তুমি কি আমার মা?


(শীর্ষছবি: রবিন পাখির ডিমের সাথে কাউ বার্ডের ডিম। সুত্র: robin and cowbird eggs)© Don Johnston/Getty/NOVA)

(নোভা অনলাইন এ র‌্যাচেল ভ্যান কট এর একটি স্লাইড শো Are you my mother? কিছুটা পরিবর্ধন করে)

যদি ভেবে থাকেন, ছলনার আশ্রয় নিয়ে নিজের স্বার্থে আরেকজনকে ব্যবহার করা কেবল মানুষেরই বৈশিষ্ট্য, তাহলে মনে হয় আমার এই ছোট লেখাটি আপনার ভুল ভাঙ্গাতে কিছুটা হলেও সফল হতেও পারে। কারন প্রাণীজগতে বেশ কিছু প্রাণী যেমন, মাছ, কীটপতঙ্গ এবং বিশেষ করে পাখীদের মধ্যে দেখা যায় যে, তারা নানা ধরনের ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে অন্য কোন প্রজাতির প্রাণীকে দিয়ে তাদের নিজেদের সন্তানদের লালন পালনের কাজটি, যেমন, বাচ্চাদের খাইয়ে দাইয়ে বড় করে তোলা এবং শক্র শিকারী প্রাণী থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি কঠিন সব কাজগুলো স্বার্থপরের মত করিয়ে নেয়। এ ধরনের আচরণকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ব্রুড প্যারাসিটিজম (Brood parasitism), যার একটা ভাবসূচক বাংলা অর্থ করা যায়, প্রজনন পরজীবি।

পাখীদের পালক সন্তান প্রতিপালন বা ব্রুড প্যারাসিটিজম :

বাদামী মাথার কাউ বার্ড (Cow bird) দেখতে কিন্তু আদৌ ভিলেনের মত না। কিন্ত এই প্রজাতি সহ আরো অনেক  প্রজাতির পাখি, এমনকি কীটপতঙ্গ এবং মাছের মধ্যে ব্রুড প্যারাসাইটের আচরন লক্ষ্য করা যায়। ব্রুড প্যারাসাইট শব্দটি দিয়ে পরিবেশবিজ্ঞানীরা এমন প্রানীদের বোঝান, যারা  অন্য কারোর উপর তাদের সন্তানদের দেখাশোনার দায়ভার  চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে পিতামাতার দায়িত্বটি এড়িয়ে যায়; আর অজান্তেই নীরিহ কোন পালক পিতামাতা তাদের নিজেদের সন্তানের মতই পরজীবি প্রানীর সন্তানকে লালন পালন করে বড় করে তোলে। এই লালন পালন করার জন্য তাদের দুরুহ এবং কষ্টসাধ্য সব কাজই করতে হয়, যেমন, নিয়মিত  খাদ্য সরবরাহ করা, শিকারী প্রানী থেকে নীড়ের সন্তানদের রক্ষা করা  ইত্যাদি।

কিন্তু এই সব ব্রুড প্যারাসাইট বা  প্রজনন পরজীবি প্রানীরা অন্য আরেক প্রানীর উপর তাদের নিজেদের দ্বায়িত্ব চাপিয়ে দিতে আসলে কি ধরনের ছল চাতুরীর আশ্রয় নেয় ? দেখা যায়, এ কাজটি করতে গিয়ে তারা কখনো আশ্রয় নেয় খুব সুক্ষ প্রতারনার কৌশলের আর কখনো একেবারে সরাসরি হিংস্র আক্রমন আর প্রতিযোগিতা।


ছবি ১:  রবিন পাখির ডিমের সাথে কিন্ত বিচিত্র রঙের ছোপ ছোপ দাগওয়ালা কাউ বার্ডের ডিমের কোন মিলই নেই । অথচ ঠিকই এই ব্রুড প্যারাসাইটের ছানাটি রবিন পরিবারের অন্য ছানাদের সাথে বেড়ে উঠবে। (সুত্র: robin and cowbird eggs)© Don Johnston/Getty/NOVA)


