নৈতিকতার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক উৎসের সন্ধানে :


শীর্ষ ছবি: ট্রলী প্রবলেম;  একটি ধেয়ে আসা বিকল ট্রলী থেকে কয়েকজন অচেনা মানুষের জীবন বাচাতে আপনি কি আর একজন অচেনা মানুষকে বিসর্জন দিতে পারবেন, (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

( লেখাটির সুত্র:  Kristin Ohlson এর The End of Morality (Discover),  গ্রেগ মুলার এর The roots of morality (SCIENCE VOL 320 9 MAY 2008) ও ইন্টারনেট)

The greatest tragedy in mankind’s entire history may be the hijacking of morality by religion. Arthur  C. Clarke 

একটি দৃশ্য কল্পনা ধরুন …

আপনি খুব সকাল সকাল পাহাড়ের উপর এসে পৌছালেন, পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই রাস্তার দুই পাশ জুড়ে উৎসাহী মানুষের ভীড়।আপনার মত সবাই অপেক্ষা করে আছে কখন সাইক্লিষ্টরা তাদের সাইকেল রেসের এক পর্যায়ে এই রাস্তাটি অতিক্রম করবে। চমৎকার সুন্দর একটা সকাল, আকাশে ঝলমল করছে রোদ। আপনার ঠিক  পেছনে পাহাড়ের একটু উচু ঢালে  গরম খাওয়া বিক্রী করার একটা চাকাওয়ালা ভারী ঠেলা গাড়ি। গরম খাওয়ার গন্ধ বাতাসে ভাসছে, আপনারও কিছু খেতে ইচ্ছা করছে, আপনি একটু ঝুকে নিচের দিকে তাকালেন, না কিছুটা সময় বাকী আছে, কিছু একটা খাওয়া যাক। আপনি পিছন ফিরে খাওয়ার গাড়ির দিকে আগালেন, দেখলেন বিক্রেতা একজনকে টাকা ভাংতি দিতে তার খাওয়ার গাড়ি ছেড়ে কাউকে যেন খুজছে, আপনি একটু অস্হির হয়ে পড়লেন, দেরী হয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ মানুষের চিৎকার শুনে আপনি বুঝতে পারলেন সাইক্লিস্টরা আসছে। খাওয়ার জন্য যারা ভীড় করে ছিল তাদের কারো তাড়াহুড়োতে খাওয়া বিক্রির ভারী ঠেলা গাড়িটা তার বাধন ছিড়ে ঢাল বেয়ে দ্রুত নেমে আসছে, ধীরে ধীরে এর গতি বাড়ছে, আপনি নিশ্চিৎ যে এটা রাস্তা অবধি পৌছালে নিশ্চিৎ বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটবে কমপক্ষে মারা যাবে এক ডজন সাইক্লিষ্ট,একটাই উপায় যদি না কেউ ধাক্কা দিয়ে ঠেলা গাড়িটাকে রাস্তার দিক থেকে সরিয়ে দেয়, কিন্তু সমস্যা হলো তা করতে গেলে ওদিকে দাড়ানো তিন জন দর্শক নির্ঘাত মারা পড়বে ..কি করা উচিৎ?


২০১০ এ যখন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে মোরাল কগনিশন ল্যাবে একটি নতুন ধরনের স্লায়ুমনোবিজ্ঞানের গবেষনায় ঠিক এরকমই একটা ভয়ঙ্কর কল্পদৃশ্যর উভয়সংকটময় পরিস্হিতি যখন গবেষনায় অংশ নেয়া ভলান্টিয়ারদের সামনে উপস্হাপন করা হয়েছিল, তাদের জবাব ছিল সমানভাবে বিভক্ত। মানসিক ক্যালকুলাসের কিছু সময় পার পর অর্ধেক অংশগ্রহনকারী বলেছিলেন, তাদের মতে সবচেয়ে নৈতিক সিদ্ধান্তটি হবে ঠেলা গাড়ীটাকে দাড়ানো দর্শকদের দিকে ঠেলে দেয়া; যদিও বাকীরা এর সাথে দ্বিমত পোষন করেছিলেন এই বলে যে, যে কোন কারনেই হোক না কেন হত্যা করাটা অনৈতিক একটি কাজ, এমনকি এই ক্ষেত্রেও,যখন এই কাজটি মাত্র ৩ জনের বদলে বেশী মানুষের (এখানে ১২) জনের জীবন বাচাবে।

এই গবেষনার দুই পরিকল্পক বিজ্ঞানী জশুয়া ‍গ্রীন (Joshua Green) এবং ফিয়েরী কুশম্যান (Fiery Cushman),যখনঅংশগ্রহনকারীরা এম আর আই (MRI) মেশিনের মধ্যে শুয়ে এই সব উভয় সংকটের সমাধান করছিলেন, তখনকার তাদের ব্রেণ স্ক্যান পর্যবেক্ষন করলে দেখতে পান যে, সবার স্ক্যানেই বোঝা যাচ্ছে এধরনের নৈতিক বিচারের বা জাজমেন্টের সময় ব্রেনে প্রবাহিত রক্তে অক্সিজেনের পরিমান বেড়ে যাচ্ছে, যা হলদে বুদবুদের মত স্ক্যানে ভেসে উঠছে। কুশম্যান ব্যাখা দিলেন,যে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে গেলে আমাদের মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয়, যার অর্থ ব্রেনকে বেশী কাজ করতে হয়। সুতরাং অক্সিজেন বেশী ব্যবহার করতে হয় এটা কোন আশ্চর্য জনক ব্যাপার না। কিন্তু যেটা লক্ষ্য করার মত বিষয়, সেটা হলো যারা অল্প কয়েকজনের বদলে বেশী মানুষ বাচানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাদের স্ক্যানে এই হলুদ বুদবুদের আকার এবং উজ্জ্বলতা স্পষ্টতঃই প্রমান করে তাদের ব্রেন বেশী অক্সিজেন ব্যবহার করছে। যা ইংগিত করে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে উল্লেখযোগ্য পরিমান বেশী ব্রেইনের শক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। গ্রীন আর কুশম্যানের কাছে যা মনে হচ্ছে তা হলো, যুক্তি, যা একটি সয়ংক্রিয় সহজাত প্রবৃত্তি জাত প্রতিক্রিয়াকে দমিয়ে রাখছে।

গ্রীনের ভাষায়, আমরা মাঝে মাঝে আমাদের একেবারে ভিতর থেকে কিছু প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে পারি (যাকে আমরা বলি গাট রিঅ্যাকশন) এবং আমাদের সিদ্ধান্তের উপর কতৃত্ব বিস্তারকারী আর প্রভাবশালী একটি প্রতিক্রিয়া বলে মনে হয়ে তাদের, যেন অনেকটা আপনি ঈশ্বরের আওয়াজ টের পাচ্ছেন বা আপনার বিবেক আপনাকে সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছে। কিন্তু এই শক্তিশালী সহজাত অনুভুতি, উপজ্ঞা বা স্বজ্ঞা উপরের কোন শক্তির নির্দেশ না, এগুলো আমাদের ব্রেনেরই শারীরবৃত্তীয় এবং স্নায়বিকভাবেই সৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়াজাত আবেগ বা ইমোশন (বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী অ্যান্তোনিও দামাসিও যাকে বলেছেন সোমাটিক মার্কার)।

খুব চাপের মধ্যে থাকলে আমাদের প্রথম যে প্রতিক্রিয়াটা হয় , যেটা ডিফল্ট প্রতিক্রিয়া – সেটি হলো আমাদের ভেতরের সেই আবেগ বা গাট যা বলছে, সেটাই করা। কিন্তু যুক্তি দিয়ে পরিস্হিতিটা সামাল দিতে ব্যয় হয় আরো বেশী সময় আর মগজের শক্তি ।

নৈতিক কোন পরিস্থিতিতে আমরা যে কারনে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে উভয় সংকটে পড়ি তার কারন হলো, আমাদের ব্রেন প্রত্যেক সমস্যার জন্য দুটি সমাধান দেয়। এই দুটি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া একে অপরের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে যেতে পারে, কারন তখন ব্রেন তার নিজের সাথেই যুদ্ধ করছে এই সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়ায়।

জটিল এধরনের নৈতিক উভয়সংকটের সমস্যাগুলো যেমন, একটু আগে উল্লেখ করা ঠেলা গাড়ীর ঘটনাটি, বহুদিন ধরে দর্শনের এখতিয়ারে ছিল। কখনো কখনো বিচারক আর জুরীদের এধরনের নীতিগতভাবে জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়:অনেকজনকে বাচানোর জন্য কি একজনকে হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত? একজন অভিযুক্ত হত্যাকারীকে কি হত্যা করা উচিৎ নাকি তাকে জীবিত রেখে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া উচিৎ? কোন কাজের ভালো বা খারাপ ফলাফল মুল্যায়ণ করার সময় কি কাজটার পেছনে মুল উদ্দেশ্য বা ইনটেনশনটা কি ছিল, তা কি আমলে আনা উচিৎ? কোনটা অনুমোদনযোগ্য? কোনটা ঠিক? কোনটা ন্যায়সঙ্গত?

