আমাদের ভুলে যাওয়া বছরগুলো : শৈশবের স্মৃতিবিলোপের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

(শীর্ষ ছবি: আয়নায় নিজেকে চিনতে পারার ক্ষমতা হচ্ছে আমাদের নিজস্বতা বা আমিত্ব সম্বন্ধে যে আমাদের ধারনা আছে তার একটি গুরুত্বপুর্ন লক্ষন। শৈশবের নিজস্ব কোন স্মৃতিকে দীর্ঘদিন মনের মধ্যে সংরক্ষন করার জন্য যা একান্ত প্রয়োজনীয় : ছবি; anders hviid/gallerystock/New Scientist)

(((নীচের এই লেখাটি নিউ সায়েন্টিষ্ট ম্যাগাজিনে (৩০ এপ্রিল,২০১১)প্রকাশিত Kirsten Weir এর Our Forgotten Years  প্রবন্ধটির একটি পরিবর্ধিত ভাবানুবাদ:কাজী মাহবুব হাসান. জুলাই ১৬,২০১১))))

ভুমিকার পরিবর্তে:

শুরুতেই একটা অনুরোধ করছি; দেখুনতো চেষ্টা করে, আপনার জীবনের ঠিক কতটা পুরানো স্মৃতি আপনি ‍মনে করতে  পারেন। পুরানো অর্থাৎ শৈশবের প্রথম কোন স্মৃতিটা আপনার মনে পড়ছে বা আপনি এখনো মনে করতে পারছেন? যদি মনে পড়ে এমন কোন পুরোনো স্মৃতি তাহলে এবার মনে করে দেখুনতো ঐ স্মৃতির ঘটনার সময় আপনার বয়সটা কত ছিল ।

আপনার বয়স যখন ৩ বা ৩ এর নীচে, আপনি কি কিছু মনে করতে পারছেন সেই সময়ের আপনার নিজস্ব কোন স্মৃতি?

এখানে শুধু একটাই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে সেটা হলো, স্মৃতিটা আপনার নিজস্ব হতে হবে। কখনো কখনো আমাদের শৈশবের কোন ঘটনার স্মৃতি আসলে আপনজনদের কাহিনীর ‍উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়, আমাদের মস্তিষ্ক তা জমা করা রাখে মিথ্যা স্মৃতি হিসাবে। যেমন একটা উদহারন দেই: আমার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতিটা যেটা আমি মনে করতে পারি,  খু্ব সম্ভবতঃ সেটা এমনই একটা মিথ্যা স্মৃতি। স্মৃতিটা হলো, আমার বয়স তখন ৩ এর আশে পাশে, আমাদের গ্রামের বাড়ীতে উঠান পেরিয়ে আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, বর্ষাকাল, পুকুরের উপচে পড়ছে পানিতে, ‍কচুরীপানার ফুল ধরার পরিকল্পনায় আগাচ্ছি, হঠাৎ করে মনে হলো, আমি মাটিতে নেই, আমার পায়ের নীচে পানি, ডুবে যাচ্ছি…ব্যাস এতটুকু। আরো কিছু ডিটেইল যা মনে আছে, তা হলো উঠান থেকে বের হলেই ডান দিকে একটা বিশাল সফেদা গাছ, আর বায়ে একটু দুরে গোয়ালঘর। স্মৃতিটা যে আমার নিজের না সেটা পরে আমি নিশ্চিৎ করেছি। প্রথমত সফেদা গাছটা তখন সেখানে ছিলনা, পরে এটা লাগানো হয়। তাছাড়া বা দিকে একটি ‍মাটির দোচালা ঘর ছিল, যে বাড়ীর একটি ছেলে আমাকে পুকুরের দিকে যেতে দেখে, সেই আমাকে উদ্ধার করে, আমার সেই উদ্ধারের স্মৃতি কিছু মনে নেই। যেহেতু এই ঘটনাটি বহুবার আমি শুনেছি, এটি আমার মনের মধ্যে রয়ে গেছে আমার নিজের স্মৃতি হিসাবে।

এবার আপনার কথা বলুন? কি মনে পড়ছে সেই খুবই ছোটবেলার কোন স্মৃতি?

না মনে পড়লে চিন্তার কোনই কারন নেই, কারন এই চাইল্ডহুড অ্যামনেশিয়া বা শৈশব স্মৃতিবিলোপ বেশ স্বাভাবিক একটা ঘটনা।

শৈশবের স্মৃতিবিভ্রম বা চাইল্ডহুড অ্যামনেসিয়া:

আগে উল্লেখ করেছি যে শৈশবের স্মৃতিবিভ্রম বা স্মৃতিবিলোপ কোনটাই অস্বাভাবিক না,বাস্তবিকই Childhood amnesia খুবই স্বাভাবিক এবং সর্বজনীন একটা ব্যাপার।বেশীর ভাগ মানুষই তাদের ২ বা ৩ বছর বয়সের আগের কোন স্মৃতি একেবারেই মনে করতে পারেন না আর এর পরের কয়েক বছরের স্মৃতিগুলো যদিও মনে পড়ে,বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো খুব একটা স্পষ্ট না। ব্যাপারটা বেশ দুর্বোধ্য বিজ্ঞানীদের কাছে, কারন,আর সব ক্ষেত্রেই শিশুরা কিন্ত অসাধারন কোন কিছু দ্রুত শেখার আর মনে রাখার ব্যাপারে। আমাদের জীবনের প্রথম কয়েকটা বছরের মধ্যে আমরা বেশ কিছু জটিল, আর সমস্ত জীবনের জন্য খুব প্রয়োজনীয়  কিছু দক্ষতা অর্জন করি; যেমন, হাটতে আর কথা বলতে শিখি, কাছের মানুষদের চেহারা দেখে তাদের চিনতে শিখি। কিন্তু শৈশবের সেই প্রথম বছরগুলোর সুনির্দিষ্ট সব স্মৃতিগুলো আমরা বড় হলে কিন্তু আর মনে করতে পারিনা। ব্যাপারটা এমন, যেন কেউ আমাদের আত্মজীবনী বইয়ের প্রথম কয়েকটি পাতা ছিড়ে ফেলেছে।