ছবি ২ :  বাদামী মাথার বা ব্রাউন হেডেড কাউ বার্ড ( সুত্র: http://animal.discovery.com/guides/wild-birds/gallery/brown-headed_cowbird.jpg)


ছবি ৩ :   ইউরোপিয়ান রবিন ( সুত্র: http://1.bp.blogspot.com/_E3P-Z4qQHY0/TPyle1BTMsI/ AAAAAAAAA_Q/0Nkl60eWoLQ/s1600/ European%2BRobin%2BPhoto.JPG)

কাউ বার্ড  ( Cow bird):

কখনোই কোন ঘর বাধে না, কাউ বার্ড । প্রায় ২২০ প্রজাতির পাখিদের বাসায় এরা তাদের ডিম লুকিয়ে রাখে, পালক মা যাতে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। তারপর নজর রাখে ডিমটি নিয়ে পালক পাখীর পরিবারটি কি করছে। যদি তারা এই ডিমটাকে তাদের নিজেদের ডিম মনে করে পালতে থাকে, তাহলে কাউ বার্ড এই পরিবারটিকে কোন ঝামেলা দেয়না। কিন্ত যদি  তার ডিমটাকে নতুন পরিবার তাদের নিজেদের না বলে পরিত্যাগ করে, তাহলে কাউবার্ড সেই পোষক পাখীর সাজানো নীড় ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। এই হিংস্র ব্যবহারের কারনে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এদের নাম দিতে বাধ্য হয়েছেন ‘মাফিয়া পাখী’; যদি পালক পাখী মা তার  ডিমের সাথে কাউবার্ডের ডিমে তা দেয়, দেখা যায়, কাউবার্ডের পাখির ছানা পালক পাখীর ডিম ফোটার আগেই ডিম ফুটে বের হয়ে যায়। যদিও পরজীবি এই ছানা তার পালক পাখির ছানাদের প্রতি সাধারনতঃ কোন হিংস্র আচরন করেনা। কিন্ত এর গলার আওয়াজ সবচেয়ে বেশী, এরা উচ্চস্বরে কাদে, এবং পালক মা’র কাছে খাওয়ার বড় অংশটা দাবী এবং জোর করে আদায় করে নেয়। যার ফলে প্রায়ই পালক মা’র নিজের সন্তানদের অনাহারে মরতে হয়।


ছবি ৪ :  কাউ বার্ডের ছানা (ডানে), বোঝাই যাচ্ছে পালক রেন পাখির ছানাদের এরা খাওয়া পাবার প্রতিযোগিতায় টিকতেই দেবে না ( সুত্র:  cowbird and wren nestlings© Rolf Nussbaumer/imagebroker.net/NOVA)


ছবি ৫:  রেন ( Wren)( সুত্র:  http://www.hiltonpond.org/images/ WrenWinter03.jpg)

হানিগাইড  (Honeyguide):

হানিগাইড হলো ব্রুড প্যারাসাইট পাখীদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং নৃশংস প্রকৃতির। যখন স্ত্রী হানিগাইড অন্য পালক পাখির বাসায় ডিম পাড়ে, সাধারণতঃ অন্ধকার গর্তে ঘর বাধে এমন কোন পালক পাখির বাসায়, যাতে পালক পাখীর ডিমের সাথে তাদের ডিমটা মিশে যায়। পালক মা অন্ধকারে যেন তা আলাদা করতে না পারে। এমন পালক পাখির বাসায় ডিম পাড়ার সময়, এই মা হানিগাইড পাখিটি পালক পাখির ডিমগুলোকে মাঝে মাঝে ঠোট আর পায়ের নোখ দিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে যায়। যখন পালক মা’র ডিমে তা দেবার পর হানিগাইডের ছানা ডিম ফুটে বের হয়, তারাও সাথেই সাথেই তাদের ঠোটের মাথায় থাকা একটা বাকা হুকের সাহা্য্যে, অন্য ডিমের খোলস ভেঙ্গে বা খুচিয়ে খুচিয়ে, ঠোকর দিয়ে পালক মা পাখির বাকী ছানাগুলোকেও শেষ করে দেয়। অসহায় পালক মা না বুঝে তার মৃত বাচ্চাদের বাসা থেকে ফেলে দিয়ে আর এই পরজীবি পাখির ভয়ঙ্কর ছানাটাকে পেলে পুষে বড় করে।