গ্রীন বা কুশম্যানের মত স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এই বিতর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গী যোগ করেছেন, বিশেষ করে এধরনের কোন এথিকাল বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবার সময় যে সমস্ত জীববিজ্ঞানীয়,স্নায়বিক কর্মকান্ড আমাদের ব্রেণে সংঘটিত হয় সেই ক্রিয়াকান্ড প্রকাশ করে। নৈতিক পছন্দ অপছন্দের জৈববিজ্ঞানীয় মুল উন্মুক্ত করার মাধ্যমে, গ্রীনের বিশ্বাস, আরো ভালো নৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ তৈরী করবে। যখনই আমরা বুঝতে পারবো এই সময়ে আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে কি ঘটছে,বহুদিনের পুরোনো কিছু কিছু নৈতিক ব্যাপারে,আমাদের ভেতরের সেই কন্ঠকে,যা হাজার হাজার ধরে আমরা শুনে আসছি,চ্যালেন্জ্ঞ করে হয়তোবা আমরা আমাদের মতামতও পরিবর্তন করতে পারি।

জশুয়া গ্রীন,হাইস্কুলে ডিবেট টিমে থাকার সময় দুই বিখ্যাত নৈতিক দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল আর ইমানুয়েল কান্ট এর কাজের সাথে প্রথম পরিচিত হন। কান্ট বলেছিলেন,নৈতিক সত্যগুলো পবিত্র এবং অলংঘনীয়, যা  নির্দিষ্ট করা আছে অধিকার আর কর্তব্যের দ্বারা, যে রেখা কখনোই অতিক্রম করা যাবে না, এর কোন ব্যতয় নেই। কিন্তু গ্রীনের পক্ষপাতিত্ত্ব ছিল  মিলের প্রতি, মিল একজন উপযোগবাদী বা ইউটিলিটারিয়ান, ‍যার বক্তব্য ছিল নৈতিকতা মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য যা মঙ্গলময় সেটাই।কিন্তু পরবর্তীতে এক বিতর্ক প্রতিযোগীতার সময় গ্রীনকে মুখোমুখি হতে হয় একজন অসাধারন বিতার্কিকের মুখোমুখি, গ্রীনের ইউটিলিটারিয়ান নৈতিকতাকে চ্যালেন্জ্ঞ করে সে তাকে প্রশ্ন করা হলো, তাহলে তুমি বলো আমাকে, একজন চিকিৎসকের কি অধিকার আছে একজনকে হত্যা করে তার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিয়ে পাচ জন মুমুর্ষ রোগীর জীবন বাচাতে? নিশ্চয়ই যে কাজটি করলে বেশী মানুষ উপকৃত হবে সেটা করাইতো ঠিক আছে তাইনা? গ্রীন এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেননি। কিন্তু গ্রীন সহজাত প্রকৃতিতেই অনুভব করতে পারছিলেন, ব্যাপারটা নৈতিক না। বিতর্কে সেবার হেরে গেলেন গ্রীন এবং কিছুদিন ভাবলেন হয়তো উপযোগিতাবাদেই কিছু ভুল আছে।


আপনি কি একটি মানুষকে খুন করবেন, যদি তার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো পাচ জন মুমূর্ষ রোগীর জীবন বাচায়? (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

কলেজে পড়ার সময় তার চিন্তার আবার একটি পরিবর্তন হয়। প্রথমে পেনসিলভেনিয়ার হোয়ার্টন স্কুলে পরে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন তিনি দর্শন আর মনোবিজ্ঞানের একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পড়াশুনা করেন: হিউরিস্টিকস (heuristics), হিউরিস্টিকস হলো সেই সব শর্টকাট যা আমাদের মন ব্যবহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার জন্য। গ্রীন বুঝতে পারলেন কাউকে খুন করে তার অঙ্গ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে তার তাৎক্ষনিক বিতৃষ্ণা  মনে হয় সেরকমেই একটা শর্টকাট। বিবর্তনের আলোকে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলে কোন একটি গ্রুপের মধ্যে আরেকজনকে জখম করার প্রতি আমাদের তাৎক্ষনিক বিরুপ প্রতিক্রিয়া ঐ গ্রুপের মধ্যে বৃহত্তর হারমনি বা একাত্মতা বজায় রাখে।


একটি এথিক্যাল থট প্রবলেম যা ট্রলী প্রবলেম নামে পরিচিত।  একটি ধেয়ে আসা বিকল ট্রলী থেকে কয়েকজন অচেনা মানুষের জীবন বাচাতে আপনি কি আর একজন অচেনা মানুষকে বিসর্জন দিতে পারবেন, (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

ঠিক সেরকম একটা সময় গ্রীন, ট্রলী প্রবলেম নামে একটি এথিক্যাল থট বা নৈতিকতার চিন্তার পরীক্ষার কথা শুনলেন। ৬০ এর দশকে এই থট এক্সপেরিমেন্টটি পরিকল্পনা করেছিলেন বিখ্যাত বৃটিশ নৈতিক দার্শনিক ফিলিপ্পা রুথ ফুট (Philippa Ruth Foot),পরবর্তীতে তা যা সম্প্রসারিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন বিখ্যাত নৈতিক দার্শনিক জুডিথ জার্ভিস থমসন (Judith Jarvis Thompson) ; দার্শনিকদের এই সমস্যাটিকে পরে মনোবিজ্ঞানীরা অ্যাডাপ্ট করে নেন দুটি নৈতিকভাবে চ্যালেন্জ্ঞিং চিন্তার দৃশ্যকল্পে। সুইচ সিনারিও তে পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারীদের একটা কাল্পনিক পরিস্হিতির কথা ভাবতে বলা হয়:  রেলগাড়ীর একটা ট্রলি রেললাইন ধরে জোরে ধেয়ে আসছে লাইনের উপর দাড়ানো পাচজন মানুষের দিকে, ঠিক আগের সেই খাবারের ঠেলাগাড়ীটা সাইক্লিষ্টদের দিকে ধেয়ে আসার মতই উভয়সংকটময় পরিস্থিতি, এখানে শুধু ঠেলাগাড়ীটি ধাক্কা দিয়ে তার গতি পথ পরিবর্তন করার বদলে, আপনার হাতে আছে একটা সুইচ, সেটা দিয়ে আপনি ট্রলিটির গতিপথ বদলে দিতে পারবেন ঐ পাচজন মানুষের পথ থেকে কিন্তু সেটা করলে অন্য লাইনের উপর দাড়ানো একজন মানুষ মারা যাবে। তাহলে এটা কি নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য যে সুইচটা ব্যবহার করে ট্রলীটির গতিপথ ঘোরানো ?

দ্বিতীয় দৃশ্যপটে, আগের মতই এখানেও ট্রলীটা ধেয়ে আসছে পাচজনের দিকে,লাইনের উপরের একটা হাটার ব্রীজে দাড়িয়ে আছে বেশ বড়সড় আকারের একজন মানুষ, যাকে ঐ ট্রলীর সামনে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলে ট্রলীর গতি থামানো যাবে, সেটা কি নৈতিক ভাবে সঠিক হবে? নাকি এরকম কোন অবস্হায় কিছু না করাটাই মোরাল হবে?

ফিলিপ্পা ফুট আর থম্পসনের কাজ গ্রীনকে ভীষন উৎসাহিত করেছিল, কারন এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মোরাল দর্শনের দুটি প্রধান আইডিয়ার কেন্দ্রীয়  টেনশন বা টানাপোড়েনটা প্রকাশ পায়। একদিকে  কান্টীয় দর্শন যা দাবী করে প্রত্যেকটা মানুষের অধিকারে এবং কর্তব্যর সাথেই সংযুক্ত নৈতিকতা এবং এর কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে যা কখনোই অতিক্রম করা যাবে না। ব্রীজের উপর থেকে লোকটিকে নীচে ঠেলে ফেলা দেয়া অবশ্যই সেই সীমা লঙ্ঘন করে। অপরদিকে মিলের ইউটিলিটারিয়ানিজম দর্শন বলে নৈতিকতা হলো বৃহত্তর গোষ্ঠীর ভালোর স্বার্থে নেয়া কঠিন সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজনীয়তা, এমনকি যখন,যদিও কদাচিৎএমন পরিস্থিতি হতে পারে,তখন এর আক্ষরিক অর্থ হতে পারে এই সিদ্ধান্তের কারনে কাউকে ব্রীজের উপর থেকে কাউকে ট্রলীর সামনে ফেলে দেয়া। সুইচ ব্যাবহার করে পাচ জনকে বাচাতে একজনকে মারাও ঠিক এমনই সিদ্ধান্ত।