আমরা অনেকেই স্কুলে যাবার আগের সময়টাতে আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই মনে করতে পারিনা আর আমাদের জীবনের প্রথম কয়েকটি বছরের স্মৃতিগুলোও অস্পষ্ট থেকে যায় চিরকালই । ছবি: Kohei Hara/taxi japan/getty/New Scientist)

চাইল্ডহুড অ্যামিনেশিয়া বা শৈশবের এই স্মৃতিবিলোপের কারনটা আসলে কি? প্রায় এক শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে প্রশ্নটা মনোবিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে, কিন্ত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে  বেশ কয়েকটি গবেষনা, এই প্রশ্নের সম্ভাব্য কিছু ব্যাখ্যা দেবার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। এই গবেষনাগুলো এটাও ব্যাখ্যা দিয়েছে, কেন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের ছোটবেলার স্মৃতি আর অন্য সবার চেয়ে বেশী মনে রেখেছে এবং প্রশ্নও উঠেছে, সেই সব পুরোনো স্মৃতিগুলো কোনভাবে পুনরোদ্ধার করা কি সম্ভব?

দুজন ফরাসী মনোবিজ্ঞানী ভি এবং সি অঁরি,১৮৯৮ সালে  এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রথম গবেষনা করেন। গবেষনায় তারা লক্ষ্য করেছিলেন যে, পুর্নবয়স্ক কোন মানুষকে যদি তার সবচেয়ে পুরোনো আত্মজৈবনিক (অটোবায়োগ্রাফিক্যাল)কোন স্মৃতি মনে করতে বলা হয়, তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়,তাদের মনে করা স্মৃতিগুলো ঘটেছে তাদের বয়স যখন তিন ছাড়িয়ে গেছে। এর পরে আরো অনেক গবেষনায় একই রকম ফলাফল পান গবেষকরা। যা ইঙ্গিত করে একেবারে প্রথম যে স্মৃতিটা আমরা মনে করতে পারি, তখন আমাদের বয়স সাধারনতঃ ৩ থেকে সাড়ে ৩ বছর।এমনকি  এর পরের মোটামুটি আরো ৩ বছরের মত সময়ের ঘটনাগুলো মনে করতে গেলে বোঝা যায়, সেগুলো আসলে খুব স্পষ্টভাবে মনে করা সহজ হচ্ছে না। এরপর অর্থাৎ ৬ থেকে সাড়ে ৬ বছর বয়স থেকে মোটামুটি স্পষ্ট হতে থাকে আমাদের জীবনের অতীত স্মৃতিগুলো। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে অনেক। কেউ কেউ যেমন তাদের ২ বছর বয়সের স্মৃতি মনে করতে পারেন আবার কেউ তাদের ৬ বছর বয়সের, এমনকি ৮ বছর বয়সের স্মৃতিও মনে করতে পারেননা।

ভি এবং সি অঁরির গবেষনার ফলাফল প্রকাশের পর, এ বিষয়টিকে ব্যাখার চেষ্টা হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। ১৯০৫ সালের একটা প্রবন্ধে সিগমন্ড ফ্রয়েডও বিষয়টি ব্যাখ্যা করার একটা চেষ্টা করেছিলেন:তিনি বলেছিলেন আসলে আমরা আমাদের শৈশবের স্মৃতিগুলোকে অবচেতনভাবেই অবদমন করে রাখি, কারন তারা এমন সব যৌন এবং আগ্রাসী তাড়নায় পুর্ণ এবং আমদের জন্য তা এতাটাই লজ্জাজনক,যে আমরা সচেতন স্তরে তার মুখোমুখি হতে চাইনা। তার এই তত্ত্ব অবশ্য তেমন জায়গা করে নিতে পারেনি। বরং সেই জায়গাটা দখল করে নেয় অন্য একটি মতবাদ, তা হলো ঐ বয়সের শিশুরা  তাদের শৈশবের কোন ঘটনারই সুস্পষ্ট কোন স্মৃতি তৈরী করতে পারেনা।

এই ধারনাটায় আবার পরিবর্তনের হাওয়া লাগে ১৯৮০ সালের দিকে। যখন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের শৈশবের স্মৃতিচারন নির্ভর গবেষনার বদলে প্রথম সরাসরি শিশুদেরকে নিয়ে গবেষনাটা করা হয় ।এই গবেষনার ফলাফল প্রমান করে আসলেই ২ বা ৩ বছরের শিশুরাও তাদের আত্মজৈবনিক স্মৃতি মনে করতে পারে কিন্তু এই স্মৃতিগুলোই পরে অস্পষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়।

স্বভাবতই এর পরের প্রশ্নটা হলো,কি কারনে এরা বিস্মরনের অতলে হারিয়ে যায়?

