আইনস্টাইনের E=mc² সমীকরনের পূর্বসুরীরা

শীর্ষ ছবি: পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরনটি,  ১৯১২ সালে আইনস্টাইনের লেখা Special Relativity Theory ’র পাণ্ডুলিপি একটু ভিন্ন ভাবে। ছবি: Einstein Archives, Hebrew University of Jerusalem/ (নোভা/পিবিএস)।

প্রাককথন: ডেভিড বোডানিসে’র (David Bodanis) E=mc²  : A Biography of the World’s Most Famous Equation.” এর কিছু অংশ বিশেষ নিয়ে নোভা অনলাইন  প্রকাশ করেছিল একটি প্রবন্ধ The Ancestors of E=mc², আমার নীচের এই লেখাটি, কিছুটা পরিবর্ধন করে সেই লেখাটি অবলম্বনে। লেখাটি মুলত: বিজ্ঞানের ইতিহাসের। আইনস্টাইনের যুগান্তকারী সমীকরনটির আলাদা ইতিহাস বা  বিশ্লেষন নয়। ইতিহাসবিদ ডেভিড বোডানিস তার E=mc² : A Biography of the World’s Most Famous Equation” বইটিতে মুলত: বিবরণ দিয়েছেন, সেই সব যুগান্তকারী আর বৈপ্লবিক চিন্তার বিজ্ঞানীদের অবদানগুলো সম্বন্ধ। তা‍‍দের গবেষনা,পরীক্ষালব্ধ ফলাফল আইনস্টাইনের ভর, শক্তি আর আলো সম্বন্ধে ধারনাকে আকৃতি দিয়ে তার অসাধারন আবিষ্কারের পথটাকে উন্মুক্ত করেছিল।

p037tpl2
 আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫)। ১৯০৪ সালে সুইজারল্যান্ডের বার্নে , যখন তিনি ছিলেন প্যাটেন্ট অফিসে একজন অখ্যাত ক্লার্ক। এর কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্বটি প্রকাশ করেন আর কয়েক সপ্তাহ পর বিখ্যাত তার সমীকরণটি E=mc² (ফটো: Einstein Archives, Hebrew University of Jerusalem, নোভা/পিবিএস)।

‘E’  হলো Energy বা শক্তি:

শক্তি বা Energy শব্দটা কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নতুন, আধুনিক বিজ্ঞানে এই শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, তার উৎপত্তি খুজে পাওয়া যাবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এমন কিন্তু না যে এর আগে বিজ্ঞানীরা, আমাদের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের শক্তির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারেননি, যেমন স্থির বিদ্যুতের ক্রমাগত পট পট আওয়াজ, বাতাসের প্রচন্ড দমকা হাওয়ার ঢেউ, যা ছিড়ে ফেলে মোটা কাপড়ের পাল। শুধু এদেরকে পারস্পরিক সম্পর্কহীন কিছু ভাবা হয়েছিল। ‘শক্তি’ র আসলেই কোন সর্বব্যাপী ধারণা ছিল না, যার মাধ্যমে এই সব বিচিত্র ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই অবস্থার পরিবর্তনে যারা মুল দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাদের একজন মাইকেল ফ্যারাডে। ফ্যারাডের গবেষনা প্রমান করেছিল বিদ্যুতের সাথে চৌম্বকতার গভীর সম্পর্ক এবং এটাই বিজ্ঞানীদের বুঝতে সহায়তা করেছে যে, সব ধরনের শক্তি আসলে পরস্পরের সম্পর্কযুক্ত। ভিক্টোরীয় সমাজে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন যে, শক্তি তার রুপ বদলাতে পারে বটে কিন্তু মোট শক্তির পরিমান সবসময় একই থাকে অর্থাৎ অপরিবর্তনশীল। একেই ল অব কনজারভেশন অব এনার্জি  (বা শক্তির অবিনশ্বরতার সুত্র) বলা হয়ে থাকে।


মাইকেল ফ্যারাডে (১৭৯১-১৮৬৭): অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এমন কি আমরা যাকে সেকেন্ডারী স্কুল বলি, সেখানেও পড়ার সুযোগ পাননি। তাসত্ত্বেও তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হতে পেরেছিলেন। (১৮৪২ সালে থমাস ফিলিপস এর আকা প্রোর্ট্রেট); (সুত্র: উইকিমিডিয়া)

মাইকেল ফ্যারাডে (১৭৯১-১৮৬৭)।

দরিদ্র পিতার (যিনি পেশায় কামার ছিলেন) সন্তান ফ্যারাডে একসময় বই বাধাই এর খুবই দক্ষ শিক্ষার্থী ছিলেন। বলাবাহুল্য বই বাধাই করার কাজে তার কোন উৎসাহই ছিলনা। তার বয়স যখন ২০ বছর, দোকানে কাজে আসা একজন ভদ্রলোক তাকে লন্ডনে রয়্যাল ইনস্টিটিউটে কিছু ধারাবাহিক বক্তৃতা শোনার টিকিট দিয়েছিলেন উপহার হিসাবে। স্যার হাম্ফ্রি ডেভি বিদ্যুত নিয়ে এবং আমাদের দৃশ্যমান বিশ্বের অন্তরালে যে অদৃশ্য গোপন শক্তির উপস্থিতির অবশ্যম্ভাবিতা নিয়ে সেমিনার করছিলেন। ডেভির বক্তৃতা তার এতই ভালো লেগেছিল যে, ফ্যারাডে ডেভির দেয়া সমস্ত লেকচার নোটগুলো, তিনি যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছিলেন, তাদের নিখুত ডায়াগ্রাম সহ একটি চমৎকার বই বানিয়ে ফেললেন ফ্যারাডে, উদ্দেশ্য ডেভিকে উপহার হিসাবে দেবেন। ডেভি তরুন ফ্যারাডের উপহার পেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং এবং নজর এড়ায়নি ফ্যারাডের শিখবার আগ্রহ, খুব শীঘ্রই তিনি তার সহকারী হিসাবে ফ্যারাডেকে তার ল্যাবে কাজ দিয়েছিলেন।


স্যার হাম্ফফ্রে ডেভী (১৭৭৮-১৮২৯); প্রখ্যাত ব্রিটিশ কেমিষ্ট এবং আবিষ্কারক। ১৮০৩ সালে হেনরী হাওয়ার্ডের প্রোর্ট্রেট। সুত্র: Wikimedia)

যদিও ফ্যারাডের জন্য এটা ছিল অভাবনীয় একটি সুযোগ, তারপরও অনেকগুলো বছর ডেভির সহকারী হিসাবে তার প্রতিভার আদৌ কোন মুল্যায়ন হচ্ছিল না।  ডেভির আচরণ ছিল কখনও স্নেহময়, উষ্ণ শিক্ষকের মত, কখনোও বা মেজাজী, ফ্যারাডেকে তার ধারে কাছে আসতে দিতেন না। ‍যদিও মহান বিজ্ঞানী হিসাবে ফ্যারাডের নিজস্ব উত্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল যখন ডেভি নিজেই তাকে ডেনমার্কের একটা বৈজ্ঞানিক গবেষনায় প্রাপ্ত অসাধারন কিছু ফলাফলকে আবার পরীক্ষা করে নিশ্চিৎ করার জন্য নির্দেশ দেন।