তখন প্রিন্সটনে দর্শনের ছাত্র,গ্রীন একটি প্রবন্ধ লেখেন, দুই ধরনের নৈতিকতা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কান্ট এবং মিলের তত্ত্ব যুদ্ধরত। আমাদের মন এদের মধ্যে কোন বিশেষ একটি নৈতিক কোডের প্রতি কিন্তু বেশী সহানুভুতিশীল না অর্থাৎ পক্ষপাতিত্ব করেনা। আমাদের সবসময় এদের মধ্যে অবশ্যই একটাকে বেছে নিতে হয়।

এর কিছুদিন পর গ্রীন বিখ্যাত এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের প্রথম সারির বিজ্ঞানী আন্তোনিও দামাসিও’র আমাদের মস্তিষ্কে আবেগের অবস্হান নিয়ে দেকার্তেস এরোরস (Descartes’ errors) নামে একটি বই পড়ার সুযোগ হয়। দামাসিওর এই বইটিতে মুল বিবরণ একটি অদ্ভুত কেস স্টাডি এবং চরিত্রকে ঘিরে। এই কেস স্টাডিটি ফিনিয়াস গেজ নামক একজন ব্যক্তি যিনি উনিশ শতকের একজন রেললাইন তৈরীর ফোরম্যান ছিলেন। একটা বিস্ফোরনে তার মাথায়  লোহার একটি স্পাইক ঢুকে যায়। বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর গেজ আপাতদৃষ্টিতে শারীরিকভাবে সুস্হ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু তার যে পরিবর্তনটা হয়, সেটা তার সামাজিক কর্মকান্ডে, কারন গেজ আর আগের মত যুক্তি নির্ভর কোন সিদ্ধান্ত বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। দামাসিও এবং তার স্ত্রী হান্না, যিনি নিজেও একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, দুজনে গেজের মাথার খুলি পরীক্ষা করেন, এবং নানা রেকর্ড ঘেটে তার ব্যক্তিত্বের ক্রমাবনতি নিয়ে গবেষনা করেন। তাদের গবেষনায় তারা প্রমান করেন যে গেজ এর সমস্যার মুলকারন তার মগজে ভেন্ট্রোমিডিয়াল প্রি-ফ্রন্ট্রাল কর্টেক্স এর ক্ষতি, আমাদের কপালের মাঝামাঝি জায়গাটার পেছনে যে মস্তিষ্কের অংশটা থাকে, যা আমাদের আবেগ বা ইমোশনের সাথে জড়িত। তারা ব্রেনের ক্ষতি ও এর পরবর্তী ব্যাক্তিত্বের পরিবর্তন ও সমস্যায় আক্রান্ত সমসাময়িক কিছু রোগীদের নিয়েও গবেষনা করেন, তারা সেখানে মুল সমস্যা খুজে পান অন্য ইমোশনের কেন্দ্রগুলোতে। দামাসিও প্রস্তাব করেন,আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণের মুলে যুক্তি বা রিসন (যা বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করে আসছেন) ছাড়াও গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখে আমাদের ইমোশন বা আবেগ।

গ্রীনের জন্য এটা গবেষনার নতুন পথ দেখায়। তার ভাষায় এই সব ব্রেন ক্ষতি হওয়া মানুষগুলো যা থাকেনা তাহলো সেই ভেতরের নেই সহজাত অনুভুতি বা গাট ফিলিংস,অন্য কোন মানুষ যে অনুভুতির কারনে কাউকে  ট্রলির সামনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার কথা ভাবলেই আঁতকে ওঠে। এমন কি যদিও তারা  অনুভব করতে পারে যে, সুইচ দিয়ে ট্রলির যাত্রাপথ পরিবর্তন করাটা অনৈতিক হবেনা। কিন্ত কিছু নির্দিষ্ট ব্রেন ড্যামেজ হওয়া মানুষদের কিন্তু এমনটা হবে না, ব্রীজের উপর দাড়ানো মানুষটাকে ট্রলীর সামনে কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার ব্যাপারটা এদের কাছে কোন সমস্যা মনে হবে না। কিন্ত সাধারনত বাস্তব জীবনে যখন তারা অনুভব করতে যাবে কোনটা ঠিক, কোন যুক্তির ব্যবহার না করে, তখনই তারা আটকে যাবে।

হঠাৎ করেই গ্রীনের কাছে নৈতিকতা তখন আর শুধু দর্শনের বিষয় না বরং সুস্পষ্টভাবে স্নায়ুবিজ্ঞানেরও একটি ব্যাপার। এটাই তার মোরাল জাজমেন্ট বা নৈতিক বিচারের এর দ্বৈত প্রক্রিয়া বা ডুয়াল প্রসেস তত্ত্বের সুচনা। যে খানে আমাদের প্রকৃতিগত প্রতিক্রিয়া বা Instinct আর যুক্তি একে অপরের সাথে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এ দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে। দর্শনের সেই বিখ্যাত নৈতিক টেনশন, কান্ট ও মিলের মধ্যে, গ্রীন প্রস্তাব করেন, আসলে তা আমাদের ব্রেনের দুটি বীপরিত মুখী প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট দ্বন্দ। প্রথাগত দর্শনে পড়াশুনা করা গ্রীনের কাছে মনে হয়েছে নৈতিকতার বিষয়ে গবেষনায় প্রকৃত অগ্রগতি হতে পারে একমাত্র স্নায়ুবিজ্ঞানে।

গবেষনার এই নতুন যাত্রায় তিনি জুটি বাধলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিষ্ট জোনাথান কোহেন এর সাথে। কোহেনের গবেষনার ক্ষেত্র ছিল :আমাদের ব্রেন মনোযোগ, চিন্তা এবং  একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ভর কোন কাজ কিভাবে কো-অর্ডিনেট করে। কোহেনের গবেষনার একটি অন্যতম টুল ছিল ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রিসোন্যান্স ইমেজিং (fMRI); এই একই যন্ত্রটা দিয়ে পরবর্তীতে গ্রীন এবং কুশম্যান ব্রেনের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেনের পরিমান পরিমাপ করেছিলেন।

জোনাথান কোহেনের পাইওনিয়ার প্রতিষ্ঠান, নিউরোসায়েন্স অব কগনিটিভ কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে গ্রীন (তখন এই ল্যাবে পোষ্টডক করছিলেন) প্রথম ভলান্টিয়ারদের উপর  এফ এমআরআই  স্ক্যান করেন:যখন তারা ট্রলী সমস্যা ও অন্যান্য কঠিন দার্শনিক সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন। তার সেই ল্যান্ডমার্ক গবেষনাপত্র ২০০১ ‍সালে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত হয়;সেটি ছিল প্রথম দিকের গবেষনা পত্রগুলোর অন্যতম,যেখানে নৈতিকতা সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত এবং পছন্দ/অপছন্দের প্রশ্নে আমাদের ব্রেনের কোন অংশগুলো সংশ্লিষ্ট তা প্রথমবারের মত প্রকাশিত হয়। যারা বেশী মানুষের জীবন বাচানোর লক্ষ্যে চলন্ত ট্রেনটিকে থামানোর জন্য ব্রীজে দাড়ানো মোটা মানুষটা ধাক্কা দিয়ে ফেলা দেয়ার কথা ভাবছিলেন,তাদের ব্রেনের মিডিয়াল ফ্রন্টাল জাইরাস, পোষ্টেরিয়র  সিংগুলেট জাইরাস এবং অ্যাঙ্গুলার জাইরাস বেশী সক্রিয় হয়ে উঠছে অর্থাৎ ব্রেনের যে জায়গাগুলোতো আমাদের আবেগ এবং সামাজিক কগনিশন বা আচরণবোধের কেন্দ্র।যারা ট্রলির সুইচ বদলিয়ে ট্রেনের গতিপথ বদলাবেন কিনা ভাবছিলেন তাদের ব্রেনের ডরসোল্যাটেরাল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সটি ছিল বেশী সক্রিয়,অর্থাৎ ব্রেনের যে জায়গা যুক্তি প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট।

গ্রীন তার গবেষনায় যেটা দেখেছেন,এই দুই ব্রেন সিস্টেমের মধ্যে ভারসাম্য বদলাতে পারে; আর সেটা নির্ভর করে এই ইন্টারভেনশনে সেই ব্যাক্তির কতটুকু ভূমিকা আছে সেটার উপর। যদি কাল্পনিক সেই পরিস্থিতির দর্শক হিসাবে, কেউ যদি কল্পনা করে হাত বা লাঠি দিয়ে মোটা ব্রীজের উপর থেকে লোকটিকে ধেয়ে আসা ট্রলীর সামনে ফেলে দেয়া হচ্ছে, তখন মাত্র শতকরা ত্রিশ ভাগ অংশগ্রহনকারী মনে করে বেশী মানুষের জীবন বাচাতে কাজটি নীতিগতভাবে ঠিক।কিন্তু পরিস্থিতিটা বদলে দিয়ে যদি এমন করা হয় যে একটা সুইচ টেনে ধরলেই ব্রীজের উপর দাড়ানো লোকটির পায়ের নীচে একটি গোপন দরজা খুলে যাবে, তার লোকটি সেখান দিয়ে নীচে ট্রলির সামনে পড়ে যাবে, তখন কিন্তু দেখা যাচ্ছে শতকরা ষাট ভাগ বলছেন, নীতিগতভাবে কাজটা সঠিক, অথচ যদিও দুটো ভিন্নভাবে সম্পাদিত কাজ,তাদের ফলাফল কিন্তু এক ।

