যারা AIDS এর কারন খুজে বের করেছিলেন:


HIV (হিউম্যান ইম্যুনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) ভাইরাসটির একটি ত্রিমাত্রিক মডেল (সুত্র: 3Dscience.com)

আশির দশকের শুরুতে  AIDS বা অ্যাকোয়ার্ড ‌ইম্যুনোডেফিসিয়েন্সী সিন্ড্রোম এর কারন HIV (হিউম্যান ইম্যুনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) ভাইরাসটিকে প্রথম শনাক্ত করা হয়। এই গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারটি কে প্রথম করেছেন তা নিয়ে বিতর্ক চলেছে বেশ কয়েক বছর। নব্বই দশকের শুরুতেই মোটামুটি এ বিতর্কের সমাধান হয়ে যায় এবং বিজ্ঞানীরা কার অবদান কতটুকু তাও বুঝতে পারেন। এছাড়া ততদিনে বিজ্ঞানী সমাজ ফরাসী ভাইরোলজিষ্ট ল্যুক মন্তানিয়ের এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ এবং ভাইরোলজিষ্ট রবার্ট গ্যালোকে এই ভাইরাসটির যৌথ আবিষ্কারক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দুজনেও ব্যাপারটা সমঝোতা করে নেন একসময়।


ল্যুক মন্তানিয়ের, Luc Antoine Montagnier (born 18 August 1932) (Wikipedia)

ল্যুক মন্তানিয়ের সাথে ছিলেন আরো একজন ফরাসী ভাইরোলজিষ্ট ফ্রাসোয়া বারে-সিনুসী, তারা দুজন AIDS আক্রান্ত এক রোগীর লিম্ফ নোড থেকে প্রথম পৃথক করেছিলেন ভাইরাসটি, যার নাম তারা দিয়েছিলেন LAV ( Lymphadenopathy Associated Virus)। তারাই প্রথম এ বিষয়ে তাদের গবেষনা পত্র প্রকাশ করেন, কিন্তু তখনও তারা নিশ্চিৎ ছিলেন না এই ভাইরাসটি AIDS  এর কারন কি না।


ফ্রাসোয়া বারে-সিনুসী, Françoise Barré-Sinoussi (born 30 July 1947) (Wikipedia)

এর পরের বছরই যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট গ্যালো প্রকাশ করেন তার টিমের গবেষনার ফল, তিনি এই ভাইরাসটির নাম দেন HTLV –III ( Human T Lymphotropic Virus); এবং তিনি সুষ্পষ্ট ভাবেই এটিকে AIDS এর কারন হিসাবে চিহ্নিত করেন। এছাড়া এই ভাইরাসটি কার্যপ্রণালী সম্বন্ধে মৌলিক বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ তথ্য আবিষ্কার করেন।


রবার্ট গ্যালো, Robert Charles Gallo (born March 23, 1937) (Wikipedia)

এখানেই বিতর্কটি শুরু হয়। ল্যুক মন্তানিয়ের এর ল্যাবের সাথে গ্যালোর ল্যাবের যোগসুত্র বহুদিনের; কারন দুজনেই ক্যান্সার করতে পারে এমন ভাইরাস নিয়ে কাজ করছিলে বহুদিন ধরেই। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসলে দুজনেই একই ভাইরাসটিকে আবিষ্কার করেছেন, আর গ্যালোর ল্যাবে ভাইরাসটি এসেছে লুক মন্তানিয়েরই পাঠানো অন্য একটি নমুনার সাথে (অন্য একটি ভাইরাস), ঘটনাচক্রে সেই রোগীর শরীরে আসলে দুধরনের ভাইরাসই আসলে ছিল ( যে ভাইরাসের নমুনা পাঠানো হয়েছে, আর যে ভাইরাসটি AIDS এর কারন।

এই বিতর্ক  প্রভাব ফেলেছিল এর শনাক্তকারী টেষ্ট তৈরীর প্রক্রিয়ার উপর, যা হয়তো ক্ষতি করেছে অনেক রোগীর, বিশেষ করে ফ্রান্সে। অবশেষে এই বিরোধের মধ্যস্থতা করেন দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। পরবর্তীতে ভাইরাসটিকে নতুন নাম দেয়া হয় HIV ( Human Immunodeficiency Virus)। বর্তমানে ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্র এর যৌথ ভাবে এর ডায়াগনষ্টিক টেষ্টের পেটেন্টের মালিক।