তখনও পর্যন্ত্য সবাই জানতো যে কোন শক্তির যা হওয়া উচিৎ, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকীয় শক্তি, এদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সম্পর্ক নেই। কারোরই কোন সুপষ্ট ধারণা ছিল না বিদ্যুৎ আসলে কি? ব্যাটারি  থেকে আসা পট পট বা হিস হিস কোন শব্দ, ধারণা ছিল রহস্যময় এটি একটা শক্তি, যা মাঝে মাঝে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে, ছোয়া লাগলে ছোট খাট ধাক্কা দেয়, কোন তারের মধ্যে প্রবাহিত হলে তারটি জ্বলে ওঠে, কিন্ত কিভাবে এটি কাজ করে আর একে কিভাবে নিয়ন্ত্রন করা যায় তা কারোরই ধারণা ছিল না । অপরদিকে চৌম্বকত্ব বা ম্যাগেনেটিজম আরো ভিন্ন কোন অদৃশ্য শক্তি যা কিনা কম্পাসের কাটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। কিন্ত ডেনমার্কের কোপেন হেগেনে এক বিজ্ঞানী প্রমান করে দেখিয়েছেন  বিদ্যুৎবাহী তারের উপর কোন কম্পাস রাখলে এর কাটাটি একপাশে একটু সরে যায়। ডেভি ফ্যারাডেকে নির্দেশ দেন কেন এটা হচ্ছে সেটা গবেষনা করে দেখার জন্য।

হান্স ক্রিস্টিয়ান ওরস্টেড (১৭৭৭-১৮৫১):


হান্স ক্রিস্টিয়ান ওরস্টেড (১৭৭৭-১৮৫১); প্রখ্যাত ডেনিশ পদার্থবিদ এবং রসায়নবিদ, যিনি প্রথম ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম এর ধারণাটি প্রমান করেন। (সুত্র: Wikimedia)

১৮২০ সালের ২১ এপ্রিল, কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে হান্স ক্রিষ্টিয়ান ওরস্টেড তার একটি লেকচার দেবার সময় লক্ষ্য করলেন যে যখনই কোন তড়িৎ প্রবাহের উৎসের (ব্যাটারী) কাছে আনা হচ্ছে তখনই কম্পাসের কাটা চুম্বকের উত্তরমেরু থেকে সরে যাচ্ছে। ওরস্টেড এর মনে হল নিশ্চয়ই কোন সম্পর্ক আছে বিদ্যুৎ আর চুম্বকের মধ্যে। আরো বড় সড় আকারে এটা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান করার জন্য তিনি উদ্যোগী হলেন। তিনি বিদ্যুৎ এর উৎস হিসাবে তামার পাত্রে রাখা অ্যাসিডে দস্তার পাত রাখলেন ( এটাই ছিল আদি ব্যাটারীর গঠন) এবং ধাতব পাত দিয়ে যুক্ত করলেন। তিনি তার লেকচারে উপস্থিত সবাইকে দেখালেন যখনই কোন কম্পাস কে ব্যাটারী ধাতব তারের পাশে নিয়ে আসলে কম্পাসের কাটাটা অদ্ভুত আচরন করছে। এরপর আরো অনেকবার নানাভাবে পরীক্ষা করার পর তিনি নিশ্চিৎ হন যে তারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুতের শক্তিই আসলে কম্পাসের চুম্বকের কাটাটাকে নড়াচ্ছে, তিনি এ বিষয়ে একটি গবেষনা প্রবন্ধ লেখেন। তখন বিজ্ঞানের কেন্দ্র ছিল প্যারিস, ১৮২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিখ্যাত সব ফরাসী বিজ্ঞানীদের সামনে  তিনি তার এই আবিষ্কার পরীক্ষা করে দেখান, এবং এই প্রভাবের নাম দেন তড়িৎচৌম্বকত্ত্ব বা Electromagnetism, মোটামুটি আলোড়ন পড়ে যায় বিজ্ঞানী মহলে, খুব অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আরো কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার  বিভিন্নরুপী শক্তির ঐক্যতার ধারণটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যায় ।

যে উদ্ভাবনের মাধ্যমে সুচনা হয় একটি বিপ্লবের:

১৮২১ সালে গ্রীষ্মের শেষে ফ্যারাডে একটি  বিখ্যাত পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। তিনি কল্পনা করলেন যে টর্নোডোর মতো  কোন অদৃশ্য শক্তির বৃত্তাকার রেখা চুম্বকের চারপাশে ঘুর্ণায়মান। এবং তার ধারনা যদি ঠিক হয়, তাহলে হালকা ভাবে ঝোলানো কোন তার এই ঘুর্ণায়মান অদৃশ্য শক্তির রেখার টানে একইভাবে ঘুরতে থাকবে, অনেকটা পানির ঘুর্ণিতে আটকে পড়া ছোট নৌকার যে দশা হয়। ফ্যারাডে ঝোলানো কপার তারের কাছে একটি চুম্বক দাড় করিয়ে রাখলেন। যখনই ব্যাটারীর সাথে তারটি তিনি সংযুক্ত করলেন, শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনটি তিনি করে ফেলেন। তার বেসমেন্ট ল্যাবরটরীতে বসে ফ্যারাডে যা উদ্ভাবন করেছিলেন তা হলো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ভিত্তি। এবং এই তারের মাথায় যে কেউ কোন ভারী কিছু জুড়ে দিতে পারে, এবং সেটাও তারের সাথে ঘুরতে থাকবে। অসংখ্য ব্যবহারিক প্রয়োগ সহ ফ্যারাডের কাজ বিজ্ঞানকে যা দিয়েছিল তা হলো তড়িৎচুম্বকীয় ঘুর্ণনগতি বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রোটেশন।

ফ্যারাডের এই পরীক্ষার মাধ্যমেই , বিদ্যুতের পট পট শব্দ, চুম্বকের অদৃশ্য শক্তির বলয় এবং এখন তামার তারের দ্রুত ঘুর্ণায়মান গতি যে সম্পর্কযুক্ত, সেটা বোঝার একটা বিশাল পরিবর্তন হলো। বিদ্যুতের পরিমান যতই বাড়ে, উপস্থিত চৌম্বকত্ব ততটাই কমে যায়, ফ্যারাডের অদৃশ্য সেই ঘুর্ণায়মান রেখাগুলো যেন সুড়ঙ্গর মত একটি নালিকা যার মধ্য দিয়ে চৌম্বকত্ব যেমন একদিকে বিদ্যুতের সাথে মিশে যাচ্ছে তেমনি বিদ্যুতও রুপান্তরিত হচ্ছে চৌম্বকতায়। যদি শক্তি বা Energy র পুর্ণধারনা তখনও স্পষ্ট হয়নি, কিন্তু ফ্যারাডের আবিষ্কার এটিকে আরো কাছাকাছি নিয়ে এলো।


ফ্যারাডের সেই যন্ত্রটি, উপর থেকে একটি তামার তাল ঝুলছে যা ব্যাটারীর সাথে সংযুক্ত। তারটি মুক্ত প্রান্তটি নীচে পারদ ভরা একটি পাত্রে চুম্বকের পাশে শেষ হয়েছে। যখনই ‍বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়, তারটি চুম্বকের চারপাশে ঘুরতে থাকে। এই সাধারন পরীক্ষাটি বিদ্যুৎ, চুম্বক আর গতিকে একীভুত করেছিল। ছবি: DK Limited/Corbis  (নোভা/পিবিএস)।