আসল  যে বিষয়টা এখানে দেখা যাচ্ছে সেটা হলো, আমরা কি আমাদের ব্যক্তিগত শক্তি ব্যবহার করছি ‍কিনা? গ্রীনের বলেন, নানা ধরনের ডাটা ইঙ্গিত দিচ্ছে মানুষ সাধারনতঃ পরস্পরকে সরাসরি আঘাত করতে চায়না এমন কি যুদ্ধের সময়ও। আমাদের ভেতরে একটা মেকানিজম আছে যা আমাদের শারীরিক সহিংসতাকে পরিহার করতে তাগিদ দেয়;কিন্তু মেকানিজমকে নিয়ন্ত্রনটাও স্বয়ংক্রিয়। এরকম কোন ভিন্নরকম পরিস্থিতিতে আমাদের আবেগ অযাচিত বা কোন কারন ছাড়া সহিংসতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের ভালোর জন্য করা সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনা।

এরপর গ্রীন তার গবেষনায় আরো একটি মাত্রা যোগ করেন,সেটা হলো তাহলো আরো চাপের পরিস্থিতিতে ফেলে ব্রেনের এই সিস্টেমগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দকে আরো বাড়িয়ে দেয়া।একারনে গ্রীন বেছে নেন ক্রন্দনরত শিশুর ডাইলেমার দৃশ্যকল্পটিকে, এটি ভয়াবহ যুদ্ধকালীণ পটভুমির একটি পরিস্থিতি যেখানে গ্রীন ‍ভলান্টিয়ারদের কল্পনা করতে বলেন,তারা একটি শক্রসেনা আক্রান্ত গ্রামের সবাই একটা বেসমেন্টে লুকিয়ে আছেন,বাইরে শত্রু সৈন্যরা সবাইকে খুজছে, হঠাৎ করে আপনার ‍বাচ্চা কেঁদে উঠলো,আপনি ‍তার মুখ চেপে ধরলেন আওয়াজটা কমাতে; যদি সৈন্যরা বাচ্চার কাদবার আওয়াজ পায়,তারা সব গ্রামবাসীকেই খুজে ‍পাবে, আপনি আপনার বাচ্চা সহ; সবাইকে মেরে ফেলে হবে। কিন্ত বাচ্চার মুখ থেকে আপনি যদি হাত না সরান, তাহলে আপনার বাচ্চাও  শ্বাসবন্ধ হয়ে  মারা যাবে।কোনটা নৈতিকভাবে গ্রহনযোগ্য কাজ হবে?


আপনি কি আপনার ক্রন্দনরত শিশুকে হত্যা করতে পারবেন আপনাকে সহ সবাইকে বাইরের শক্র সেনা থেকে রক্ষা করতে? (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

এ ধরনের কঠিন ডাইলেমা বা উভয়সংকটময় পরিস্থিতিগুলো যে কাউকেই চিন্তা করতে বাধ্য করাবে, স্পষ্টতই এর সাথে যুক্ত তীব্র আবেগীয় প্রতিক্রিয়া; এই তীব্র আবেগ এখানে দ্বন্দে থাকবে অনেক মানুষের জন্য মঙ্গল হবে এমন কোন কাজ এর প্রভাবশালী গ্রহনযোগ্যতার জোরালো যুক্তি।অবশ্যই খুব সহজ না এই পরিস্থিতিগুলো,এক অর্থে বলা চলে কুৎসিত ।এই বাচ্চা কাদবার সমস্যাটা গ্রীনের গবেষনায় অংশ নেয়া ভলান্টিয়ারদের বেশ নাড়া দিয়েছিল; যা আসলে তাদের ব্রেনের দুটি দ্বন্দরত সিস্টেমের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটার চেহারা বদলে দেয়।এখানে,কোন কিছু না করার ফলাফল ফলাফল এতই ভয়াবহ যে অর্ধেকের বেশী ভলান্টিয়ার অবশেষে রাজী হয় অকল্পনীয় সেই শিশুহত্যার মত ভয়াবহ কাজটায় সায় দিতে:তাদের বক্তব্য এখানে সবার প্রাণ রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির শিশুটিকে হত্যা করা ছাড়া কোন উপায় নেই; এই সিদ্ধান্তটি যারা নেয়,দেখা গেছে তারা তাদের ব্রেনের ডরসোল্যাটেরাল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স,অর্থাৎ যে অংশটা সরাসরি কগনিটিভ কন্ট্রোলের বা রিজনিং বা যুক্তি প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত।স্পষ্টতঃ ব্রেনের দুটি সিস্টেমই দ্বন্দরত, কিন্তু ইউটিলিটারিয়ানদের ক্ষেত্রে যুক্তি স্নায়বিক এই দড়ি টানাটানির খেলায় আবেগকে পরাজিত করে।

এরপর গ্রীন তার ভলান্টিয়ারদের বেশ কিছু এধরনের নৈতিক উভয়সংকটের বিষয়গুলো চিন্তা করার সাথে সাথে আরেকটা কাজ জুড়ে দিলেন।এসব চিন্তা করতে করতে তাদের এর সাথে কোন সম্পর্ক নেই এমন কোন সংকেতের সাথে একটা বোতাম টিপতে হবে। এই দুটো কাজই নিয়ন্ত্রন করে ব্রেনের কগনিটিভ কন্ট্রোল মেকানিজম, যা এধরনের সিদ্ধান্তে নেবার ক্ষেত্রে আমাদের আবেগকে দমিয়ে রাখে। যখন সেই সিস্টেমটাই ব্যাস্ত থাকবে এই বাড়তি বাটন চাপার কাজে,গ্রীন দেখেছেন আমরাও বেশী সময় নেই ইউটিলিটারিয়ান কোন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে। কিন্তু আমাদের গাট ফিলিংস বা সহজাত অনুভুতি নির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে কিন্তু এই বাটন চাপার বাড়তি কাজটা কোন সমস্যা করেনা, যা কিনা কোন ভলান্টিয়ার কোন সমস্যা ছাড়াই দ্রুত ম্যানেজ করতে পারে তারা অন্য একটি কগনিটিভ কাজ করুক বা না করুক।এই ফলাফলগুলো ইঙ্গিত করে কোন ইউটিলিটারিয়ান সিদ্ধান্ত, যেমন গ্রামবাসীদের রক্ষা করতে বাচ্চাকে মেরে ফেলা বা উপর থেকে ধাক্কা মেরে কাউকে নীচে ফেলে ট্রলীর গতিরোধ থামানো, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে অনেক বেশী মাত্রায় কগনিটিভ অংশকে জোরালো ভুমিকা নিতে হয় ব্রেনে, আবেগকে পরাস্ত করার জন্য,কারন আমরা এক্ষেত্রে জোর করে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখছি ।

কয়েক শতাব্দী ধরে আমাদের দার্শনিকরা আমাদের ইনটুইশন বা সহজাত প্রবৃত্তি আপাতবৃষ্টিতে যেমন মনে হয় সেভাবে মেনে নিয়েছেন,এর ফেস ভ্যালু দেখে।এবং তারপর তত্ত্ব খোজার চেষ্টা করা হয়েছে যা কিনা সামগ্রিকভাবে যা এইসব সহজাত প্রবৃত্তি বা ইনটুইশনগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু যখনই দার্শনিকরা একের পর এক নানা ধরনের বিচিত্র ও ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্ঠা করা শুরু করলেন, তখন এসব কিছুর ব্যাখ্যা করার মতো একটা তত্ত্ব আসলেই খুজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাড়ায়।গ্রীন মনে করেন,সবকিছু ব্যাখ্যা করে এমন শক্তিশালী কোন তত্ত্ব খোজার কোন দরকার নেই,এমনিতেই আমাদের মোরাল জাজমেন্ট অদ্ভুত কিছু বিষয়ের প্রতি সংবেদনশীল; যেমন,সেই ট্রলী পরিস্থিতিতে,আপনি কাউকে ’নিজের হাত’ ব্যবহার করে দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলছেন নাকি একটা ’সুইচ’ দিয়ে তার পায়ের নীচে লুকানো ট্র্যাপ দরজা সরিয়ে তাকে ফেলে দেবেন।স্পষ্টতই কোন একটি মাত্র মোরাল ফ্যাকাল্টি নেই: যা আছে তা হলো ব্রেনেল উপর থেকে যুক্তি নির্ভর নিয়ন্ত্রন এবং ব্রেনের স্বয়ংক্রিয় আবেগের একটি পরিবর্তনশীল গতিময় পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।