স্পষ্টতই এই প্রশ্নের কোন সহজ উত্তর নেই। শৈশব এবং প্রথম কৈশরের কেমন করে মনে রাখার ক্ষমতা পরিবর্তিত বা বিবর্তিত হয়, এমন বিষয় নিয়ে গবেষনা করেন, নিউজিল্যান্ডের ডুনেডিনের  ইউনিভার্সিটি অব অটাগোর অধ্যাপক হারলিন হেইন (বর্তমানে ভাইস-চ্যান্সেলর), তার ভাষায়,আমরা যে মতামতে আপাতত পৌছেছি তা হলো, বেশ কয়েকটা পূর্বশর্ত বা ফ্যাক্টর একসাথে ‍যুক্ত হয়ে কোন স্মৃতিকে মনে রাখার আমাদের ক্ষমতাকে সম্মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।


অধ্যাপক হারলিন হেইন
(http://www.ed.co.nz/wp-content/uploads/2011/02/Prof-Harlene-Hayne.jpg)

এর একটি ফ্যাক্টর হলো আমাদের মস্তিষ্কের অ্যানাটোমি বা আকার, আকৃতি এবং গঠন। মস্তিষ্কের যে ‍দুইটি প্রধান অংশ আমাদের আত্মজৈবনিক স্মৃতি তৈরী এবং সংরক্ষন করে তা হলো প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স আর হিপপোক্যাম্পাস।  মনে করা হয় হিপপোক্যাম্পাসেই আমাদের জীবনের কোন ঘটে যাওয়া ঘটনা বা অভিজ্ঞতার খুটিনাটি বিষয়গুলো দীর্ঘ মেয়াদী স্মৃতি হিসাবে জমা রাখে এবং সংরক্ষন করে।


আমাদের মস্তিস্কে যে দুটি অংশ বিশেষভাবে স্মৃতি তৈরী আর সংরক্ষনের সাথে জড়িত। হিপপোক্যাম্পাস এবং প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স। ছবি: http://www.morphonix.com/software/education/ science/brain/game/specimens/hippocampus.html

ভেঙ্গে যাওয়া সেতুবন্ধন:

আটলান্টার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ে শৈশবকালীন স্মৃতির উৎপত্তি এবং বিকাশ নিয়ে গবেষনা করেন ডঃ প্যাট্রিসিয়া বাউয়ের, তার মতে সমস্যাটা মস্তিষ্কের এই স্মৃতি সংরক্ষনকারী জায়গাগুলোর অ্যানাটোমিতে।প্রচলিত মতে বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল, হিপপোক্যাম্পাস আর এর চারপাশের কর্টেক্স এর জায়গাগুলো খুব অল্পবয়সেই বা জীবনের প্রায় শুরুতেই পরিপুর্ণতা বা ম্যাচিউরিটি লাভ করে। কিন্তু মোটামুটি গত পনের বছর ধরে,বিজ্ঞানীদের কাছে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছে যে,মস্তিষ্কের এই জায়গাটির একটি বিশেষ অংশ, যার নাম ডেন্টেট জাইরাস, বয়স ৪ বা ৫ না হওয়া পর্যন্ত অপরিনত থাকে বা ম্যাচিউর হয়না।


ডেন্টেট জাইরাস, হিপপোক্যাম্পাস (http://blog.methuselahfoundation.org/brain.jpg)

ডেন্টেট জাইরাস, হিপপোক্যাম্পাস (http://ahsmail.uwaterloo.ca/~amarlin/neuroanatomy.html)

ডেন্টেট জাইরাস  জায়গাটি এক ধরনের সেতুর মতো কাজ করে,মস্তিষ্কে এর আশেপাশের এলাকা থেকে তথ্য বা সংকেত হিপপোক্যাম্পাসে পৌছাতে সহায়তা করে। সুতরাং যতদিন পর্যন্ত না এই ডেন্টেট জাইরাস পরিনত এবং পুর্ণ কর্মক্ষম হচ্ছে, আমাদের সেই বয়সের আর আদি অভিজ্ঞতাগুলো হিপপোক্যাম্পাসে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি হিসাবে জমা থাকার সুযোগ পায়না। বাওয়ের  এর ভাষায়,‘‘যদি এই পথটা স্মৃতির তথ্যগুলো ভিতরে প্রবেশ করতে দেবার মত যথেষ্ট পরিনত না হয়, তাহলে সেগুলো আসলে কাজে লাগার মতো কোন স্থায়ীত্ব পায়না’।


ড: প্যাট্রিসিয়া বাউয়ের
(http://gade.psy.ku.dk/2010autobiograph-memory-www/1148%20Patricia%20Bauer.JPG)

হারলিন হেইনও একমত এ বিষয়ে, তার মতে আমাদের মস্তিষ্ক অনেক দীর্ঘ সময় নিয়ে পরিণত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির ‍উৎপত্তি এবং সংরক্ষনের ক্ষেত্রে সেটি একটি গুরুত্বপুর্ন পর্যায়।কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে মস্তিষ্কের এই জায়গা পুরোপুরি পরিনত হওয়ার আগেই শিশুরা বেশ কিছু ঘটনা মনে করতে পারছে।সুতরাং সুষ্পষ্টভাবে এটি শৈশবে স্মৃতিবিলোপের একমাত্র কারন হবার সম্ভাবনা কম।