যে জয় পরিণত হয়েছিল বিষাদে:

বলাবাহুল্য ফ্যারাডের জীবনের এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা.. আর তখনই তার গুরু স্যার হাম্পফ্রে ডেভী, তাকে তার ধারনা চুরি করার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করলেন। যদিও কয়েকমাস পরেই ডেভী এই অভিযোগ থেকে সরে আসলেন ঠিকই তবে তিনি ফ্যারাডের কাছে তিনি কখনোও দুঃখ প্রকাশ করেননি। এবং ফ্যারাডেও কোনদিনও ডেভীর বিরুদ্ধে কোন কথা বলেননি। কিন্তু এই অভিযোগের কারনে তিনি খুব সতকর্তার সাথে প্রথম সারির কোন গবেষনা কর্ম থেকে দুরে সরে থেকেছেন। ১৮২৯ সালে ডেভী মারা যাবার পর ফ্যারাডে আবার ইলোক্ট্রোম্যাগনেটিজম নিয়ে কাজ শুরু করেন। ফ্যারাডে পরবর্তীতে আরো গুরুত্বপুর্ণ কিছু আবিষ্কার করেছিলেন যেমন ইলেক্ট্রিক ট্রান্সফর্মার বা জেনারেটর এর মুলনীতি গুলো, যে নতুন প্রযুক্তি শিল্প বিপ্লবকে তরান্বিত করেছিল। তার সমকালীন সময়ে ফ্যারাডে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন একজন দক্ষ ব্যবহারিক পরীক্ষাকারক হিসাবে কিন্তু অনেক তথাকথিত উচ্চবংশীয় বিজ্ঞানী তার তাত্ত্বিক ধারনাকে সবসময়ই অবজ্ঞার সাথে দেখেছেন: যেমন, বিশেষ করে তার ধারনাগু‍‍লো যেমন, তড়িৎচৌম্বকতার সময় এর চারপাশে সৃষ্টি হয় একটা রহস্যময় শক্তির ক্ষেত্র কিংবা আলো সম্ভবত তড়িৎচৌম্বকতারই ফলাফল।


ফ্যারাডে ভেবেছিলেন তড়িৎচৌম্বকত্বের মুল বিষয়টি বোঝা যায় চুম্বকের চারপাশে ছড়ানো লোহার কণার বিন্যাস দেখে। (Photo credit: NASA) নোভা/পিবিএস


‘‘ =” এর অর্থ সমান সমান (কিন্ত ব্যাপারটা কিন্তু এত সহজ না):

একটি ভালো সমীকরন শধুমাত্র কোন কিছু গননা করার ফর্মুলা না, কিংবা কোন মানদন্ড না যা যাচাই করে যে দুটি বিষয়কে যা আপনি সমমানের বলে সন্দেহ করছেন, তারা আসলেই সমমানের। বরং ‍বিজ্ঞানীরা ‘‘ =” সমান সমান চিহ্ন ব্যবহার করেছেন অনেকটা নতুন কোন ধারনাকে বোঝার টেলিস্কোপ হিসাবে। একটি উপকরন যা আপনার দৃষ্টিকে প্রসারিত করবে নতুন এবং অজানা জগতের দিকে। এভাবেই আইনস্টাইন ‘‘=”  চিহ্নটিকে ব্যবহার করেছিলেন তার ১৯০৫ সালের সমীকরনে। আইনস্টাইন অনেক বিশাল দুরত্ব অতিক্রম করেছিলেন যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভর আর শক্তি পরস্পর পরিবর্তনযোগ্য এবং সঠিক পরিবর্তন বা কনভার্সন ফ্যাক্টর ‍c² এর সম্পর্কযুক্ত করলে সমান সমান চিহ্নের দুপাশে তাদের সাজানো যেতে পারে। কিন্তু কোথা থেকে আসলো এই খুব সাধারন এই চিহ্নটি আইনস্টাইনের এই সুগভীর সমীকরনের মাঝখানে।  এর ইতিহাস খুজলে আমরা পৌছে যাবো ১৫০০ শতকের একজন শিক্ষকের কাছে, যার নাম রবার্ট রেকর্ডে।
সমান সমান চিহ্নের জন্ম:

প্রায়শই ১৪ শতকে বাইবেলের লেখা দেখলে অনেকটা টেলিগ্রামের মত মনে হতে পারে: IN THE BEGINNING GOD CREATED THE HEAVEN AND THE EARTH  AND THE EARTH WAS WITHOUT FORM AND VOID AND DARKNESS WAS UPON THE FACE OF THE DEEP , কোন বিরাম যতিচিহ্নবিহীন। প্রধান প্রধান টাইপোগ্রাফিকাল যতি চিহ্নগুলো দ্রুত আগমন ঘটেছে মুলত: ১৪০০ শতকের শেষের দিকে,প্রিন্টিং যখন শুরু হলো। প্রথমে পুরাতন প্রধান প্রধান চিহ্নগুলো, যেমন  “?” চিহ্ন এবং অপেক্ষাকৃত নতুন “! ” চিহ্ন লেখার মধ্যে  কেবল ব্যবহার শুরু হয়েছে। অন্য ছোটখাট সংকেতগুলোর আগমন আগমন আরো দেরীতে। ১৫০০ শতকের মাঝামাঝি ছোটখাট সংকেত ব্যবহারের প্রচলনের ক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত উদ্যোগের কিছু অবকাশ ছিল। ১৫৪৩ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রবার্ট রেকর্ডে, যিনি  গণিতের পাঠ্যবই রচনা করার ক্ষেত্রে একজন অগ্রদুত, তার নতুন স্টাইলের একটি চিহ্ন  ”+” জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছিলেন, যা ইতিমধ্যে ইউরোপের মুল ভু-খন্ডে কিছুটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি যে বইগুলো লিখেছিলেন তা দিয়ে তার তেমন কোন আর্থিক লাভ হয়নি, তাই তিনি এর পরের দশকে ১৫৫৭ আবার চেষ্টা করলেন আরেকটি চিহ্ন নিয়ে, এবারের চিহ্নটি, যার সম্ভবত উৎস ছিল আদি ‍যুক্তি বিদ্যার কোন পান্ডুলিপি,এই চিহ্ন সম্বন্ধে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এটা হয়তো জনপ্রিয় হবে।


বিখ্যাত গনিতবিদ  রবার্ট রেকর্ডে (আনুমানিক ১৫১০-১৫৫৮); যিনি ১৫৫৭ সালে প্রথম = চিহ্ন ব্যবহার করেছিলেন। সুত্র: http://1.bp.blogspot.com/_UMWIq5wD2k0/ SvKpzmu-o3I/ AAAAAAAAAZI/_UK40CtEJYw/s400/robert_recorde.jpg


= বা সমান সমান চিহ্নর জন্য রেকর্ডে যে ভুমিকা লিখেছিলেন। সুত্র: Wikipedia

তৎকালীন সমাজে বিজ্ঞাপনের সবচে প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি এটিকে আরো গুরুত্বপুর্ণ করে এর বৈশিষ্টগুলো তুলে ধরেছিলেন চাইলেন এভাবে:”…And to avoide the tediouse repetition of these woordes: is equalle to: I will sette … a pair of parallels, or … lines of one lengthe, thus: ====== bicause noe .2. thynges, can be moare equalle…”(সেই সময়ের ইংলিশে) লিখে: যার অর্থ: সুতরাং বার বার কষ্ট করে ’is equal to’ শব্দগুলো ব্যবহার না করে, আমি দুটি সমান্তরাল রেখা বা একই দৈর্ঘের রেখা ব্যবহার করছি এভাবে  ====== কারন এই দুটি বিষয়ের এর চেয়ে বেশী সমান না হয়ে পারে না)।