শুধু গ্রীন না অন্য অনেক গবেষকরাও একই ধরনের উপসংহারে পৌছেছেন।এদের একজন দার্শনিক জন মিখাইল (যিনি একজন আইন বিশেষজ্ঞও বটে),নোয়াম চোমস্কির সাথে যিনি লিঙ্গুইস্টিক তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করছিলেন,এম আই টি তে;চোমস্কির একটা যুক্তি তাকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।চোমস্কি বলেছিলেন,ব্যাকরণের নিয়মগুলো আমাদের ব্রেনে হার্ডওয়ার করা বা গভীরভাবে প্রোথিত,যা আমাদের জন্মগত। ট্রলি সমস্যাটা নিয়ে বেশ আলোচনা ওঠার পর জন মিখাইল সন্দেহ করতে লাগলেন নৈতিক বিচারের ভিত্তিও হয়ত আমাদের জন্মগত।এটা প্রমান করার জন্য তিনি এই প্রশ্নটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে গেলেন (সাধারনতঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহনকারীরা আইভি লীগ কলেজের ছাত্র ছাত্রী হয়ে থাকে),ওহাইওতে আর টেনেসিতে তার আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুদের কাছে, এছাড়া স্থানীয় স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে। তিনি গবেষনায় দেখলেন এমনকি ৮ বছরের শিশুও বলেছে, পাচজনকে বাঁচাতে ট্রেনটা একজনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য কিন্ত কাউকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের সামনে ফেলে দেয়া ঠিক না।গবেষনাটিতে দেখা যায় শতকরা নব্বই জনই বলেছে সুইচটা ব্যবহার করে তারা পাচজনককে বাচাতে ট্রলীটাকে ঘুরিয়ে দেবে যার কারনে একজন মারা যাবে,আবার শতকরা সত্তর জন বলছেন,ট্রলীটাকে থামাতে ব্রীজে দাড়ানো মানুষটাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের সামনে ফেলা ঠিক হবেনা,অথচ দুই ক্ষেত্রেই ফলাফল এক ; মোট ৫ জনের জীবনের বদলে ১ জনকে বিসর্জন।মিখাইল প্রস্তাব করেন, এই গবেষনায় অংশ নেয়া শিশুরা বা পুর্ণবয়স্করা ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রায় সবারই কেন তাহলে একই কম মোরাল ইনটুইশন হবে ;যদি না তা একধরনের সার্বজনীন এবং সামষ্ঠিক বিবেকের অংশ না হয়ে থাকে এবং যা কিনা কেউই শুধুমাত্র স্কুল,চার্চ বা বাইরের কোন উৎস থেকে শেখেনি।

গবেষকরা প্রতিদিনের নৈতিক ডাইলেমাগুলো, যেমন কাউকে বিশেষ সাহায্য করা বা ছোটখাট চুরি নিয়ে গবেষনা করছেন। এরকম একটা গবেষনায় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সস্টিটিউট অব নিউরোলজীক্যাল ডিসওর্ডার অ্যান্ড স্ট্রোকস এর গবেষক জর্ডান গ্রাফম্যান ও রিও দ’জেনেরিওর দ’র ইন্সস্টিটিউট  অব রিসার্চ  অ্যান্ড এডুকেশন এর হোর্হে মল তাদের গবেষনায় ১৯ জন অংশগ্রহনকারীর সামনে ১২৮ ডলারে একটি পট রাখেন,তাদের দুটো সুযোগ দেয়া হয়;টাকা নিজে নিতে অথবা কিছু সামাজিক দাতব্য সংস্থায় টাকাটার কিছু অংশ দান করতে।ব্রেন স্ক্যান বলছে টাকা দান কারীদের ভেন্ট্রাল টেগুমেন্টাম বলে একটা আদিম অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে,এটি ব্রেনের রিওয়ার্ড (পুরষ্কার) সার্কিটের একটা পার্ট, যা আমাদের বেচে থাকার জন্য জরুরী অথচ আনন্দদায়ক কাজগুলোর সাথে জড়িত, যেমন কিনা,খাদ্য,প্রজনন ইত্যাদি।মলের মতে,সামাজিকতামুখী অনুভুতিগুলো যেমন দয়া,অপরাধবোধ,সমবেদনা ইত্যাদি আমাদের ব্রেনের নিউরাল সার্কিটে আগে থেকেই সুচিহ্নিত,স্নায়বিক গঠনের সাথে এরা আমাদের ব্রেনে বিবর্তিত হয়েছে।যখন টাকার পরিমান খুব বেশীনা অথচ যারা বেশী টাকা দান করেছে (৮০ বনাম ২০ ডলার) তাদের ব্রেনের সেপ্টাল এলাকা সক্রিয় হয়েছে বেশী, যেটি সামাজিকতা, সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিক ঘনিষ্টতা ইত্যাদি কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। এছাড়া এই জায়গাটা প্রচুর অক্সিটোসিন সংবেদী রিসেপ্টর পাওয়া যায়।মলের মতে,এই সহজাত প্রবনতার উৎপত্তি নন-হিউম্যান প্রাইমেটদের সামাজিক বন্ধন, মা এবং নবজাতকের সম্পর্ক তৈরীর ক্ষমতা থেকে।আমাদের প্রজাতিতে এই ক্ষমতাগুলোই সম্ভবতঃ পরিবর্ধিত হয়,প্যারোকিয়ালিজম (গোত্র স্বার্থপরতা/সংকীর্ণতা), গ্রুপ কোহেসন (গোত্র সংহতি) এবং সামাজিক মুল্যবোধ এবং ধর্মকে প্রতীকী অর্থ যোগ করার প্রবণতাগুলোকে সহায়তা করার জন্য।

এমআইটি’র কগনিটিভ স্নায়ুবিজ্ঞানী লিয়ান ইয়ং এবং রেবেকা স্যাক্স ডান দিকের টেম্পোরাল প্যারাইটাল জাংশান নিয়ে গবেষনা করছেন,যে অংশটি দিয়ে আমরা অন্য কোন মানুষের উদ্দেশ্য যুক্তি দিয়ে বোঝার জন্য ব্যবহার করি। তাদের গবেষনায় তারা যেটা দেখতে চেয়েছেন সেটা হলো, আমরা যখন জানি যে, কোন খারাপ কোন উদ্দেশ্যে কেউ কোন কিছু করছে,এই তথ্যটা তাদের সেই কাজটি নৈতিক না অনৈতিক তা বিচার করার ক্ষেত্রে আমাদের কি প্রভাবিত করে? একটা কাল্পনিক দৃশ্যকল্পে গবেষনায় অংশগ্রহনকারীদের বলা হয়,কেই একজন ভুল করে আরেকজন মানুষের কফিতে চিনি মনে একটা জিনিস ঢেলে দেন, যা আসলে ছিল বিষ।এবং কফি খেয়ে লোকটি মারা যান। অন্য আরেক দৃশ্যে, এখানে কেউ জেনে শুনে আরেকজনের কফিতে বিষ মিশিয়ে দেয়, কিন্তু আসলে সেটা বিষ না চিনি ছিল এবং কোন ক্ষতি হয়নি পানকারীর ।অংশগ্রহনকারীরা প্রায় সবাই মতামত দেন, বিষ খাওয়ানোর উদ্দেশ্যটি,দুর্ঘটনাবশত কাউকে বিষ খাওয়ানোর চেয়ে আরো বেশী অনৈতিক।অংশগ্রহনকারীরা যখন এসব বিচার করছেন তখন fMRI তে রাইট টেম্পোরাল প্যারাইটাল জাংশানটা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এর পরবর্তী পরীক্ষাগুলোয় গবেষকরা এই জায়গাটিকে সাময়িক ভাবে ম্যাগনেটিক পালস (ট্রান্স ক্রেনিয়াল স্টিমুলেশনের মাধ্যমে: যা দিয়ে পারকিনসনিজম আর কিছু দুরারোগ্য বিষন্নতার চিকিৎসা করা হয়)দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখেন।যখন প্রধান ব্রেন কেন্দ্রটি কাজ করেনা,তখন অংশগ্রহনকারীরা আগের সেই পরিস্থিতিগুলোতে কাজের উদ্দেশ্যর চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয় ফলাফলের উপর।ভন্ডুল হয়ে যাওয়া খুনের কাজটাকে অনৈতিক না ভাবার সম্ভাবনা বেড়ে যায় আর ঐ ভুল করে বিষ খাওয়ায় মৃত্যুর ব্যাপারটা দিকে তাদের বিচারের পাল্লা ভারী হয়। তাদের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে গবেষক দুজন দাবী করেন,এই ডান টেম্পোরাল প্যারাইটাল জাংশন শুধুমাত্র এ ধরনের নৈতিক বিচারকার্যেই ব্যবহৃত হয় না বরং নৈতিক প্রশ্নের সমীকরনে কাজটির উদ্দেশ্যকে যুক্ত করার মত গুরুত্বপুর্ণ কাজটি করে অংশগ্রহনকারীদের সেই বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী প্রভাবিত করে।

