ধে জীববিজ্ঞানীদের ধারনার বেশ কিছু মৌলিক অবদান এসেছে তারই গবেষনা থেকে;  যেমন: Gogonasu‍s এবং Materpiscis ; মাছ থেকে টেট্রাপডদের বিবর্তনের ক্ষেত্রে Gogonasu‍s ফসিলটি এবং মেরুদন্ডী প্রানীদের প্রজনন প্রক্রিয়ার বিবর্তন প্রক্রিয়া বুঝতে Materpiscis  মুল ভূমিকা রেখেছে।  সর্বমোট ১৮ বই লিখেছেন তিনি; ২০১০ এ প্রকাশিত হয়েছে তার সর্বশেষ বই The Rise of the Fishes ( John Hopkins University Press) এর দ্বিতীয় সংস্করণ। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লস এন্জেলেস কাউন্টির মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির রিসার্চ এবং কালেকশনের ভাইস চেয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। এই লেখাটি তিনি লিখেছিলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের এর জানুয়ারী ২০১১ সংখ্যায়।

ভূমিকার পরিবর্তে: বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে ইন্টারনাল ফার্টিলাইজেশন (Internal Fertilization) বা আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ ( যখন কোন পুরুষ প্রানীর পুংজননকোষ বা স্পার্ম স্ত্রী প্রানীর শরীরের অভ্যন্তরে স্ত্রীজননকোষ বা ডিম্বানুর সাথে মিলিত হয় নিষিক্ত করার লক্ষ্যে) প্রক্রিয়াটির আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বছর আগে; হাঙ্গর এবং তাদের সমগোত্রীয় কিছু মাছের প্রজাতির মধ্যে। কিন্তু প্রায় গত একদশকে বেশ কিছু মাছের জীবাশ্মর আবিষ্কার এবং গবেষনা  ইঙ্গিত করছে যে, কপুলেশন বা সঙ্গম (( জীববিজ্ঞানে কপুলেশন শব্দটি ব্যবহৃত হয় সাধারনত: মানুষ নয় এমন প্রানীদের যৌন সঙ্গমকে ব্যাখ্যা করতে, যে প্রক্রিয়ায় পুরুষপ্রানী শরীর থেকে জননকোষ বা স্পার্ম স্ত্রী প্রানীর শরীরে ভিতরে অবস্থিত নিষিক্ত হবার ‍অপেক্ষায় থাকা ডিম্বানুর কাছে পৌছে দেয়া হয়)  এবং জন্ম হবার আগ পর্যন্ত্ ভ্রুনকে মা প্রানীর শরীরে বহন করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল আরো প্রাচীন একটি মাছের গ্রুপে এবং আরো অনেক মিলিয়ন বছর আগেই। এই আবিষ্কার আমাদের নিজেদের জনানঙ্গ সহ বেশ কিছু আভ্যান্তরীন অঙ্গগুলোর বিবর্তন প্রক্রিয়ার বিষয়টিকেও আলোকিত করেছে।

Continue reading “অ্যাটেনবরো’র মাদার ফিশ: যৌন সঙ্গম ও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিবর্তনের উষালগ্ন”

অ্যাটেনবরো’র মাদার ফিশ: যৌন সঙ্গম ও আভ্যন্তরীন নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ার বিবর্তনের উষালগ্ন