উপরন্তু গবেষনা করে দেখা গেছে বিভ্ন্নি সংস্কৃতির মানুষদের মধ্যে মনে করতে পারা প্রথম আত্মজৈবনিক স্মৃতিকালীন বয়সের কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। এরকম একটি গবেষনায় দেখা যায় যে,ইউরোপীয় বংশোদ্ভুতদের মধ্যে স্মরণযোগ্য প্রথম স্মৃতির গড় বয়স ৩.৫ বছরের আশেপাশে, পুর্ব এশিয়ার মানুষদের মধ্যে  এটি ৪.৮ বছর এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরী আদিবাসীদের মধ্যে এটি ২.৭ বছর(সুত্র:Memory,vol.8, p365),হাইনের ভাষায় এই পার্থক্যগুলোকে শুধুমাত্র মস্তিষ্কের পরিনত হবার  বিলম্বিত ধীর প্রক্রিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। তার মতে, নিশ্চয়ই এই প্রশ্নের আরো কিছু উত্তর আছে।


অধ্যাপক মার্ক হাওয়ি
(http://www.pediatricpsychologicaltrauma.org/conference/faculty/mark-l-howe/)

যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় মার্ক হাওয়ি‘র মতে তিনি এই প্রশ্নের আরেকটি সম্ভাব্য উত্তর খুজে পেয়েছেন। তিনি মনে করে, শৈশবে স্মৃতিবিলোপের পরিসমাপ্তি ঘটায় যে বিষয়টা সেটা হলো কগনিটিভ সেলফ (Cognitive self) এর উদ্ভব। এই কগনিটিভ সেলফ আসলে কি? এটি হচ্ছে মুলতঃ আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বা স্বতন্ত্রতা সম্বন্ধে অনুভব বা সচেতনাতা;আমার ‘আমি’ সত্ত্বাটা যে আপনার ‘আপনি’ থেকে পৃথক, সেটাই বোঝার ক্ষমতা। এই আমাদের নিজস্ব আমিত্বকে বোঝার ক্ষমতাটা তৈরী  হয় আমাদের ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সের মধ্যে,অর্থাৎ আমাদের আত্মজৈবনিক স্মৃতিগুলোর আবির্ভাব হওয়ার ঠিক আগে।

কিন্তু এটাই কি সেই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে?

গত ১০ বছরে, অধ্যাপক হাওয়ি বেশ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে এই ধারনাটার সত্যতা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করে গেছেন।  এক থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে তার সেরকমই একটি সাম্প্রতিক একটি গবেষনা, যেমন, প্রথমে তিনি দেখেন, তার এই গবেষনায় অংশ নেয়া এই বয়সী (১ থেকে ৩) শিশুরা আয়নায় তাদের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেদের চিনতে পারে কিনা? সাধারনত আয়নায় নিজেকে চিনতে পারার ক্ষমতাটাকে, কারো নিজের স্বকীয়তা সম্বন্ধে তার ধারনার অস্তিত্ব আছে, এমন একটি লক্ষণ হিসাবে গন্য করা হয়।


আয়নায় নিজেকে চিনতে পারার ক্ষমতা হচ্ছে আমাদের নিজস্বতা বা আমিত্ব সম্বন্ধে যে আমাদের ধারনা আছে তার একটি গুরুত্বপুর্ন লক্ষন :
ছবি; anders hviid/gallerystock/New Scientist)

এর পরে তিনি তাদের একটা খেলনা সিংহ দেখান এবং বেশ কয়েকটি কেবিনেটের ড্রয়ারগুলোর কোন একটাতে সেটি ঢুকিয়ে রাখেন। কয়েক সপ্তাহ পর তিনি প্রত্যেকটি শিশুকে পৃথক প্রথক ভাবে তার ল্যাবে আবার নিয়ে আসেন এবং  তাদের জিজ্ঞাসা করেন সিংহটা কেবিনেটের কোন ড্রয়ারে ঘুমিয়ে আছে, সেটা তাদের মনে আছে কিনা? তিনি যেটা লক্ষ্য করেন সেটা হলো, সিংহটা লুকিয়ে রাখার ঘটনার সময় যে শিশুদের কগনিটিভ সেলফ  ছিল বা আয়না নিজেদের চিনতে পেরেছিল, তারাই কয়েক সপ্তাহ পরে মনে রাখতে সক্ষম হয়েছে, সিংহটাকে ঠিক কোন ড্রয়ারে রাখা হয়েছে। অপরদিকে যে শিশুদের সেই সময় কগনিটিভ সেলফ বা নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় চিনতে পারার ক্ষমতা ছিল না, সিংহের অবস্থান মনে করার ক্ষেত্রেও তারা হয়েছিল ব্যর্থ। ডঃ হাউয়ি মনে করেন, আমাদের নিজের সম্বন্ধে আমার বোধ আমাদের স্মৃতিগুলোকে সংঘটিত করতে সাহায্য করে, যার কারনে আমরা সহজে সেই স্মৃতিগুলোকে মনে করতে পারি। স্মৃতিগুলো আরো বেশী স্মরণযোগ্য হয়আর দীর্ঘ দিন আমরা সেগুলো মনে রাখতে পারি। কিন্তু ১ থেকে ৩ বছরের শিশুরা  আয়নায় নিজেদের প্রতিফলন চেনার পরবর্তী সময় থেকে কেন তাহলে আমাদের অনেক স্মৃতিই অস্পষ্ট থেকে যায়? তার মানে এটাই তাহলে একমাত্র ব্যাখ্যা না। হাউয়ি নিজেই স্বীকার করেন, যে কগনিটিভ সেলফ বা আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা সম্বন্ধে আমাদের ধারনা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, যদিও তা হয়তো আত্মজৈবনিক স্মৃতি গঠনের জন্য এককভাবে যথেষ্ট না।