ছবি ৬ :  হানিগাইড মা এবং তার ছানা, দুজনেই তারা তাদের নিজস্ব উপায়ে পালক পাখির সন্তানদের আক্রমন করে ( সুত্র: honeyguide © Nigel J. Dennis, Gallo Images/CORBIS/NOVA)

ইন্ডিগোবার্ড (Indidobird):

ইন্ডিগোবার্ডের প্রজনন পরজীবিতার কৌশলটা বেশ সুক্ষ। স্ত্রী ইন্ডিগোবার্ড শুধুমাত্র যে পালক প্রজাতির বাসায় সে ছোটবেলায় প্রতিপালিত হয়েছে, শুধু সেই প্রজাতির পাখির বাসায় তার ডিম পাড়বে। এবং সে তার প্রজনন সঙ্গী হিসাবেও বেছে নেবে, সেই একই প্রজাতির কোন পালক পাখির বাসায় প্রতিপালিত হয়েছে কোন পুরুষ ইন্ডিগোবার্ডকে। প্রশ্ন জাগতে পারে কিভাবে সে চিনতে পারে? উত্তরটা হলো গান শুনে, কারন পুরুষ পাখিটি তার পালক পরিবারের একই সুরের গানটা গাইতে শেখে।  স্ত্রী পাখিটি এধরনের পছন্দের অর্থ হলো, যেহেতু তার মা ও বাবা এই পালক প্রজাতি পাখির পরিবারের  গৃহীত হয়েছিল, তাদের সন্তানও তাদের দুজনের কাছ থেকে কিছু বৈশিষ্ট উত্তরাধিকার সুত্রে পাবে, যা তাদের পালক পরিবারের সাথে সহজে মিশে যেতে সহায়তা করবে। পাখির ছানা ডিম ফুটে বের হবার সাথে সাথে মিশে যায় তাদের পালক মা’র অন্য সন্তানদের সাথে।


ছবি ৭ :  পুরুষ ইন্ডিগোবার্ড তাদের পালক বাবা মার গান শিখে নেয় ( সুত্র: indigobird © Stan Osolinski/Oxford Scientific/NOVA)

ক্লিফ সোয়ালো (Cliff Swallow):

সব ব্রুড পারাসাইট পাখিরা কিন্তু তাদের সন্তান প্রতিপালনের জন্য যে অন্য প্রজাতির পাখিদের সাথে ছলনা করেনা তা কিন্তু না। কেউ কেউ – যাদের কনস্পেসিফিক বা ইন্ট্রাস্পেসিফিক ব্রুড পারাসাইট বলে, তাদের সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব দেয় স্ব-প্রজাতির পাখিদের উপর। যেমন, ক্লিফ সোয়ালো, সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব এড়ানোর প্রচেষ্ঠায় তাদের নিজেদের ডিম পাড়ে তাদের একই কলোনীর অন্য কোন ক্লিফ সোয়ালোর নীড়ে। পাখীরা যখন অন্য কোন পাখীকে কৌশলে ব্যবহার করে তার নিজের সন্তানদের প্রতিপালনের জন্য, তখন প্রজনন পরজীবি পাখীরা তাদের এই বাড়তি শক্তি ব্যবহার করতে পারে আরো প্রজনন এবং ডিম তৈরীতে।


ছবি ৮ ক্লিফ সোয়ালো ( সুত্র: http://upload.wikimedia.org/wikipedia/ commons/thumb/4/41/ Cliff_swallow_7427.jpg/ 399px-Cliff_swallow_7427.jpg)