জানা মতে প্রথম সমীকরন, আধুনিক গনিতের ভাষায় যা: ১৪× + ১৫ = ৭১; (সুত্র: Wikimedia)

রেকর্ডে তার এই চিহ্নটি উদ্ভাবনের জন্য কোন ভাবে লাভবান হয়েছিলেন বলে এমন কোন তথ্য নেই। কারন এই চিহ্নটি সেই সময় আরো কয়েকটি সম্ভাব্য চিহ্নর সাথে প্রতিযোগিতায় ছিল যেমন: “// ”  বা অদ্ভুত ‘ [;’ যা শক্তিশালী জার্মান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলন করতে চেয়েছিল। কিন্ত এক প্রজন্ম পরেই শেক্সপিয়ারের সময় রেকর্ডের জয় নিশ্চিৎ হয়েছে।


একবার ভাবুনতো আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরনটি কেমন লাগতো যদি অন্য প্রস্তাবিত সমান সমান চিহ্নগুলো জিততো। (ফটো: WGBH Educational Foundation),নোভা/পিবিএস)

“M” হচ্ছে মাস (Mass) বা ভর:

উনিশ শতকের আগে Mass বা ভর সম্বন্ধে ধারনা শক্তির ধারনার মতই অস্পষ্ট ছিল। চারপাশে অনেক ধরনের বস্তু থাকা সত্ত্বেও, তাদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সম্পর্ক আছে বা নেই তা সম্বন্ধে ধারনাও ছিল অস্পষ্ট। আঁতোয়াঁ লরোঁ ল্যাভোয়াসিয়েরই প্রথম দেখিয়েছিলেন আপাতদৃষ্টিতে পৃথক সব বস্তু, যেমন, গাছের ডাল, পাথর কিংবা লোহা-যার ‘”মাস” আছে তা আসলে একটি সামগ্রিক ’মাস এর সংযুক্ত অংশ।  স্ত্রী অ্যান মারিকে সাথে নিয়ে ল্যাভোয়াশিয়ের বহু বছরের খুবই সুক্ষ্ম গবেষনার মাধ্যমে করেছিলেন আমাদের এই বিশ্ব, যে সব পদার্থ দিয়ে পুর্ণ, তাদের পোড়ানো যাবে, পেষন করা যাবে, কেটে বা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে টুকরো টুকরো করা যাবে,কিন্তু তারা উধাও হয়ে যাবেনা। বাতাসে ভাসমান বিভিন্ন পদার্থ নিজেদের মধ্যে সংযুক্ত বা পুণঃসংযুক্ত হবে। মাসের মোট পরিমান অবশ্য  একই থাকবে। এই মুলনীতিটা, যা মাসের কনসারভেশন সুত্র বলে-১৭শ সালের একটি অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক অর্জন।

আঁতোয়াঁ লরোঁ ল্যাভোয়াসিয়ের (১৭৪৩-১৭৯৪)

আঁতোয়াঁ লরোঁ ল্যাভোয়াসিয়ের (১৭৪৩-১৭৯৪); ভরের কনসারভেশনের সূত্র আবিষ্কার করতে দরকার ছিল খুবই যত্নবান এবং সুক্ষ হিসাবে দক্ষ  কারো, যে আকারে আর ওজনে প্রতিটা পদার্থের পার্থক্য মাপার পেছনে অনেক সময় দিতে আগ্রহী ,যেমন আঁতোয়াঁ লরোঁ ল্যাভোয়াসিয়ের  (ফটো: Archivo Iconografico, S.A./Corbis ) নোভা/পিবিএস

ল্যাভোয়াশিয়ের এর জন্ম প্যারিসের অভিজাত একটি পরিবারে। কৈশোরেই তিনি উদ্ভিদবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গনিত পড়েন। কিন্ত রসায়নের প্রতি তার বিশেষ ভালোবাসা ছিল আমরণ। কারন রসায়নও একধরনের পরীক্ষানির্ভর বিজ্ঞান যা তার প্রকৃতির সাথে মানায়। হিসাব রক্ষকদের মত সব কিছুকে চুলচেরা বিশ্লেষন করতে ভালোবাসতেন। তার রোমান্টিক আদর্শবাদী চরিত্রের বহিপ্রকাশ ঘটে ১৭৭১ সালে, তার উর্ধতন একজন কর্মকর্তা, জাক পাউলজ এর ১৩ বছরের মেয়েকে, কদাকার, স্থুল একজনের সাথে জোর করে বিয়ে দেবার প্রক্রিয়া ঠেকানো মাধ্যমে। মারি অ্যানের সাথে তার নিজের বিবাহিত জীবন ছিল সুখের; যদিও বয়সের ব্যাবধান ছিল অনেক, এবং ২৮ বছর বয়সী সুদর্শন ল্যাভোয়াশিয়েরকে আবার ফিরে যেতে হয়েছিল রাজা লুই (চতুর্দশ) এর সরকারের জন্য কর সংগ্রহ এবং হিসা্ব রক্ষনের মত বিরক্তিকর কাজে। মুলত: তার দায়িত্বে ছিল সরকারী কর আদায় করার একটা বিশাল প্রতিষ্ঠান। যেখানে সপ্তাহে ৬ দিনই তাকে দীর্ঘ সময় দিতে হত। শুধুমাত্র কাজের ফাকে কিছুটা সময়, সকালে এক দুই ঘন্টা আর সপ্তাহে একদিন। এভাবে পরবর্তী ২০ বছর তিনি বিজ্ঞান সাধনায় মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই একদিন তার ভাষায় তার কাছে ছিল ’জ্যুর দ্য বোঁনঅর’ -বা ’সুখের দিন’।

প্রকৃতি যে একটি আবদ্ধ সিস্টেম সেটি প্রমান করা:

খুটিনাটি বিষয়ের দিকে ল্যাভোয়াশিয়ের এর বাড়তি নজর তাকে সুযোগ করে দিয়েছিল একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর খুজতে: প্রশ্নটি হলো, কোনপদার্থকে কি সম্পুর্নরুপে ধংশ আর নতুন করে সৃষ্টি করা যায়? আমাদের চারপাশে যে পদার্থগুলো আছে, সে গুলোর ক্ষেত্রে প্রকৃতি কি একটি আবদ্ধ সিস্টেম? এর উত্তর খোজার জন্য ল্যাভোয়াশিয়ের ব্যপারটা নিয়ে গবেষনা করলেন, যেমন: কি ঘটে যখন কোন ধাতুতে মরিচা পড়ে। যদিও প্রচলিত ধারনা ছিল মরিচা ধরা একটা লোহার ওজন মরিচাহীন ধাতুর দন্ড অপেক্ষা হালকা হবে। কিন্তু  ল্যাভোয়াশিয়ে পরীক্ষা ছাড়া কোন কিছু মেনে নিতে নারাজ, তাই নিজের বাসার বসার ঘরের মধ্যেই তিনি এই পরীক্ষা করার জন্য তৈরী করলেন সম্পুর্ন আবদ্ধ একটি যন্ত্র। মারি আনের সহায়তায় এর মধ্যে রাখতে লাগলেন নানা ধরনের লোহার তৈরী জিনিস, তারপর সেটাকে সম্পুর্ন সীল করে দিলেন, মরিচা ধরার প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করার জন্য তাপ দিলেন। সব কিছু ঠান্ডা হলে তারা দুইজন  সেই  মোচড়ানো, পোড়া, মরচে ধরা জিনিসগুলোকে বের করে ওজন করলেন, এবং ঐ বদ্ধ যন্ত্রে কতটুকু বাতাস কমে গেল সেটাও সতর্কতার সাথে মাপা হলো। প্রতিবারই তারা একই অপ্রত্যাশিত ফলাফল পেলেন।  মরিচা ধরা জিনিসগুলোর ওজন, মরিচা হীন নমুনা থেকে কমও না আবার সমানও না বরং তাদের ওজন বেশী। কিন্তু কি ঘটেছিল যন্ত্রটিতে? প্রথমে একই পরিমান বস্তু ছিল, কিন্ত পরে মেপে দেখা গেল আবদ্ধ কক্ষে বাতাসে যে পরিমান অক্সিজেন ছিল তা আর নেই। তা আসলে উধাও হয়ে যায়নি। এটি ধাতুর সাথে বিক্রিয়া করেছে । তার অতি সুক্ষ ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে মেপে তিনি প্রমান করলেন পদার্থ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রুপান্তরিত হতে পারে, কিন্ত হঠাৎ করে এটির যেমন সৃষ্টি হয় না, তেমনি বিনাশ হয়না।


ল্যাভোয়াশিয়ের শুধু প্রমানই করেননি মরিচা পড়া ধাতুর ওজন বেড়ে যায়, তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন বাতাসের কোন গ্যাস এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত, যার নামও তিনি দিয়েছিলেন অক্সিজেন। ফটো : Photo credit: © iStockphoto, নোভা/পিবিএস

একটি সংক্ষিপ্ত জীবন, কিন্ত সুদুরপ্রসারী তার অবদান:

ল্যাভোয়াশিয়ের এর সব সঠিক পরিমাপ আর রাসায়ানিক বিশ্লেষনের ফলাফল এবং বাতাসের অক্সিজেন কেমন করে লোহার সংস্পর্শে এসে বিক্রিয়া করে তার ব্যাখ্যা, এসব কিছুর মাধ্যমেই অন্যান্য গবেষকরা ধীরে ধীরে উন্মোচন করা শুরু করলেন কেমন করে বাস্তবে এই ভরের কনসারভেশনের সুত্রটি কাজ করে। এবং তার ভয়াবহ অকাল মৃত্যুর পর কয়েক দশকের মধ্যেই তিনি চিহ্নিত হন আধুনিক রসায়নশাস্ত্রের জনক হিসাবে।

ফরাসী বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে, মুলতঃ  রাজ কোষাগরের জন্য তার কর সংগ্রহের কাজটি মাত্র ৫১ বছর বয়সে গিলোটিনের নীচে তার প্রান দেয়ার জন্য দায়ী।  এই রাজ চাকরী তার সর্বনাশের কারন হয়েছিল তো বটেই, উপরন্তু ফরাসী বিপ্লবের আগের দুই এক বছরে তার সাথে শত্রুতা শুরু হয় জ্যাঁ পল মারাত নামের এক হতাশ বিজ্ঞানীর সাথে, যে বিপ্লব পরবর্তী ত্রাসের রাজত্বের একজন অধিনায়ক হয়েছিলেন। ল্যাভোয়াশিয়ের গিলোটিনে পাঠানোতে তার উৎসাহ বেশী বই কম ছিল না।ল্যাভোয়াশিয়ের বিচার হয়েছিল, এবং তিনি অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং গিলোটিনের মাধ্যমে তাকে শিরোচ্ছেদও করা হয়েছিল। কথিত আছে, তার জীবন বাচানোর আবেদন বিচারক নাকচ করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ’ফরাসী প্রজাতন্ত্রে কোন প্রতিভাবানের প্রয়োজন নেই’;  কিন্ত তার মৃত্যুর ঠিক দেড় বছরের মাথায় ফরাসী সরকার ল্যাভোয়াশিয়ের এর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করে নেয়, এবং তার বিধবা স্ত্রী মারি আনকে রাষ্ট্র কর্তৃক বাজেয়াপ্ত সমস্ত কিছু ফেরত পাঠানো হয় একটি ছোট চিরকুটের সাথে: ‘ল্যাভোয়াশিয়ের এর বিধবা পত্নীকে, যাকে ভুল করে দোষী সাব্যাস্ত করা হয়েছিল।”


যদিও সমকালীন কোন চিত্রকর্মে ল্যাভোয়াশিয়ের মৃত্যুদন্ড লিপিবদ্ধ করা হয়নি, যেমন এখানে চতুর্দশ লু্ই এর গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ দেখানো হয়েছে। রাজার জন্য তার কর আদায়ের কাজটা ফরাসী বিপ্লবের পরে তারও অনুরুপ ভাগ্যের কারন। ছবি: Photo credit: © Stefano Bianchetti/Corbis , নোভা/পিবিএস


“C” হচ্ছে সেলেরিটাস (Celeritus):

E হচ্ছে শক্তি সুবিশাল জগত আর M হচ্ছে মহাবিশ্বের পদার্থের ভর। কিন্ত  C হচ্ছে আলোর বেগ;  এই  C টি  এসেছে ল্যাটিন শব্দ Celeritus থেকে, যার অর্থ ‘দ্রুততা‘); কিন্তু কেন এই বিশেষ গতিবেগটি, যা মনে হতে পারে যে কোন একটি সংখ্যা মাত্র,  অথচ নিয়ন্ত্রন করছে মহাবিশ্বের সমস্ত ভর আর সমস্ত শক্তির ভিতরকার যোগসুত্রটা?

আইনস্টাইন তার সমীকরনে এই c ব্যবহারের সম্ভাবনা কথা ভাবার আগেও, কাউকে না কাউকে তো সুনির্দিষ্টভাবে প্রমান করতে হয়েছে আলোর  গতিরও একটা সীমা আছে। গ্যালিলেও হচ্ছেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি আলোর গতি মাপার কথা সুস্পষ্টভাবে ভেবেছিলেন। কিন্ত একজন তরুন এবং সাহসী ডেনিশ জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ওল রোমের সেই কাজটি প্রথম করে দেখিয়েছিলেন। এবং তিনি এই কাজটি করেন ১৭ শ শতাব্দীর একটি উত্তেজনাময় বৈজ্ঞানিক চ্যালেজ্ঞ এর মাধ্যমে।


গ্যালিলেও গ্যালিলেই (১৫৬৪-১৬৪২) এর প্রতিকৃতি (১৬৩৬ সালে শিল্পি জুষ্টাস সুষ্টানম্যানস) সুত্র: wikipedia


ওল ক্রিস্টেনসেন রোমার (১৬৪৪-১৭১০) এর প্রতিকৃতি  (১৭০০ সাল সমসাময়িক সময়ে শিল্পী জ্যাকব কোনিং এর আকা); সুত্র: Wikimedia