ছবি: মোরাল ব্রেন: আমাদের ব্রেনের নিউরোইমেজিং স্টাডি করলে দেখা যায় বেশ কিছু অংশ মোরাল কগনিশনের সাথে জড়িত।যেমন ডানদিকের টেম্পোরাল প্যারাইটাল অঞ্চলে (বাদামী), যা ইনটেনশন বা উদ্দেশ্য বুঝতে সহায়তা করে, অথবা ভেন্ট্রোমিডিয়াল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (সবুজ), যা আবেগ প্রসেস করার অঞ্চল,এসব জায়গায় যদি কোন সমস্যা হয় তবে আমাদের নৈতিক বিচার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখা যায়। গ্রীন ও তার সহযোগীরা বলছেন অ্যান্টেরিয়র সিংগুলেট কর্টেক্স (গোলাপী) এর সক্রিয়তা সংকেত দেয় আবেগ (যা মিডিয়াল ফ্রন্টাল জাইরাস(নীল) এবং অন্য কিছু জায়গা যেমন (কমলা ও বাদামী) আর যুক্তি নির্ভর কগনিশনের (ডরসোল্যাটেরাল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স: হলুদ) পারস্পরিক দ্বন্দের। (SCIENCE VOL 320 9 MAY 2008 থেকে)

নৈতিকতার আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট হচ্ছে বহু মানুষের জীবন যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন মানুষের জীবনকে অপেক্ষাকৃত কম মুল্য দেয়।কয়েক বছর আগে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বহু মানুষ উদ্বিগ্ন হয়েছিল একটি ছোট ছেলের বিপদ নিয়ে, যখন ধারনা করা হয়েছিল সে ওয়েদার বেলুনের সাথে একা একা উড়ে গেছে; অথচ আমরা সেধরণের কোন উদ্বেগই বোধ করিনা যখন প্রতিদিন যখন অসংখ্য শিশু আন্তর্জাতিক যুদ্ধের অসহায় শিকার হচ্ছে। অথবা সেই নিষ্ঠুর বাক্যটি উচ্চারণ করা হয়  (যা ধারনা করাহয় স্ট্যালিনের মন্তব্য; যদিও এর সত্যতা সন্দেহজনক) : The death of one man is tragedy ; the death of million is statistic ; এই প্রবণতাটাকে বুঝতে গ্রীন ও তার ল্যাবের পিএইচডির ছাত্র আমিতাই শেনহাভ তাদের গবেষনায় অংশগ্রহনকারীদের একটা উদ্ধারকারী নৌকার চালকের ভুমিকায় কল্পনা করতে বলেন,  যেখানে চালকপানিতে ডুবতে থাকা একজন মানুষকে উদ্ধারের জন্য অগ্রসর হচ্ছে, ঠিক তখনই তারা অন্য একটি নৌকা থেকে ডাক শোনেন, বিপরীত দিকে আরো একটি জাহাজ ডুবিহয়েছে এবং আরোহীরা সব পানিতে ডুবে যাচ্ছে; তাদের আরো বলা হয় আরো একটি উদ্ধারকারী জাহাজ সেদিকে যাচ্ছে তবে তারা সময় মত সেখানে পৌছাতে পারবেকিনা নিশ্চিৎভাবে বলা যাচ্ছে না।প্রথম নৌকার চালক তার সামনের একজন ডুবন্ত মানুষকে বাচিয়ে তারপর নৌকার মুখ ঘুরিয়ে অন্য জাহাজ ডুবির জায়গায় এসেবাকীদের উদ্ধার করতে পারবে না।তাকে অবশ্যই একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গত বছর নিউরণ জার্ণালে প্রকাশিত এই গবেষনাটিতে গ্রীন এবং শেনহাভ যেটা দেখেন তা হলো, এই সিদ্ধান্তটি নিতে ব্রেনের কিছু বিশেষ কিছু জায়গা সক্রিয় হয়ে ওঠে,যেমন ইনসুলা, ব্রেনের যে অংশটি সাধারনতঃ কোন কিছুর সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট ঝুকি নির্নয়ে ব্যবহৃত হয়,এছাড়া ভেন্ট্রাল স্ট্রিয়াটাম, যা কোন কিছুর মাত্রা বা পরিমানপরিমাপ করে। স্তন্যপায়ীরা প্রানীরা মুলতঃ খাদ্য ও প্রজননের জন্য জায়গাটা ব্যবহার করে থাকে।যেমন, একটা কাঠবিড়ালী হয়তো তাদের ব্যাবহার করে কয়টা বাদামমাটিতে পড়ে আছে এবং কোন কুকুরের তাড়া খাবার আগে সেগুলোর কয়টা তার ধরার সম্ভাবনা আছ আপনি হয়তো ভাবতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ১৯৪৫ সালেহয়তো পারমানবিক বোমা ব্যবহারের নির্দেশ দেবার আগে ভেবেছিলেন, কতজন মানুষ মারা যেতে পারে, কিংবা তার এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধকে আরো ভয়ানক দিকে নিয়ে যাবেকিনা. হয়তো তার মনের মধ্যে বিবেকের একটা কন্ঠস্বর তাকে তার সিদ্ধান্তের সম্বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছিল।কিন্তু গ্রীন বলেন, গবেষনায় এই ধারনা দিচ্ছে যে, সম্ভাবনাআর সংখ্যার পরিমাপ সংশ্লিষ্ট কাজগুলোর সময় নেয়া সিদ্ধান্তে আমরা আমাদের  সেই ডিফল্ট সিস্টেমটাই ব্যবহার করি ।

এই নির্ভরতা হয়তো ব্যাখ্যা করে, সম্ভাব্য হতাহতের সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে আমরাও মানুষের জীবনকে কেন কম মুল্য দিতে থাকি।এই সিদ্ধান্তগুলোতেযদি আামরা ব্রেনের এমন একটা সিস্টেমকে ব্যবহার করি যার বিবর্তনীয় উদ্দেশ্যই হচ্ছে কিছু সন্ধান করা যেমন, খাদ্য; আমরা খুব সহজে এমন জায়গায় পৌছে যাইযেখানে সংখ্যা বড় কোন ব্যাপার না।মোট কথা কাঠবিড়ালী তো যে কটা বাদাম সে বহন করে আনতে পারবে তার চেয়ে বেশী কিছু কাজে লাগাতে পারবেনা। গ্রীনের ভাষায় এটি আাপাতত শুধু একটি হাইপোথেসিস; কিন্তু সম্ভবত পরবর্তী ২০ জনের জীবনের মুল্য প্রথম ২০ জনের সমতুল্য না ভাবার  কারন আমরা সেই মুল্যায়ন মেকানিজমটা ব্যবহার করি যা আমাদের ব্রেনের বিবর্তিত হয়েছে খাদ্য মত কোন কিছু সংগ্রহের হিসাবের জন্য।

যতই স্নায়ুবিজ্ঞানীরা গবেষনা করছেন ততই তারা আমাদের প্রকৃতিগত নৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর আজব বৈশিষ্টগুলোই খুজে পাচ্ছেন।ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জোনাথান হাইট দেখিয়েছেন, বিতৃষ্ণা বা বিস্বাদের মত অনুভুতিগুলো আমাদের নৈতিক বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।খুব সহজে এই মানসিক অনুভুতিটার উদ্রেক হতে পারে যেমন তিতা খাবার, খোলা খোস পাচড়া, মল বা বমনের দ্বারা বিবর্তন জীববিজ্ঞানীদের মতে আমাদের ভিতরে এই অনুভুতিটা বিবর্তিতহয়েছে মৃলতঃ রোগজীবানু থেকে নিজেদের রক্ষা করতে, যা কিনা আরো একটু সরলীকৃত হয়ে আমাদেরকে অচেনা যে কোন আগন্তুককে সন্দেহের চোখে দেখতে প্রনোদিতকরে যখন তারা হয়তো অজান্তেই আমাদেরকে নতুন খাওয়া, অভ্যাস বা জীবানু ইত্যাদি নতুন হুমকির মুখোমুখি দাড় করায়।একটি  গবেষনায় হাইট এবং কেমব্রিজ মনোবিজ্ঞানী  সাইমন স্নাল দেখিয়েছেন যে নোংরা কোন পরিবেশে অংশগ্রহনকারীরা নৈতিক উভয় সংকট সমাধানে অপেক্ষাকৃত কঠোর সমাধানটা বেছে নেয়। অন্যএকটি গবেষনায় দেখা যায় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে রক্ষনশীলরা এই বিরুপ অতি বিরক্ত মনোভাব উদ্রেককারী বিষয়গুলোর প্রতি একটু বেশী সংবেদনশীল।