যাদুর খাটো বা ছোট করার যন্ত্র:আরো অন্য কোন কারন আছে, যা ব্যাখ্যা করতে পারে কেন আমাদের কগনিটিভ সেলফ এর আবির্ভাবের পরও স্মৃতিগুলো অস্পষ্ট বা অসম্পুর্ন রয়ে যায়। হারলেইন হাইনের মত এই বাড়তি কারনটা হলো আমাদের কথা বলার ক্ষমতার উদ্ভব। এটা পরীক্ষা করার জন্য তিনি ২ থেকে ৪ বছরের শিশুদের একটি খেলনা দিয়ে খেলতে দেন, খেলনাটির নাম যাদুর ছোট করা যন্ত্র। শিশুরা প্রথমে এই যন্ত্রে একটা জিনিস রাখবেন, এবং বেশ কয়েকটা ধারাবাহিক কাজের পর, ঠিক একই রকম তবে আকারে ছোট একটি জিনিস বের হয়ে আসবে। হাইন এই খেলার সময় শিশুরা কতগুলো শব্দ বলতে পারে বা বোঝে তা রেকর্ড করে রাখেন। এরপর ৬ মাস থেকে ১ বছর পরে তিনি শিশুদের আবার তার ল্যাবরেটরীতে নিয়ে আসেন এবং যাদুর ছোট করার যন্ত্র সম্বন্ধে তাদের জিজ্ঞাসা করেন। তারা খেলনাটা কে মনে করতে পারে এমন কিভাবে তা খেলেছিল তা অভিনয় করে দেখায়, কিন্ত কোন ক্ষেত্রেই তারা তাদের বর্ণনাতে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করেনি, যা কিনা তারা যখন খেলনা নিয়ে খেলেছিল, তখন তাদের শব্দভান্ডার বা ভোকাব্যুলারীতে ছিলনা, যদি মাঝের এই কতদিনে তাদের শব্দভান্ডারের আকারে বেড়েছে  অনেক (Psychological Science, vol 13,p225)।হাইনের ভাষায় বলেন, তাদের বর্ণনা করার ক্ষমতা আসলে আটকে আছে,তাদের সেই সময়ের ভাষা আর শব্দভান্ডারের অনুপাতে।

পরবর্তীতে আমাদের এই ভাষার উপরে দক্ষতার আগমনের ‍সাথে আমাদের স্মৃতির উৎপত্তির যোগসুত্র সংক্রান্ত আরো কিছু প্রমান আমরা দেখি যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্টিন কনওয়ে এবং ক্যারোলিনা মরিসনের একটি প্রকাশিত গবেষনার ফলাফলে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী আমাদের প্রথম স্মৃতি কি হবে তা নির্ভর করে আমরা তখনকার শব্দভান্ডারের উপর। তাদের গবেষনাটা পরিচালিত হয়েছিল পুর্ণ বয়স্ক মানুষদের উপর; এ‌ই গবেষক দুজন তাদেরকে কিছু শব্দ, যেমন. বল, ক্রিস্টমাস এর সাথে জড়িত তাদের প্রথম কোন স্মৃতি, এবং ঐ সময়ে তাদের বয়স কত ছিল, তার বিবরণ দিতে বলেন। এবং গবেষনা দেখা যায় যে নির্দেশক শব্দ সংশ্লিষ্ট সব স্মৃতিগুলো সময় এই শব্দটা শেখার গড় বয়সের কয়েক মাস পরে (Cognition vol 116, p 23) ।


ডঃ মার্টিন কনওয়ে
(http://gade.psy.ku.dk/2010autobiograph-memory-
www/0804%20Martin%20Conway.JPG)


ডঃ ক্যাট্রিওনা মরিসন
(http://t2.gstatic.com/images?q=tbn:ANd9GcT3RZR osciQ0S3O7i_
SkNFv6wLq7aWjfJZwySe J9jSup4R1bHAxRA&t=1)