ওল রোমারের বিখ্যাত চ্যালেন্জ্ঞ:

১৬৭১ সালে, রোমারের বয়স যখন ২১,  ডেনমার্ক থেকে তিনি জ্যোর্তিবিজ্ঞানী জ্যাঁ ডমিনিক কাসিনি’র প্যারিসের নতুন অবজারভেটরীতে চাকরী নিয়ে আসেন। ক্যাসিনি, বৃহস্পতি গ্রহর উপগ্রহদের কক্ষপথ নির্নয়, এবং আরো অনেক বিষয়ে একজন বিখ্যাত পন্ডিত এবং সুপরিচিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যার সামনে যে কেউই কিছুটা নার্ভাস হতেই পারে। কিন্ত রোমার ছিলেন একেবারে অন্যরকম, সাহসী এবং স্পষ্টভাষী, নিজের যোগ্যতা সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাসী। ঐ বয়সেই তিনি বিখ্যাত ক্যাসিনিকে চ্যালেন্জ্ঞ করে নিজের নামটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ক্যাসিনির ঐ সময়ে একটাই সমস্যা ছিল, বৃহ্স্পতির একেবারে কাছের উপগ্রহ, যার নাম আইও (Io) কে নিয়ে;  আইও‘র প্রতি সাড়ে ৪২ ঘন্টায়  বৃহস্পতির চারপাশে একবার প্রদক্ষিন করার কথা। কিন্তু এই নিয়ম সে খুব একটা মেনে চলে না। সবাই এমনকি ক্যাসিনি ‍নিজেও মনে করতেন সমস্যা হচ্ছে সম্ভবত আইও‘র  প্রদক্ষিন করার পদ্ধতির কারনে। হয়তো এর কক্ষপথে এটি বেপরোয়া ভাবে এদিক সেদিক নড়াচড়া করে। কিন্তু তরুন রোমার সমস্যাটাকে উল্টো করে দেখলেন, আইও কেমন করে প্রদক্ষিন করছে সেটা নয় বরং বৃহস্পতির সাপেক্ষে পৃথিবীর গতি কেমন, সেটাই সমস্যা।


গিওভান্নি ডমেনিকো ক্যাসিনি (১৬২৫-১৭১২), যিনি পরে পরিচিত হন জ্যাঁ ডমিনিক ক্যাসিনি নামে, যখন তিনি প্যারিস অবসারভেটরীতে  রাজত্ব করছিলেন। ছবি: Photo credit: MacTutor History of Mathematics Archive, University of St. Andrews,Scotland, নোভা/পিবিএস

ক্যাসিনি সহ প্রায় সমকালীন সবাই ধরে নিয়েছিলেন আলো মুহুর্তের মধ্যে যে কোন দুরত্ব অতিক্রম করে। কিন্তু রোমারের ধারনা ছিল বৃহস্পতি গ্রহের মত দুরের জায়গা থেকে আলো আসতে নিশ্চয়ই কিছুটা সময় নেয়। গ্রীষ্মের সময় যখন পৃথিবী কাছাকাছি থাকে তখন সময় কম লাগার কথা আইওর ছবি পৃথিবী পৌছাতে। কিন্তু শীতের সময় যখন পৃথিবী সৌর জগতের অন্যপ্রান্তে থাকে, আইওর ছবিও পৌছাতে বেশী সময় লাগার কথা।


যদিও মধ্যবয়সে গর্বিত রোমারের প্রতিকৃতি এটি। কিন্ত মধ্য বিশে সাহসী রোমার চ্যালেন্জ্ঞ ছুড়ে দিয়েছিলেন সে যুগের সবচেয়ে সেরা জ্যোতিবিজ্ঞানীর প্রতি। ছবি: Rundetaar, নোভা/পিবিএস

গননার দিন:

১৬৭৬ সালের গ্রীষ্মের শেষের দিকে, রোমার মোটামুটি একটা আলোর গতিবেগ সংক্রান্ত একটি সংখ্যায় পৌছান। তিনি হিসাবে করে বের করেন যখন পৃথিবী বৃহস্পতি থেকে দুরে অবস্থান করে, অতিরিক্ত সেই দুরত্বটা অতিক্রম কতে আলোর ঠিক অতিরিক্ত কতটা সময় লাগে।সাধারণত বিদগ্ধ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পড়েন এমন একটি জার্ণালের পাবলিক ফোরামে তিনি চ্যালেজ্ঞ করেন যে, পরবর্তী নভেম্বর ৯ তারিখে বৃহস্পতির পেছন থেকে আইও বেরিয়ে আসবে ক্যাসিনি যা অনুমান মত ৫ টা ২৭ মিনিটে না বরং আরো ১০ মিনিট পর, ৫টা ৩৭ এ। নভেম্বর ৯, সারা ফ্রান্স এবং ইউরোপ জুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের টেলিস্কোপ নিয়ে প্রস্তুত, ৫টা ২৭ মিনিট, আইও‘র দেখা নেই। ৫টা ৩০,তখনও দেখা নেই আইও‘র। এবং তারপর ঠিক ৫টা ৩৭ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে আইও‘র দেখা মিলল। রোমারের হিসাব ঠিক প্রমানিত হলো। তারপরও ক্যাসিনি‘র দাবী তার কোন ভুল হয়নি। প্রথমত আইও এতো দুরে, একে ভালো করে দেখাই কঠিন, হয়তো বৃহস্পতির উপরের বায়ুমন্ডলে থাকা মেঘগুলো এই দৃষ্টি বিভ্রমের কারন।

রোমার কিন্ত অসাধারন আর নির্ভুল একটি পরীক্ষা করে দেখালেন, তার ভবিষ্যদ্বানী মিলে গেলো তার দেয়া হিসাবে সাথে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মেনে নেননি যে, আলোর গতিবেগের একটা সীমা আছে। ক্যাসিনি সমর্থকরা জিতে গেল অর্থাৎ আলোর গতিবেগ রহস্যময় আর অপরিমাপযোগ্য এ ধারনাই বহাল থেকে গেল। রোমার হাল ছেড়ে দিয়ে তার নিজের দেশ ডেনমার্কে ফিরে গেলেন। মাত্র ৫০ বছর পরেই আরো গবেষনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে রোমারের তত্ত্বর সত্যতা প্রমান করে। আর রোমারের হিসাবে পরিমাপ করা আলোর বেগ, আলোর প্রকৃতবেগ,যা প্রায় ৬৭০,০০০,০০০ মাইল/ঘন্টা খুব কাছাকাছি ছিল।

অবশ্যই দ্রুত কিন্ত এই দ্রুততাটা আসলে কি?