এমন প্রেক্ষাপটে, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডেভিড পিজারো ক্যাম্পাস বিল্ডিং এ ঢোকার সময় এলোমেলো ভাবে শিক্ষার্থীদের বেছে নেন কতগুলো প্রশ্নের উত্তরদেবার জন্য।এক গ্রুপকে তিনি প্রশ্নর উত্তর করতে বললেন হাত জীবানুমুক্ত করার স্যানিটাইজার ডিসপেন্সারের পাশে দাড়ানো অবস্থায়, আরেক গ্রুপকে তিনি একই কাজকরতে দিলেন একটি ফাকা হলওয়েতে দাড়িয়ে। পিজারো দেখলেন যে যারা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের পাশে দাড়িয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর করেছে তারা, হলওয়েতে দাড়ানোগ্রুপটি থেকে তাদের উত্তরের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশী নৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতার পরিচয় দেয়।

পিজারোর মতে হাত জীবানুমুক্ত করার ডিসপেন্সার বা হ্যান্ড স্যানিসাইটাইজারের উপস্থিতি উত্তরকারীকে মানসিকভাবে আরো বেশী সতর্ক বা জীবানু দুষনের ব্যাপারেসচেতন করে তোলে (গবেষনাটি প্রকাশ হয়েছিল Psychology Today জার্ণালে গত এপ্রিলে), পিজারো বলেন, হ্যান্ড সানিটাইজার প্রতীকিভাবে রক্ষনশীল চিন্তাভাবনারকিছু বৈশিষ্টের ব্যাপারে উত্তর কারীদের সংবেদী করে তোলে। যদিও বিরুপ মনোভাব নানা কারনেই হতে পারে যাদের হয়তোসরাসরি নৈতিকতার সাথে যোগাযোগ নেই,কিন্তু তা সত্ত্বে আমাদের নৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে এদের প্রভাব বিদ্যমান। স্পষ্টতঃ এমন সব আবেগীয় প্রতিক্রিয়ার উপর বিশ্বাস করার ব্যাপারটা একটু পিচ্ছিল, যা কিনাহ্যান্ড স্যানিটাইজারের মত সাধারন কোন কিছুর দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে ।

গ্রীনের অফিসে একটি স্টিকার লাগানো আছে, Don’t believe everything you think অর্থাৎ আপনি যা চিন্তা করছেন তার সবকিছুই বিশ্বাস করবেন না। গ্রীন আপাতত যে বইটি লিখছেন এটি হবে তার সার বক্তব্য।তার বইটিতে একটি তুলনা তিনি করেছেন: মোরাল ব্রেন আসলে ক্যামেরার মত, যার একটা অটোমেটিক সেটিং আছেকাছে বা দুরে, ঘরে বা বাইরে ছবি তোলার জন্য এবং এছাড়াও ক্যামেরায় আছে কোন কোন সময়ে বিশেষ ক্ষেত্রে বা আমাদের চাহিদা আর পছন্দ মত কোন বিশেষ সেটিংসহ শৈল্পিক ছবি তোলার জন্য ম্যানুয়াল একটি সেটিং। আমাদের সহজাত চিন্তার বা ইনটুইশনের প্রয়োজন ‍আছে, কারন আমরা সেটি প্রতিদিনের অসংখ্য দ্রুত সিদ্ধান্তনেবার লক্ষ্যে ব্যবহার করি, যা না থাকলে  আমাদের জীবন স্থবির হয়ে পড়তো।কিন্তু সেগুলো সবসময় বিশ্বাসযোগ্য নৈতিক মানদন্ড না যেহেতু তারা আমাদের বিবর্তনের অতীতের সমস্যা গুলোকে মেটাতে উদ্ভব হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক জীবনের জটিলতা মোকাবেলা করার জন্য তারা যথেষ্ঠ না। আমাদের ম্যানুয়াল সেটিংএর উপর ভরসা করার প্রয়োজন সে কারনেই ; আমাদের ব্রেনের যুক্তির জায়গাকে ব্যবহার করতে হবে আরো নতুন আর জটিল পরিস্থিতিতে।

সেকারনে এ ধরনের আরো গবেষনার প্রয়োজনীয়তা আছে। এর ফলে আমরা আমাদের ব্রেনের নৈতি নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারে সচেতন হতে পারবো। আমাদের মনের ভিতর আবেগের সাইরেন আমাদের অনুৎপাদনশীল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচনা দেবে, তখনই আমাদের ‍উচিৎ হবে ব্রেনের যুক্তির কন্ঠস্বর আরো জোরালো করে সঠিক সিদ্ধান্তটি নেয়া। গ্রীনের মতে যখনই আমাদের নৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে সেই স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমটাকে আমরা পরাস্ত করতে পেরেছি তখনই আমরা ব্যক্তিগত,গোষ্ঠীগতভাবে বা সামাজিক স্তরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পেরেছি, এমনকি যখন আমরা নিজেরাই বুঝতে পারিনি এই কাজটাই আমরা করছি। আমরা যদি আবেগ আর অনুভুতিকে একপাশে সরিয়ে যদি যদি যুক্তি নির্ভর চিন্তার প্রক্রিয়াটিকে প্রাধান্য দিতে পারি তাহলেই কেবল স্বয়ংক্রিয় সেই আদিম অনুভুতি নির্ভর নৈতিকতার দাসত্ব থেকে আমরা মুক্তি পাবো।

( To be continued….)

Advertisements
নৈতিকতার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক উৎসের সন্ধানে :

11 thoughts on “নৈতিকতার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক উৎসের সন্ধানে :

  1. প্রথম ছবি। ট্রলি প্রবলেম। যারা এটা ডিজাইন করেছেন, ও পরবর্তীকালে এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন তাঁরা আমার বিশ্বাস আরও কিছু ফ্যাক্ট মার্ক করেছেন।

    ১-লাল কাপড় পড়া যে লোকটাকে ফেলে অন্য ৫জনের জীবন বাঁচানোর কথা বলা হচ্ছে, তাঁর জীবন কোন অধিকারে কেড়ে নেয়া হবে, যখন সে এ উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য কোনভাবেই দায়ী নয়? হ্যাঁ, গ্রীণ এটার উত্তর দিতে পারবেন ইউটিলিটারিয়ানিজম দিয়ে। কিন্তু তারপরও অধিকার হরণ করে নেয়াটা কি যৌক্তিক হবে?

    ২-প্রথম পয়েন্টের সূত্র ধরে আমার মূল প্রশ্নে আসছি, প্রথম ফিগারে যে ৫ জন মানুষকে নিচে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে, তারা কেন ট্রলির লাইনের উপর এমন উদাসীন ভঙ্গিমায় থাকবে( উদাসীনতা বা নিজের রেসপন্সিবিলিটির প্রশ্নটা ক্রিটিক্যাল ভূমিকা রাখতে পারে)? এক্ষেত্রে দায়টা কিছুটা হলেও তাদেরই। আর এরকম দায়ী কিছু ব্যক্তির জন্য শতভাগ নিরপরাধ একজনকে উপর থেকে ফেলে দেয়া কতটুকু যৌক্তিক হতে পারে? আমি গণিতে ভালো না, তারপরও একটা সমীকরণ দাড় করাতে চেষ্টা করছি। ০, ১ আর ৫ এর মধ্যে সম্পর্ক কেউ দেখিয়েছেন এভাবে,

    ১/০ > ৫/১ ……কোন কারণ ছাড়াই একজনকে মেরে ফেলা, ৫ জন কিছুটা দায়ী ব্যক্তির জন্য ১ জনকে বাঁচানোর চাইতে বেশি অন্যায়। কান্ট মনে হয় এভাবেই দেখবেন ব্যাপারটা।

    আবার, ৫-১ > ১-০, গ্রীণ কি এটার দিকেই যাচ্ছেন।

    (আমার সমীকরণটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা, সেটাও বড় একটা প্রশ্ন হতে পারে 😛 )

    ৩- যে ব্যক্তিটা প্রথমবার এরকম একটা ট্রলির ঘটনা দেখবে, এবং বেশিসংখ্যক মানুষকে বাঁচানোর দিকে যাবে, দ্বিতীয়বার সিদ্ধান্ত নেবার সময় প্রথমবারের অভিজ্ঞতা বড় একটা ভূমিকা রাখবে। একই পরিস্থিতি বারবার দেখার অভিজ্ঞতা মানুষের মাঝে কিছু পরিবর্তন এনে দেবে।

    ৪-কেউ কেউ আবার কোন কিছুই না করে বসে থাকবে। নিজে কেন এই গুরু দায়িত্বের ঝামেলায় জড়াতে যাবে? আবার অনেকের অবস্থা হবে প্রথাগত সিনেমার দর্শকের মত। দর্শক দেখছে নায়ক আর নায়িকা দুজনেরই জীবন বিপন্ন। কিন্তু বাঁচানো যাবে একজনকেই। তারা তখন অপেক্ষা করবে নিজে থেকে অন্য কিছু পুরোপুরি নতুন কিছু ঘটুক। হয়তবা তখন দেখা গেল, হঠাত করে সেকেন্ড নায়ক আর সেকেন্ড নায়িকা দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন। সব হিসেব পাল্টে দিয়েছেন।