ডঃ মরিসন এর বক্তব্য অনুযায়ী,কোন বিশেষ শব্দ বা শব্দটি দ্বারা যা বোঝায়,তাকে ঘিরে আমাদের স্মৃতির তৈরী হবার আগে ঐ শব্দটিকে আমাদের শব্দভান্ডারে আগে থাকতে হবে।হয়তো আমাদের আমিত্ব সম্বন্ধে ধারনা হয়তো একটা কাঠামো তৈরী করে, যার চারপাশে আমাদের স্মৃতিগুলো সংগঠিত হতে পারে এবং তারপর ভাষার আবির্ভাব আরো একটা ভিত্তি তৈরী করে দেয়, যা স্মৃতিগুলোর খুটিনাটি বিষয়গুলোকে এমন একটা রুপ দেয়, যা আমরা অনেক বছর পরেও মনে করতে পারি। মরিসন মনে করেন, এর কারন কথা বলার ক্ষমতা আর ভাষার ব্যবহার কোন শিশুকে বর্ণনামুলক কাহিনী গঠনে সুযোগ করে দেয়, যা তাদের স্মৃতিকে একটা সংহত করে। একটি ২ বছরের শিশু একটা কুকুরকে ঠিকই চিনতে পারে, কিন্তু ৪ বছরের আগে সে কিন্তু তার পোষা প্রাণীটাকে নিয়ে কোন স্মৃতি মনে করতে পারেনা। মরিসনের প্রশ্ন তাহলে কি এই সংযোগগুলো কাকতলীয় ব্যাপার, যে স্মৃতিরও উদ্বব ঘটে যখন আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা আমাদের ভাষয় প্রকাশ করতে পারি? হাইন এবং তার সহযোগীরা এই বর্ণনা করার গুরুত্বটাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, তাদের গবেষনায় শিশুর দ্বিতীয় এবং চতুর্থ জন্মদিনের মাঝামাঝি নানাসময়ে মা ও শিশুর মধ্যে কথোপকথন লিপিবদ্ধ করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল এই ঘটনার বিবরণগুলো কেমন ছিল, এই কথোপকথনে, সেখানে কি “elaboration” বা বিস্তারিত বিবরণ ছিল (ঘটনার খুটিনাটির বিশদ বিবরণ) নাকি “Repeatation” পুনরাবৃত্তি (যার লক্ষ্য ঘটনার শুধু একটি বা দুটো দিকের বিবরণ মাত্র)।

দশ বছর পরে গবেষক টীম এই শিশুদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সবচেয়ে পুরানো স্মৃতির কথা জিজ্ঞাসা করা হয়। তারা দেখলেন যে,যে শিশুদের সাথে তাদের মায়েদের কথাবার্তায় অনেক বেশী পুনরাবৃত্তি বা রিপিটেশনের চেয়ে ইলাবরেশন বা বিষদ বিবরণ বেশী ছিল (Child Development, vol 80,p 496)।অন্যভাবে বললে আপনি আপনার সন্তানের সাথে শৈশবে যেভাবে কথা বলবেন, সেটা হয়তোবা তাদের ভবিষ্যতের তাদের  শৈশবের স্মৃতি কিভাবে মনে রাখবে তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ব্যাপারটা সম্ভবত বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিতে শৈশবকালীন স্মৃতি মনে রাখতে পারার ব্যাপারে পরিলক্ষিত পার্থক্যগুলো ব্যাখ্যা করতে পারে। পূর্ব এশিয়ার বাবা মাদের তুলনায় ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার বাবা মারা তাদের অতীত নিয়ে বেশী বিস্তারিত গল্প করে থাকেন, সেকারনে হয়তো তাদের ছেলেমেয়েদের শৈশবের স্মৃতিও অনেক বেশী।  নিউজিল্যান্ডের মাওরী আদিবাসীদের গল্প বলার সংস্কৃতি  এমনকি আরো ব্যাপক এবং সমৃদ্ধ। তাদের বিস্তারিত মৌখিক ইতিহাস এবং অতীতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ, তাদের শৈশবকালীন সময়ের আরো পুরোনো স্মৃতি মনে রাখার জন্য সহায়ক। আত্মজৈবনিক স্মৃতির ক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ এবং সামাজিক ক্রমবিকাশের  আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে গবেষনাকারী কি ওয়াং  বলেন,আত্মজৈবনিক স্মৃতির ক্ষেত্রে পারিবারিক ভাবে পুরোনো স্মৃতি নিয়ে শিশুদের সাথে আলোচনা খু্বই গুরুত্বপুর্ণ।


ড: কি ওয়াঙ ( (http://www.human.cornell.edu/bio.cfm?netid=qw23)

মনের ট্রাইম ট্রাভেল:

মনে হতে পারে কথা বলা অর্থাৎ ভাষার দক্ষতা সম্ভবত খুবই গুরুত্বপুর্ণ শৈশবের পুরোনো স্মৃতি মনে রাখার জন্য- কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা এখনও সুস্পষ্ট না। অতীত নিয়ে কথা বললে শিশুরা যে শুধুমাত্র কোন ঘটনা বর্ননা করার দক্ষতা অর্জন করবে তা কিন্তু না, এটা তাদের নিজস্বতা সম্বন্ধে অনুভুতিটাকেও গড়ে উঠতে দেয়অ উত্তর আমেরিকার সংস্কৃতিতে মানুষ স্মৃতিচারন মুলক বই আর রিয়েলি টিভির প্রতি দারুনভাবে আকৃষ্ট। ওয়াং এর ভাষা, এসব কিছুই জীবন কাহিনী সংক্রান্ত। তাই এই সংস্কৃতিতে পিতামাতা এবং সন্তানের কথোপকথনে মুলতঃ প্রাধান্য পায় শিশুর নিজের অভিজ্ঞতা আর অনুভুতি, কিন্তু পু্র্ব এশিয়ীয় পিতামাতা অতীতের কোন ঘটনা ব্যবহার করে তাদের সন্তানরা যাতে ভবিষ্যতের ভালো করতে পারে তার শিক্ষা উপকরন হিসাবে, ঐ ঘটনার সময় শিশুর অনুভুতি বা তার ভুমিকাটা গৌন। ফলাফলে এইসব বিভিন্ন সংস্কৃতিতে শিশুদের ব্যাক্তিগত আত্মপরিচয় সম্বন্ধে তাদের বোধটাও ভিন্ন। এখন মনে হচ্ছে যেন ভাষা এবং আত্মোপলদ্ধি ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত এবং উভয়েরই প্রয়োজন আছে আত্মজৈবনিক স্মৃতির পরিপুর্ন বিকাশে। গবেষনার  এই ফলাফলগুলো আমাদের মন সম্বন্ধে আমাদের বিস্তারিত ধারনাকে নতুন আলোকে ব্যাখ্যা করতে পারে। যেমন, আমাদের অতীতের স্মৃতির গভীর অনুসন্ধান করার ক্ষমতা ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতকে কল্পনা করার ক্ষমতার সাথে। আর যেহেতু বিভিন্ন সংস্কৃতিতে অতীতকে মনে করার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান, আমরা তাই এই ভবিষ্যত টাইম ট্রাভেলের মধ্যেও পার্থক্য আশা করতে পারি। এবং ঠিক সেটাই ওয়াং পেয়েছেন তার গবেষনায়, তার এই গবেষনা অন্য প্রানীদের স্মৃতির গুনগত মানের ব্যাপারটাতে আলোকপাত করবে।