১৭শ শতকেই আলোর গতিবেগ গননার কাজটি শেষ হয় ঠিকই, কিন্ত আলোর সঠিক প্রকৃতিটা বুঝতে আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের।এই কাহিনীর পরের অংশটা শুরু হয় ১৮৫০ এর শেষের দিকে। যখন মাইকেল ফ্যারাডের বয়স হয়েছে, এবং কেবল যোগাযোগ শুরু হয়েছে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল নামের একজন  স্কটিশ তরুনের সাথে।


জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (১৮৩১-১৮৭৯),ক্যামব্রিজে ট্রিনিটি কলেজে পড়ার সময়। সুত্র: Wikimedia)

১৮২১ সালে ফ্যারাডের যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর আরো বেশ কিছু গবেষনার মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে প্রমান করেছেন কেমন করে বিদ্যুত শক্তিকে চুম্বক শক্তিকে এবং চুম্বক শক্তিকে বিদ্যুত শক্তিকে রুপান্তর করা সম্ভব।মাক্সওয়েল, যিনি সম্ভবত ১৯ শতকের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সেরা গনিতজ্ঞ, তিনি ফ্যারাডের এই ধারনাকে আরো এগিয়ে নিলেন। ম্যাক্সওয়েল যা বুঝতে শুরু করলেন তা হলো,আলোক কনার মধ্যে আসলে কি হয়, সেটা আসলে সামনে পেছনের ঢেউ এর মত এক ভিন্ন ধরনের গতিতরঙ্গ। যখন আলোর কনা সামনের দিকে আগায়, আপনি এমন করে ভাবতে পারেন, যখন আলোর কনা সামনের দিকে আগায়,কিছু পরিমান বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়,আর তারপর যখন সেই বিদ্যুত সামনের দিকে আগাতে থাকে,সে কিছু পরিমান চৌম্বকত্বও সৃষ্টি করে এবং যখন চৌম্বকত্ব অগ্রসর হয় আরো কিছু বিদ্যুতের সৃষ্টি হয়, এভাবে বিনুনী বাধা কোন চাবুকে তোলা ঢেউ এর মত সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।

সময়,আলো যে একটি তড়িৎচুম্বকীয় ঘটনার ফলাফল, ফ্যারাডের সেই ধারনাটা, যা বিজ্ঞানীদের কাছে বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছু পায়নি, তা আসলে ঠিকই ছিলো।

“2” হচ্ছে বর্গফলের জন্য:

একটি বিখ্যাত কার্টুনে দেখা যায় একটি বোর্ডের সামনে আইনস্টাইন দাড়িয়ে আছেন, একটার পর একটা সমাধান নিয়ে ভাবছেন:E=mc¹, E=mc², E=mc³…. কিন্ত অবশ্যই তিনি এভাবে হঠাৎ করে এই সমীকরনে পৌছাননি। কিন্তু কেন কনভারশন ফ্যাক্টরকে  c²  হতে হলো। অন্য অনেক সম্ভাবনার মধ্য থেকে কেন এ্ই সমীকরনে বর্গফলের ব্যবহার হলো, তা জানতে আমাদের যেতে হবে ১৭০০ সালের প্রথম দিকে ফরাসী একজন অসাধারন রমনীর কাছে। তার সময়ের  চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন স্পষ্টভাষী,বিদুষী এই নারী।


এমিলি দ্যু শাতেলে (১৭০৬-১৭৪৯): কৈশোরেই তার নখদর্পনে ছিল দেকার্তের অ্যানালাইটিক জিওমেট্রি, আর পুর্নবয়স্ক নারী হিসাবে  নিউটনকে ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। ছ‍‍‍বি: public domain/Wikimedia, নোভা/পিবিএস

এমিলি দ্যু শাতেলে (১৭০৬-১৭৪৯)

শৈশবে প্যারিসের তুইলেরি গার্ডেনের কাছেই পরিবারে সাথেই ছিল তার বসবাস। ধনাঢ্য পরিবারের কন্যা এমিলি তার অন্য সব ভাই বোন থেকে ছিলেন একেবারে আলাদা। তার বাবা চিন্তা করতেন তার এই আদরের মেধাবী মেয়েটিকে কে বিয়ে করবে, এতো বুদ্ধিমতী আর নিজের বুদ্ধি আর মতামত প্রকাশে এত স্পষ্ট, কে প্রস্তাব নিয়ে আসবে, তার কথা শুনলেইতো ভয়ে পালাবে।তার বাবার ভয় অমুলক ছিল, কারন এমিলিকে জীবন সঙ্গীনি হিসাবে পাবার জন্য পাত্রের কোনই অভাব ছিলোনা। প্রথানুযায়ী ১৯ বছর বয়সে এদের মধ্য থেকে একজনকে স্বামী হিসাবে বেছে নেন তিনি। তার ধনাঢ্য স্বামী  স্যাটেলে ছিলেন সামরিক অফিসার, যুদ্ধের জন্য তাকে বেশীর ভাগ সময় বাইরে থাকতে হত। সেই সময়ের অকথিত প্রথা আর নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল তার অনুপস্থিতিতে এমিলি অন্য কারো সাথে সম্পর্ক রাখতে পারবেন।


এমিলি দ্যু শাতেলে (১৭০৬-১৭৪৯) মরিস কোয়েন্টিনের আকা প্রতিকৃতিতে। সুত্র: http://upload.wikimedia.org/wikipedia/

যখন তার বয়স ২৭ এবং ৩ সন্তানের জননী, এমিলি তার জীবনের সবচে গভীরতম সম্পর্কটি গড়ে তোলেন; মেধা,মনন আর হৃদয়ের একটি সত্যিকারের সম্পর্ক।তার সেই প্রেমিক ছিলেন ভলতেয়ার, এমিলি সম্বন্ধে স্মৃতিচারন করতে গিয়ে ভলতেয়ার এক চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন,‘১৭৩৩ সালে আমি এমন এক তরুনীর সাথে পরিচিত হই, যে প্রায় আমার মত করেই ভাবতে পারে’; এমিলি এবং ভলতেয়ার এর পছন্দের বিষয়গুলো ছিল একই: রাজনৈতিক সংস্কার,সমকালীন বিষয়গুলো নিয়ে প্রান ভরে  আলোচনা,এবং সর্বোপরি তাদের পক্ষে বিজ্ঞানকে যতটুকু এগিয়ে নেয়া সম্ভব ততটুকু করা।


ফরাসী নবজাগরনের অন্যতম রপকার ভলতেয়ার, এমিলি দ্যু শাতেলে সম্বন্ধে লিখেছিলেন, “a soul for which mine was made.” ছবি: public domain/Wikimedia,নোভা/পিবিএস

ভলতেয়ারে লেখা সম্পাদনা এবং নিউটনের লেখার পরিবর্ধন ও ব্যাখ্যা:

ভলতেয়ার এবং ‍দ্যু শাতেলে দুজনে মিলে উত্তর-পূর্ব ফ্রান্স এর সিরেতে অবস্থিত তার স্বামীর প্রাসাদটিতে তৎকালীন প্যারিসের অ্যাকাডেমী অব সায়েন্স এর সমকক্ষ একটি লাইব্রেরী স্থাপন করে,এটিকে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষনার অন্যতম কেন্দ্রে পরিনত করেন। লাইব্রেরী ছাড়াও তারা লন্ডন থেকে সংগ্রহ করেছিলেন পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। নিজেদের মধ্যে যখন তারা বিতর্ক করতেন, জ্ঞানী ভলতেয়ারকে প্রায়শই সত্যি সত্যি হার মানতে হতো তার এই তরুন প্রেমিকার কাছে। দ্যু শাতেলে ছিলেন একজন সত্যিকারের পদার্থবিদ্যা এবং ভৌত বিজ্ঞানের পরীক্ষক।পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নানা বিষয়ে গবেষনা করতে ভালোবাসতেন। এবং তিনিই ঠিক করেন,যে গুরুত্বপুর্ন বিষয় নিয়ে গবেষনা তাকে আপাতত কাজ করতে হবে, সেটা হলো: শক্তি কি?