    আমার চিন্তাগুলো যদি যৌক্তিক হয় তবে এগুলো নিয়ে তাঁরা অনেক আগেই ভেবে থাকবেন।

  2. আসলে ট্রলী প্রবলেমটা হচ্ছে একটা থট প্রবলেম।
    অন্যভাবে বিশ্লেষন করা যাবে বলে মনে হয় না আমার। প্রেমিস টাই কাল্পনিক। আমাদের এখানে একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, ঠিক বা ভুল কোন উত্তর নেই বিষয়টির। বিশ্লেষনের বিষয়টিকে মনোবিজ্ঞানীরা আর নিউরোসায়েন্টিষ্টরা আলাদা করে দেখছেন। মনোবিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্ঠা করছেন কিভাবে আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌছাই আর স্নায়ুবিজ্ঞানীরা পুরো প্রক্রিয়াটাকে আমাদের ব্রেণের নানা অঞ্চলে কার্যক্রমকে ম্যাপ করছেন, আর এসব জায়গায় যদি কোন সমস্যা হয়,তারা দেখাতে চাচ্ছেন কিভাবে তা আমাদের উত্তরকে প্রভাবিত করে। এখন দুই গ্রুপ একসাথে কাজ করছে।
    সুতরাং এটা ব্যবহার করা হয় একটা স্টাডি টুল হিসাবে, যা আমাদের ব্রেনকে যেন বাধ্য করে ভাবতে এবং একটা উত্তরে পৌছাতে; কোন ধরনের অ্যাম্বিগুয়াস উত্তর এখানে সম্ভব না। কারন অস্পষ্টতা থাকলে আমরা স্টাডির কোন আইটকাম মেজার করতে পারবো না। ডিসিশন নেবার প্রসেসটাকে আমরা যে কোন ডিসিপ্লিনেই পরিমাপ করতে পারবো।
    বৃটিশ দার্শনিক ফিলিপ্পা ফুট যখন এটা দর্শনের সমস্যা হিসাবে পরিকল্পনা করেছিলেন আমার মনে হয় তখন তিনি আসলে মোরালিটির একটা যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা খুজতে চেয়েছিলেন। যে কোন সমস্যাতে আমাদের একটা নিজস্ব দ্রুত প্রতিক্রিয়া আছে, মোরালিটির ক্ষেত্রেও তাই;গোত্রবদ্ধ মানুষ পারস্পরিক সহায়তা, সাহায্য, সহমর্মিতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অনেক রেসপন্সই আসলে আমাদের ব্রেণে হার্ডওয়ার করা আছে; আমাদের তাই তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হয় অন্যরকম; ট্রলী প্রবলেমে একগ্রুপ মানুষের কাছে বেশী মানুষের জীবন বাচানোটা নৈতিক মনে হবে, কারন অন্য অপশনটাতো কোন অপশনই না তাদের কাছে, কিছুই না করা। আবার অন্য গ্রুপের কাছে কিন্ত একটা অন্যায়তো হচ্ছেই, কোন এক পাগলা দার্শনিক ঘটনাটা ঘটাচ্ছে, এখানে যুক্ত হওয়া তাদের কাছে অনৈতিক হবে, এছাড়া কোন দুটো মানুষের জীবনকে একই ভাবে পরিমাপ করাও অসম্ভব শুধুমাত্র ডিফল্ট আবেগের ভিত্তিতে।
    আমেরিকান দার্শনিক জুডিথ থমসন এখানে আরেকটি চরিত্র নিয়ে আসেন, ফুটব্রীজের উপর দাড়ানো একজন মোটা লোক; এখন দেখা যাচ্ছে যারা একজনের মৃত্যুকে ৫ জনকে বাচানোর প্রক্রিয়ায় একটি সাইড ইফেক্ট মনে করছিল, তারা এখানে মত বদলায়, কারন পাচজনকে বাচাতে তাদের সরাসরি উদ্দেশ্যমুলকভাবে একজনকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু যুক্তি বলছে ঘটনাটা একই। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়, এটাকে কেউ বলছেন ডকট্রিন অব ডাবল ইফেক্ট, অর্থাৎ ২য় ঘটনায়, আমাদের ইনটেনশনালী কাউকে হত্যা করতে হবে ৫ জনকে বাচাতে, কিন্ত প্রথম ঘটনায় সেই ইনটেনশনটা ছিল না, এই ডকট্রিণটা বলছে আমরা ভালো উদ্দেশ্যে এমন কিছু কাজ করতে পারি যার হয়তো খারাপ পার্শ প্রতিক্রিয়া আছে, কিন্তু ভেবে চিন্তে ভালো কাজের জন্যও কোন খারাপ কাজ করা অনৈতিক। এর পরিকল্পক দার্শনিক জুডিথ বলছেন;এখানে মানুষকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনটি থামানের পরিস্থিতির সাথে সুইচ সিনারিওর পার্থক্য হলো, সুইচ এর ক্ষেত্রে আমরা শুধু ক্ষতিটা অন্য দিকে সরিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু মানুষের সিনারিওতে আপনাকে একটা মানুষের সাথে সরাসরি কিছু করতে হবে অন্যদের জীবন বাচানোর জন্য। আগের দৃশ্যে কারোর ট্রেনে চাপা না পড়ার বাড়তি অধিকার নেই, পরের ক্ষেত্রে, অন্য মানুষটি সমান অধিকার আছে বাচার, তাকে ট্রেনের সামনে ফেলে দিয়ে বাকীদের বাচার কোন বাড়তি অধিকার নেই। এখানে আরো অনেক লুপ আছে, যারা উপযোগবাদী তারাও এর বিপক্ষে আছেন; এটা দার্শনিক দিক।
    স্নায়ুবিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে যেটা দেখার তা হলো আমাদের ব্রেনের মধ্যে এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে যে টানাপোড়ন চলে তা ম্যাপ করা। কেন এই টানাপোড়েন চলে কারন আমাদের যৌক্তিক মন আবেগ নির্ভর মোরাল জাজমেন্টটাকে পরাস্ত করার চেষ্টা করে।

  3. Don’t believe everything you think !!! ….

    আর সবচাইতে ভালো লাগলো দেখে, To be continued!

    চমৎকার। বিষয়বস্তু এবং লেখা দুইটিই। এটা কি কোন অনুবাদ? তথ্যসূত্র কি??

    দর্শন কিভাবে স্নায়ুমনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রভাবিত করে? বিজ্ঞান কিভাবে দর্শনকে প্রভাবিত করে?
    খুব গোড়ার গবেষণা। কিভাবে আমরা চিন্তার করি? আমাদের নৈতিকতার ভিত্তি কি?
    ক্যামেরার তুলনাটা অসাধারণ। ক্যামেরার অটো মুডটা এসেছে “সম্ভবত” বিবর্তন থেকে। আবেগ এর ভিত্তি। ম্যানুয়াল মুড এসেছে আমাদের যুক্তিপ্রবণতা থেকে।

    পরের পোস্ট পড়ার আগে একবার রিভিশন দেয়ার আশা রাখি …

    ভালো লাগলো। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

    বু

    1. অনেক ধন্যবাদ… ; আসলে দর্শনের মুল সব টেনেটগুলো বিজ্ঞান এখন নাড়াচাড়া করছে। বিশেষ করে যেভাবে আমরা চিন্তাগুলো করি। আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়াগুলো। আমাদের ইন্সস্টিঙ্ট গুলো সবই আসলে বিবর্তনের কারনে। গোত্রবদ্ধ মানুষ নৈতিকতার জন্ম দিয়েছে বহু দিন আগে; জশূয়া গ্রীন দার্শনিক এবং নিউরোসায়েন্টিষ্ট; আমার মনে হয় প্রথম অ্যান্তোনিও দামাসিও নিউরোসায়েন্সের আলোকে প্রথম দর্শনকে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছিলেন তার দেকার্তেস এরর বইটিতে। একই সাথে এখানে যোগ দিয়ে সামাজিক মনোবিজ্ঞানীরা, যেমন পরিচিত জোনাথান হাইট। স্যাম হ্যারিস, একজন নিউরোসায়েন্টিষ্ট তার মোরাল ল্যান্ডস্কেপ চমৎকার একটা বই। বিজ্ঞান তো সব অজানাকে জানতে চায়….

      এটা মুলত: অনুবাদ…কিছু বাড়তি তথ্য আছে; আমি উপরে তথ্য সুত্র দিয়েছিলাম 🙂
      আমার পরিকল্পনা ছিল দুটো ল্যান্ডমার্ক পেপারকে এক করে কিছু লিখবো, পরে শুধু জশূয়া গ্রীনের দিকেই থেকেছি;

      To be continued লিখে চিন্তায় আছি 🙂 ; আমি আসলে এটা নিয়ে সেকেন্ড পেপারটা আর স্যাম হ্যারিসের মোরাল ল্যান্ডস্কেপ থেকে কিছু লেখার ইচ্ছা পোষন করি; এখন সময় পাওয়াটাই বড় ব্যাপার। রুটি রুজির যুদ্ধের অবসরে যতটুকু হয়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s