২০০৮ সালে জন্ম হয় এই বিতর্কের দ্বিতীয় অধ্যায়, যখন নোবেল কমিটি এই আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার ঘোষনা করেন। তারা এই পুরষ্কার থেকে রবার্ট গ্যালোকে বাদ দেন কোন অবদান উল্লেখ ছাড়াই, যার এই ক্ষেত্রে অবদান স্পষ্টতই সবচেয়ে বেশী। সে বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনজন নোবেল পুরষ্কার পান, HIV ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য ফরাসী ভাইরোলজীষ্ট ল্যুক মন্তানিয়ের, ফ্রাসোয়া ব্যারে-সিনুসী এবং জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের কারন হিসাবে HPV বা হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের যোগসুত্র আবিষ্কারক জার্মান ভাইরোলজীষ্ট হ্যারাল্ড জুর হাউসেন।

ব্যাপারটা বিস্মিত করে বিজ্ঞান সমাজকে। কারন হিসাবে বলা হয়, প্রয়াত আলফ্রেড নোবেল নিয়ম করে গেছেন, কোন কিছুর প্রথম আবিষ্কারককে পুরষ্কৃত করা হবে, এর পরের জনকে না;  আর কমিটি নিয়ম অনুযায়ী ৩ জনের বেশী পুরষ্কার দেয়া যাবে না ইত্যাদি।

রবার্ট গ্যালো নোবেল পুরষ্কার পাননি বটে, কিন্তু এই বিষয়ে যারা গবেষনা করছেন তারা জানেন তার অবদানগুলো, তার পেপারগুলোই মুলত: রেফারেন্স হিসাবে গবেষনাপত্রে সবচেয়ে বেশী উল্লেখ করা হয়। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ Laskar অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন দুবার।

পরবর্তীতে AIDS এর কারন HIV ভাইরাসটির আবিষ্কারক এই তিন জন বিজ্ঞানী এ বিষয়ে আরো অনেক গুরুত্বপুর্ণ অবদান রেখে গেছেন এবং বর্তমানে ল্যুক মন্তানিয়ের ছাড়া বাকী দুজন এখনও গুরুত্বপুর্ণ দ্বায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন HIV/AIDS  গবেষনার ক্ষেত্রে।

Advertisements
যারা AIDS এর কারন খুজে বের করেছিলেন:

7 thoughts on “যারা AIDS এর কারন খুজে বের করেছিলেন:

  1. এইডস যত না মানুষ মেরেছে, তার চাইতে বেশি মানুষ মারা গেছেন এর জটিল চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে। এইচআইভি ভাইরাসকে এতো ভয়াবহ ভাবে দেখানো হয়, অথচ ভাইরাসটা তুলনামূলক ভাবে অনেক শান্ত প্রকৃতি, পোষকে এর সংক্রামণ করানো অনেক কঠিন। দেহে ঢুকে গেলে স্থায়ী ভাবে জায়গা করে নিতে এর লাগে বছরের পর বছর সময়।
    পোস্ট ভালো লেগেছে। দুঃখিত, অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যের জন্য 🙂

  2. অনেক ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য… 🙂

    প্রথম দিককার অ্যান্টি রেট্রোভাইরালদের তুলনায় নতুন জেনারেশনের ড্রাগ গুলোর সাইড ইফেক্ট কমে গেছে বহুদিন হলো, আর বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে এ ঔষধগুলো জীবন বাচাচ্ছে বহু মানুষের। এছাড়া আক্রান্ত মা থেকে শিশুকে রক্ষা করতে এটি ভীষন কার্যকর। মুল রাজনীতিটাই হলো পৃথিবীর বহু আক্রান্ত মানুষ এই চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও পাচ্ছে না।, কারন যারা এই ঔষধগুলো তৈরী করছে তারা যেমন দাম কমাচ্ছে না, তেমনি অনেকদেশে জেনেরিক ড্রাগগুলো তৈরী করতে বাধা দিচ্ছে (ব্রাজিল আর ভারত এর মধ্যে থেকে বের হয়ে এসেছে)। ১৯৯৮/৯৯ সালে এম ফিল করার সময় একটি মাত্র ড্রাগই ছিল (AZT), আমরা সেটা দিয়েছিলাম বেশ কয়েকজনকে, বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দেয়া হতো, আমাদের দেশে শনাক্তকৃত রোগী কম ছিল, ড্রাগটি বিভিন্নভাবে জোগাড় করা হতো। কোন সময় চিকিৎসাটা শুরু করতে সেটার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। এখনতো কম্বিনেশন থেরাপী আরো কার্যকর।২০০৭ পর্যন্ত জানি ঔষধ আমাদের দেশে এখনো দুষ্প্রাপ্য। কিন্ত এরা কার্যকরী…