স্যার আইজাক নিউটন (১৬৪৩-১৭২৭); সুত্র: http://www.nndb.com/people/864/ 000024792/ newton-port2-75.jpg

তখন প্রায় বেশী ভাগ গবেষকই কিন্তু মনে করতেন শক্তি সম্বন্ধে যথেষ্ট জানা হয়ে গেছে। ভলতেয়ার নিজেই নিউটনের লেখাকে পরিচিত করার সময়ে এই বিষয়ে লিখেছেন:একটি বস্তুর শক্তি বা এনার্জি হলো তার ভর বা মাস (Mass) আর গতিবেগের (বা Velocity) গুনফল অর্থাৎ mv¹ ,যদি ৫ পাউন্ডের বল ঘন্টায় ১০ মাইল গতিবেগে চলে, তাহলে এর শক্তি হলো ৫০ (৫×১০=৫০)ইউনিট। কিন্ত এমিলি জানতেন এই ধারনার, যদিও তাত্ত্বিক,কিন্ত একটি প্রতিদ্বন্দী মতবাদ আছে,যা প্রস্তাব করেছিলেন আরেক বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক এবং গনিতজ্ঞ গটফ্রিড ভিলহেম লাইবনিৎস।লাইবনিৎস এর মতে গুরুত্বপুর্ন বিষয়টি ছিলো mv²।


গটফ্রিড ভিলহেম লাইবনিৎস (১৬৪৬-১৭১৬); সুত্র: wikimedia.org/ wikipedia/

একটি ভরের পরীক্ষা:


উইলেম জ্যাকব’স গ্রাভসান্ড (১৬৮৮-১৭৪২); সুত্র: http://www.teylersmuseum.eu/ afbeeldingen/ personen/fs/s_gravesande.jpg

এমিলি দ্যু শাতেলে এবং তার সহকর্মীরা,লাইবনিৎস এর এই ধারনার স্বপক্ষে প্রমান খুজে পান ডাচ দার্শনিক,গনিতজ্ঞ এবং পদার্থবিদ উইলেম জ্যাকব’স গ্রাভসান্ড এর করা সাম্প্রতিক একটি পরীক্ষায় ।তিনি নরম কাদার উপর বিভিন্ন বেগে পড়া ওজনের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষন করছিলেন। যদি সাধারন E=mv ঠিক হতো, তাহলে ‍দুইগুন বেগে ছোড়া একই  ওজনের কোন বস্তু কাদার মধ্যে দুই গুন গভীরে ডুবে যাবার কথা। একইভাবে তিনগুন দ্রুত গতিতে ছোড়া কোন ওজন তিনগুন বেশী দুরত্ব ডুবে যেত। কিন্তু গ্রাভসান্ড এর পরীক্ষার ফলাফল বলছিল ভিন্ন কথা। দ্বিগুন জোরে ছোড়া কোন বলটি ডেবে যাচ্ছে ৪ গুন আর ৩ গুন জোরে ছোড়া বলটা কাদার মধ্যে ডেবে যাচ্ছে ৯ গুন। দ্যু শাতেলে লাইবনিৎস এর তত্ত্বটিকে আরেকটু বর্ধিত করে ডাচ পরীক্ষকের ফলাফলটি অর্ন্তভুক্ত করলেন, অবশেষে শক্তির উপযোগী সংজ্ঞা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য mv² এর স্বপক্ষে জোরালো যুক্তি তৈরী হলো।


দ্যু শাতেলের বিখ্যাত  Institutions physiques এর কয়েকটি ড্রইং। লাইবনিৎস এর ধারনাকে বিস্তৃত করে তিনি লিখেছিলেন। খুব অল্প বয়সে মৃত্যুবরন করার আগে তিনি নিউটনকে ব্যাখা করে আরেকটি লেখা শেষ করেন।ছবি:University of Hamburg, নোভা/পিবিএস

অবশেষে একটি সম্পর্কের অবসান:

এমিলি দ্যু শাতেলে তার জীবদ্দশায় তৎকালীন ইউরোপে আধুনিক পদার্থবিদ্যার একজন প্রথম সারির একজন ব্যাখ্যা প্রদানকারী ছিলেন। এছাড়া দক্ষ ছিলেন গনিতে, ভাষাতত্ত্বে।কিন্ত তারপরও তিনি একটা বিষয়কে নিয়ন্ত্রন করতে পারেননি। ১৭৪৯ সালে ভলতেয়ারকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন তার গর্ভধারনের কথা, ৪০ বছর এর পরে গর্ভধারনের ঝুকির কথা উল্লেখ করে বলেন,’ আমি আমার জীবনের জন্য ভয় পাচ্ছি’; এমিলি সে যুগের অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা,যেখানে এ ধরনের গর্ভধারনের বিষয়গুলো মোকাবেলা করার মত দক্ষতা ছিলনা, তা নিয়ে কোন ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, শুধু ভলতেয়ারকে দুঃখ করে বলছিলেন, যাবার জন্য প্রস্তুত না হবার আগেই তাকে চলে যেতে হচ্ছে। সন্তান প্রসবের বেশ কিছুদিন পর তিনি প্রসব জনিত সমস্যার কারনেই মৃত্যুবরন করেন। ভলতেয়ার খুবই কষ্ট পেয়ে লিখেছিলেন:: “I have lost the half of myself—a soul for which mine was made.”

পুরোনো ফর্মুলাকে নতুন করে আইনস্টাইনের ব্যাখ্যা:

ক্রমান্বয়ে পদার্থবিদরা ভরের সাথে গুতিবেগের বর্গফলের গুনফলকে শক্তির একটি কার্য্যকরী ব্যাখ্যা হিসাবে ব্যবহার শুরু করেন । যদি একটা বল বা পাথরখন্ডের গতিবেগ ঘন্টায় ১০০ মাইল হয়,তাহলে তারা এর শক্তির পরিমাপ করেন এর ভরের সাথ এই গতিবেগের (১০০ মাইল/ঘন্টা)বর্গফলের গুনফলের আনুপাতিক। আর যদি এই গতিবেগ যদি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৬৭০ মিলিয়ন মাইল/ঘন্টা করা হয়, তাহলে বস্তুর মধ্যে সমস্ত অন্তর্নিহিত শক্তির পরিমাপ হবে এর ভর এবং c^2 এর গুনফল বা mc^2।

অবশ্যই এটা প্রমান না। কিন্ত আইনস্টাইনের বিস্তারিত গানিতিক ব্যাখ্যার মধ্যে হঠাৎ করে এটির আবির্ভাব খুবই স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত একটা ব্যাপার হয়ে প্রকাশ হয়েছিল।এটি তার চমক লাগানো তত্ত্বের উপসংহারকে আরো সুস্পষ্ট করেছিল, আপাতদৃষ্টিতে পৃথক দুটি ক্ষেত্র শক্তি এবং ভর এর মধ্যে যোগসুত্র করা সম্ভব, এবং c প্রতীকটি, আলোর গতিবেগ, এই যোগসুত্রটির মধ্যে রচনা করে সেতুবন্ধন।

Advertisements
আইনস্টাইনের E=mc² সমীকরনের পূর্বসুরীরা

One thought on “আইনস্টাইনের E=mc² সমীকরনের পূর্বসুরীরা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s