একটা বড় প্রশ্ন বাকী থেকে যায় যদিও:কখনো কি সম্ভব আমাদের কাছে বর্তমানে লুকিয়ে আছে আমাদের শৈশবের এমন কোন স্মৃতিকে আমরা কি পুনরোদ্ধার করতে পারবো। এটা স্পষ্ট যে প্রত্যেক শিশুই তাদের স্বল্পকালীন স্মৃতিতে অনেক কিছু মনে রাখতে পারে। অনেক বাবা মাই তা লক্ষ্য করেছেন, ছোট শিশুরা তাদের কয়েক সপ্তাহ আগের ঘটনা মনে রাখতে পারে।কিন্ত এই স্মৃতিগুলো স্থায়ী না, ভঙ্গুর, হয়তো কখনোই চিরস্থায়ীভাবে তা সংরক্ষিত হয়না। বাউয়েরের মতে সেই সব স্মৃতিগুলো হয়তো সেখানে না থাকার সম্ভাবনাই বেশী। হাইনস এর সাম্প্রতিক এবং অপ্রকাশিত গবেষনা বলছে, এই প্রথম জীবনের স্মৃতিগুলো কখনোই স্থায়ীভাবে আমাদের মস্তিষ্কে থেকে যায়না, যা আমার পরে উদ্ধার করতে পারবো। এমনকি  ঘটনার পরপরই যদি আমাদের তা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। তার গবেষনায় তিনি দেখেছেন একজন ২০ বছর বয়সী কারো তার ১৫ বছর বয়সী ভাই এর জন্ম সম্বন্ধে যে পরিমান তথ্য মনে করতে পারে তা একজন ৫ বছর বয়সীর মাত্র একমাস আগে তার ভাইএর জন্ম সম্বন্ধে যা তথ্য মনে করতে পারে তার সমান। কেই যদি ২০ বছর বয়সীর ডাটা আর ৫ বছর বয়সীর ডাটা দিয়ে কোন চার্ট বানানা তারা প্রায় একই রকম হবে। তার মতে এই স্মৃতিগুলো আসলে বড় হয়ে যে ভুলে গেছে তা কিন্তু না, স্মৃতিটা মস্তিষ্কে জমাই হয়নি। অন্য অনেকেই আশা করেন যে  এই অতীতের স্মৃতিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হবে। যেমন কনওয়ে, তিনি বলেন এই স্মৃতি গুলো ঠিকই জমা হয় কিন্তু তাদের মনে করা যায়না। কারন স্মৃতিগুলো হচ্ছে অনেকটা আমাদের সংবেদী অভিজ্ঞতার স্ন্যাপ শটের মত। যতই আমাদের বয়স বাড়তে থাকে, আমরা ভাষায় দক্ষ হই, আমাদের আমিত্ব সম্বন্ধে আমরা সচেতন হই এবং আরো কিছু বোধগত জ্ঞান আমাদের সেই সংবেদনশীল অনুভুতির স্ন্যাপশটগুওলাকে একটা আকার দেই এবং তাদের মনে করতে পারি। তার কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে আমাদের মস্তিষ্কে মজুত থাকা স্মৃতিগুলো আমরা খুজে বের করতে পারবো, যদি আমরা সঠিক  সংকেত টা খুজে পাই। মরিসনও ঠিক সেভাবেই ভাবছেন। প্রথাগতভাবে স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেবার সংকেত বা কিউ গুলো হলো কোর শব্দ বা ছবি, কিন্তু মরিসন এগুরো ছাড়া চেষ্টা করছেন,অন্য কিছু সংকেত যেমন গন্ধ,স্বাদ বা সংগীত কে কোন পুরাতন স্মৃতিকে মনে করার জন্য কিউ হিসাবে ব্যবহার করতে। যদি তিনি ও তার সহযোগীরা তা করতে সফল হন,এবং আসল সংকেতটি খুজে বের করতে পারেন তাহলে অনেকেই হয়ত তাদের হারিয়ে যাওয়া বছরগুলোর অনেক স্মৃতি খুজে পেতে পারেন। মরিসন বলছিলেন স্মৃতি নিয়ে কাজ করে এমন সব গবেষকরাই জানের, আমরা বিষয়টাকে যতটা বুঝতে পেরেছি,ঠিক ততটা এখনো অজানা রয়ে গেছে।

সত্যি কিংবা মিথ্যা:

আমরা অনেকেই আমাদেরকে নিয়ে ছোটবেলার অনেক স্মৃতি আমাদের বাবা মা, কাছের আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে বহুবার শুনেছি। এতবার যে আপনি চোখ বন্ধ করলে তা আপনার মনের মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পান। কিন্তু আপনার এই স্মৃতিগুলো কি আসলে সত্যি? নাকি আপনার মন  শোনা কোন পারিবারিক গল্পের উপর ভিত্তি করে গড়ে ‍তুলেছে মিথ্যা কোন স্মৃতি? এই প্রশ্নটাই স্মৃতি নিয়ে যারা গবেষনা করেন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা,প্যাট্রিসিয়া বাউয়ের এর ভাষায়; মার্টিন কনওয়ে আরো যোগ করেন যে , আসলে আমাদের কোন স্মৃতিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা কঠিন। সেখানে যেমন অনেক তথ্যই অনুপস্থিত থাকে, তেমনি অনেক ভুল তথ্যও থাকে। হারলিন হাইন এবং তার সহযোগী তাদের গবেষনার অংশগ্রহন কারীদের তাদেন জীবনে ঘটেনি এমন কোন শৈশবের ঘটনা মনে করার জন্য আগে থেকেই প্রাইম বা তৈরী করেছিলেন,দেখা গেল বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তারা মিথ্যা স্মৃতি তৈরী করার সম্ভাবনা বেশী  যদি বলা হয় ঘটনাটা ঘটেছিল তাদের ২ বছর বয়সে,অথচ যদি বলা হয় ঘটনাটা ঘটেছে তাদের ১০ বছর বয়সে, মিথ্যা স্মৃতি তৈরী করার সম্ভাবনাও কমে যায়  (Memory, vol 16, p 475). । এই ব্যাপরটার প্রায়োগিক একটি গুরুত্ব আছে, বিশেষ করে যখন আদালতে এমন কোন মামলা যা কিনা পুরোনো কোন স্মৃতির উপর নির্ভর করে, যেমন:যেখানে শিশু নির্যাতনের মত ঘটনার তদন্ত করা হয়।

হাতির স্মৃতি:

যদি আমাদের আত্মজৈবনিক স্মৃতি সৃষ্টি হবার পুর্বশর্ত হয় ভাষার দক্ষতা আর নিজের আমিত্ব সম্বন্ধে ধারনা, তার মানে কি শুধুমাত্র মানুষই পারে তার অতীত নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে? কিছু কিছু প্রানী যেমন শিম্পান্জ্ঞি.হাতি, বটল নোস ডলফিন কিন্তু আয়নায় নিজেদের চিনতে পারা পরীক্ষা বা মিরর সেল্ফ রিকগনিশন টেস্ট এ পাশ করেছে। যা প্রমান করে তাদের সামান্য হলে নিজস্ব আমিত্ত্ব সম্বন্ধে ধারণা আছে এবং তারা অবশ্যই দীর্ঘ মেয়াদী স্মৃতি সংরক্ষন করতে সক্ষম। ক্যাট্রিওনা মরিসনের মতে, অন্য প্রানীদের স্মৃতি আসলে একধরনের কোন একটা সংকেত বা উত্তেজনার প্রতি একধরনের শর্তসাপেক্ষ প্রতিক্রিয়া, সেটা কোন সচেতনতা (বা আত্মসচেতনতা) নির্ভর চিন্তাপ্রক্রিয়া না। কোন ভাষার দক্ষতা আর আরো বেশী উন্নত  বৈশিষ্ট যেমন আত্ম সচেতনার অনুপস্থিতিতে অন্যকোন প্রানীদের স্মৃতি ব্যাপারটা থাকা সম্ভাবনা তেমন নেই। হারলীন হাইনও মনে করেন, আত্মজৈবনিক স্মৃতি শুধু মাত্র মানুষের মধ্যে সম্ভব।

তাহলে শুরুর কথা….. শেষ করি

সালভাদর দালির আকা পারসিসটেন্স অব মেমোরী

 
দি পারসিসটেন্স অব মেমোরী, সালভাদর দালী (১৯৩১)

কিংবা চার্লি কউফম্যানের লেখা মাইকেল গ্রন্ডির ইটারন্যাল সানসাইন অব স্পটলেস মাইন্ড সিনেমার একটি সংলাপ দিয়ে …

How happy is the blameless vestal's lot!
The world forgetting, by the world forgot.
Eternal sunshine of the spotless mind!
Each pray'r accepted, and each wish resign'd"
((কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ)))

 

Advertisements
আমাদের ভুলে যাওয়া বছরগুলো : শৈশবের স্মৃতিবিলোপের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

9 thoughts on “আমাদের ভুলে যাওয়া বছরগুলো : শৈশবের স্মৃতিবিলোপের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

  1. তাই তো, আমার প্রথম বয়সের স্মৃতিগুলো কোথায় গেল? প্রথমে ভাবলাম হিপোক্যাম্পাস দায়ী, পরে মনে হলো না, নিজেকে চিনতে পারি কি না। শেষে এসে দেখলাম ভাষা শিক্ষাটাই প্রভাবশালী। অনেকগুলো নতুন নতুন চিন্তার খোরাক পাওয়া গেল।
    +++++++++++

  2. সেটাই বেশ কিছু জিগস পাজলের পিস এখনো ঠিক জায়গায় বসেনি;
    পরবর্তী কয়েকটা দশক আমার মনে হয় নিউরোসায়েন্টিষ্টদের;
    ধন্যবাদ পড়ার জন্য…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s