ছবি ৯:  ক্লিফ সোয়ালো’র নীড়, এখানে কংক্রীটের গায়ে ( সুত্র: . Wikimedia)


ছবি ১০:   ক্লিফ সোয়ালোরা তাদের বাসা বাধে পাথুরে পাহাড়ে বা বিল্ডিং এ ( সুত্র: (cliff swallows, © Claude Steelman/Oxford Scientific/NOVA)

কোকিল (Cuckoo):

পাখীদের মধ্যে যে প্রায় ৬০ টি ব্রুড প্যারাসাইট আছে  তার মধ্যে কোকিল সম্ভবতঃ সবচেয়ে পরিচিত, বলা যায় সুপারস্টার। প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারনে কোকিলের ডিম তার পোষক পাখির ডিমের মত প্রায় হুবুহু এক রকম দেখতে হয়েছে (  এই একরকম দেখতে হওয়াটাকে বলে মিমিক্রি, Mimicry) । কিন্তু কোকিলের ডিম তাড়াতাড়ি ফোটে, এবং পালক মা’র ছানাদের তুলনায়  এরা দ্রুত  আকারেও এবং ওজনে বাড়ে। দেখা গেছে কোকিলের ছানারা পালক পাখির ডিম বা ছানাদের বাসা থেকে ফেলে দেয় এবং একমাত্র ছানা হিসাবে পালক পিতামাতার অখন্ড মনোযোগ নিশ্চিৎ করে।


ছবি ১১:  ইয়োলো বিলড কাক্কু ( সুত্র: Wikimedia)


ছবি ১২:  সাইজ দেখে ভুল ভাববেন না, রেন (Wren) (বায়ে), ডান দিকে কোকিল ছানাটার কিন্তু পালক মা, দেখেন কেমন আদর করে খাওয়াচ্ছে (সুত্র : wren and cuckoo © Bildagentur/TIPS Italia/NOVA)

মাছ:

কাক্কু ক্যাট ফিশ ( Cuckooo Catfish):

নিজের বাচ্চাদের লালন পালন করার জন্য কাক্কু ক্যাট ফিশ, চালাকি করে সিকলিড (Cichlid) নামে একটা মাছের সাথে। সিকলিড মাছ মুলত: মাউথ ব্রীডার বা মুখের মধ্যে পোনাদের রেখে এরা বহন করে এবং মুখের ভিতরেই লালন পালন করে থাকে, যতদিন না পর্যন্ত না তারা একটু বড় হয় এবং নিজেদের খেয়াল রাখতে পারে। সিকলিড ডিম পাড়ার পর পরই কাক্কু ক্যাট ফিশ চট করে তার ডিমটাও সেখানে পেড়ে আসে, সিকলিড এরপর তার পাড়া ‍ডিমগুলো মুখের মধ্যে নিয়ে নেয়, আর ডিম ফোটার জন্য অপেক্ষা করে। পালক মাছের ডিম ফোটার অনেক আগেই কাক্কু ক্যাট ফিশ এর ডিম থেকে বেরিয়ে আছে তার পোনা। এই কাক্কু ক্যাট ফিসের পরের কাজ হলো পালক মার ডিমগুলো খেয়ে ফেলা। এভাবে সিকলিডের মুখের মধ্যে বড় হয় কাক্কু ক্যাট ফিসের বাচ্চা,ধরা না পড়েই। তার পর একা একা বাচার মত স্বাবলম্বী হলে তারা বেরিয়ে আসে সিকলিডের মুখ থেকে।


ছবি ১৩:  কাক্কু ক্যাট ফিস (সুত্র: http://www.fishoutlet. com.au/files/Category/synodontis-multipunctatus.jpg)


ছবি ১৪:  একটি কাক্কু ক্যাট ফিসের পোনা, দেখুন সিকলিডের মুখের ভিতর থেকে উকি দিচ্ছে।  (cichlid and catfish)© Mark Deeble & Victoria Stone/Oxford Scientific/NOVA)

পতঙ্গ:

কাক্কু ওয়াস্প বা বোলতা (Cuckoo wasp):