    ঠিক, আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীর থেকে অন্য শরীরে সংক্রমনের হার তুলনামুলক ভাবে কম; কিছু কিছু পরিস্থিতিতে তা অনেকাংশে বেড়ে যায়, দুর্ভাগ্য যে পৃথিবী বহু জায়গায় সেই পরিস্থিতিগুলো এখনো আছে। শুধু মাত্র পলিসি যারা বানায় তাদের স্বার্থটার সাথে বিষয়টা অ্যালাইন হচ্ছে না।

    যেহেতু ভাইরাসটি আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষাকারী কোষগুলোর ডিএনএর সাথে যুক্ত হয়ে যায়, সেখান থেকে একে মুক্ত করা পুরোপুরি সম্ভব না। ঠিক প্রথম সংক্রমন থেকে AIDS এর পর্যায়ে আসতে সময় নেয় বহুবছর, রোগটা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এটি একটি জটিল সমস্যা। আমি আমাদের দেশেই ১৯৯২/৯৩ সালে শনাক্ত হ্ওয়া রোগীকে এখনও কর্মক্ষম দেখেছি। তাদের কয়েকজনকে দেখলে বরং অবাকই হতে হয়। ( অবশ্য ভাইরাসটি বেশ কিছু ক্ল্যাড যাছে তারা আলাদা কিছু রোগতাত্বিক চেহারা দেখায়)।

    এই রোগটির সাথে আসলে অনেক রাজনীতি আছে, যা এর শুরু থেকেই এর সাথে গাটছড়া বেধে আছে; এর সাথে আমাদের সামাজিকভাবে অযৌক্তিক মোরাল জাজমেন্ট জড়িয়ে আছে। অথচ সত্যটার মুখোমুখি হয়ে একটু প্র্যাগমাটিক হলে এর প্রতিরোধ সহজ হয় অনেক। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ তা প্রমানও করে দেখিয়েছে। …

    1. অনেক অগ্রগতি হয়েছে. কিন্তু ভাইরাস যেহেতু আমাদের টি হেল্পার সেল গুলোর ডিএনএ তে নিজেদের অ্যাটাচড করে ফেলে, তাই বর্তমান এপ্রোচ এখনো এদের সংখ্যা বাড়তে না দেয়া;
      HAART থেরাপি বহু মানুষের জীবন বাচাচ্ছে. সবচে বড় একটা সুবিধা হলো চিকিৎসা যেহেতু রক্তে ভাইরাসের পরিমান কমিয়ে দেয়. এটি indirectly transmission এর উপরও impact রাখতে পারে।
      মা থেকে শিশুর না ছড়ানো জন্য prophylaxis টাতো খু্বই কার্যকরী; আত্রান্ত শিশুদের Anti-retroviral drug গুলো দিয়ে চিকিৎসা করা বেশ সমস্যা;
      ভ্যাক্সিন নানা কারনে খুব সহজে পাওয়া যাবে না, একটা ট্রায়াল থাইল্যান্ডে হয়েছে, কিন্তু তেমন আশা করা হচ্ছে না, অনেকগুলো ক্যান্ডিডেট ভ্যাক্সিন আছে…নতুন অ্যাপ্রোচ ও করা হচ্ছে। এখনও prevention টাই priority:
      HIV একটু অন্যধরনের ভাইরাস, এর বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন তৈরী করাটা নানা কারনে চ্যালেজ্ঞিং (এটা নিয়ে একটা পোষ্ট লেখা যায় 🙂 ))

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s