কাক্কু ওয়াস্প তাদের ডিম পাড়ে চুরি করে আরেক প্রজাতির বোলতার বাসার মধ্যে, যখন বোলতা মা বাসায় থাকে না। পালক মা ফিরে আসলে সে তার ঘরে ভবিষ্যৎ বাচ্চাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার দাবার সব জমা করে ঘরের মুখ বন্ধ করে দেয়। তার ডিমের সাথে পরজীবি কাক্কু ওয়াস্পএর ডিমও সেখানে রয়ে যায় এবং পালক মার পাড়া ডিম ফোটার আগেই কাক্কু বোলতার ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে, তারা ঘরে পালক মার মজুত করা খাওয়াতো খেয়ে শেষ করেই, মাঝে মাঝে পালক মা’র বাচ্চাদের লারভাও খেয়ে ফেলে।


ছবি ১৫:   এই কাক্বু ওয়াস্প এর বাচ্চা আরেক প্রজাতির পালক ওয়াস্পের ঘরে জন্ম নেয়  (cuckoo wasp)© Rafi Ben-Shahar/Oxford Scientific/NOVA)

Advertisements
তুমি কি আমার মা?

9 thoughts on “তুমি কি আমার মা?

  1. আমার মা না হয়ে তুমি
    আর কারো মা হলে
    ভাবছ তোমায় চিনতেম না,
    যেতেম না ঐ কোলে?
    মজা আরো হত ভারি,
    দুই জায়গায় থাকত বাড়ি,
    আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে,
    তুমি পারের গাঁয়ে।
    এইখানেতে দিনের বেলা
    যা-কিছু সব হত খেলা
    দিন ফুরোলেই তোমার কাছে
    পেরিয়ে যেতেম নায়ে।
    হঠাৎ এসে পিছন দিকে
    আমি বলতেম, “বল্‌ দেখি কে?”
    তুমি ভাবতে, চেনার মতো
    চিনি নে তো তবু।
    তখন কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে
    আমি বলতেম গলা ধরে–
    “আমায় তোমার চিনতে হবেই,
    আমি তোমার অবু!”
    ঐ পারেতে যখন তুমি
    আনতে যেতে জল,–
    এই পারেতে তখন ঘাটে
    বল্‌ দেখি কে বল্‌?
    কাগজ-গড়া নৌকোটিকে
    ভাসিয়ে দিতেম তোমার দিকে,
    যদি গিয়ে পৌঁছত সে
    বুঝতে কি, সে কার?
    সাঁতার আমি শিখিনি যে
    নইলে আমি যেতেম নিজে,
    আমার পারের থেকে আমি
    যেতেম তোমার পার।
    মায়ের পারে অবুর পারে
    থাকত তফাত, কেউ তো কারে
    ধরতে গিয়ে পেত নাকো,
    রইত না একসাথে।
    দিনের বেলায় ঘুরে ঘুরে
    দেখা-দেখি দূরে দূরে,–
    সন্ধ্যেবেলায় মিলে যেত
    অবুতে আর মা-তে।
    কিন্তু হঠাৎ কোনোদিনে
    যদি বিপিন মাঝি
    পার করতে তোমার পারে
    নাই হত মা রাজি।
    ঘরে তোমার প্রদীপ জ্বেলে
    ছাতের ‘পরে মাদুর মেলে
    বসতে তুমি, পায়ের কাছে
    বসত ক্ষান্ত বুড়ী,
    উঠত তারা সাত ভায়েতে,
    ডাকত শেয়াল ধানের খেতে,
    উড়ো ছায়ার মতো বাদুড়
    কোথায় যেত উড়ি।
    তখন কি মা, দেরি দেখে
    ভয় হত না থেকে থেকে,
    পার হয়ে, মা, আসতে হতই
    অবু যেথায় আছে।
    তখন কি আর ছাড়া পেতে?
    দিতেম কি আর ফিরে যেতে?
    ধরা পড়ত মায়ের ওপার
    অবুর পায়ের কাছে।

    অন্য মা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s