দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: দ্বিতীয় পর্ব, ১,২ এবং ৩

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর
বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।  
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা
 দ্বিতীয় পর্ব: আত্মা এবং শরীর


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

লেখকের পক্ষে পাঠকদের মনে বিশ্বাস জন্মানোর চেষ্ঠা সম্ভবত অর্থহীন হবে যে, তার চরিত্রগুলো আসলেই কোন একসময় জীবিত ছিল। কোন মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি তাদের, তাদের জন্ম হয়েছে একটি কিংবা দুটি উদ্দীপক বাক্য বা কোন একটি সাধারন মৌলিক পরিস্থিতি থেকে। টমাসের জন্ম হয়েছে ’আইনমাল ইস্ট কাইনমাল’ (Einmal ist keinmal’), এই প্রবাদ বাক্যটি থেকে।তেরেজার জন্ম হয়েছে একটি পেটের গুড়গুড় শব্দ থেকে।

প্রথম বারের মত যখন তেরেজা টমাসের ফ্ল্যাটে যায়,তার পেটের ভেতরে গুড়গুড় করে শব্দ শুরু হয়েছিল; আর এমন হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু ছিল না, কারন সেই সকালের খাবারের পর সে আর কিছু খায়নি; ট্রেনে উঠে বসার আগে প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে শুধু একটা স্যান্ডউইচ খেয়েছিল । তার সমস্ত চিন্তা জুড়ে ছিল ভবিষ্যতের দিকে তার এই দু:সাহসী যাত্রার কথা, খাওয়ার কথা তার মনেই ছিল না। কিন্তু যখন আমরা আমাদের শরীরকে উপেক্ষা করি, খুব সহজেই আমরা তার শিকারে পরিণত হই। খুবই খারাপ লাগছিল তার, পেটের মধ্যে এই অস্বস্তিকর শব্দ নিয়ে টমাসের সামনে দাড়িয়ে থাকতে। মনে হচ্ছিল তখনই সে কেদে ফেলবে। সৌভাগ্যজনকভাবে, প্রথম দশ সেকেন্ড পরই টমাস তাকে আলিঙ্গন করে, এবং তেরেজাকে তার শরীরের গভীর থেকে আসা বিব্রতকর শব্দগুলোর কথা ভুলিয়ে দেয়।

সুতরাং তেরেজার জন্ম হয়েছে সেই পরিস্থিতিতে, যা খুব নিষ্ঠুরভাবে প্রকাশ করে শরীর এবং আত্মার অসমন্বয়যোগ্য দ্বৈততা, সেই মৌলিক মানবিক অভিজ্ঞতাটি।

বহুদিন আগে, মানুষ বিস্ময়ের সাথে তার বুকের ভিতর  ছন্দময় স্পন্দনের শব্দ শুনতে পেত, কখনো বুঝতে পারেনি শব্দগুলো আসলে কি। শরীরের মত অনাত্মীয় আর অচেনা একটি জিনিসের সাথে মানুষ পারেনি নিজেকে একাত্ম করে ভাবতে। শরীরটা ছিল যেন একটি খাচার মত, আর সেই খাচার ভিতরে ছিল কিছু একটা জিনিস,যা দেখতো, শুনতো, ভয় পেতো, ভাবতো এবং বিস্মিত হতো, সেই কিছু বিষয়টি হলো -যা রয়ে যায় শরীরের সব হিসাব নিকাশ শেষ হলে – আত্মা।

আজ অবশ্য, আমাদের শরীর আর অচেনা কিছু নয়: আমরা জানি আমাদের বুকের মধ্যে ছন্দময় স্পন্দন আসলে হৃদপিন্ড, নাক হচ্ছে একটা পাইপের মুখ যা শরীরের বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে,ফুসফুসে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাবার জন্য। আমাদের চেহারা আর কিছুই না, শুধু একটা ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেল, যা শরীরের নানা কর্মকান্ড কেমন চলছে তার জানান দেয়: পরিপাক,দৃষ্টি, শ্রবণ ক্ষমতা, শ্বাস, চিন্তা।

যেদিন থেকেই মানুষ তার শরীরের নানা অংশকে নাম দিতে শিখেছে, শরীর তাকে কম সমস্যায় ফেলেছে। মানুষ এটাও জেনেছে, আত্মা আসলে  তার মস্তিষ্কের কর্মরত গ্রে ম্যাটার ছাড়া আর কিছু না। শরীর এবং আত্মার প্রাচীন দ্বৈততা এখন ঢাকা পড়ে গেছে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এবং  হাসতেও পারি আমরা একে শুধুমাত্র সেকেলে একটি কুসংস্কার মনে করে।

কিন্তু শুধু প্রেমে পড়েছে এমন কাউকে তার পেটের গুড়গুড় শব্দ শোনানো হোক, আত্মা এবং শরীরের একাত্মতা, বিজ্ঞানের যুগে  সেই ক্যাব্যিক মায়াময়তা সাথে সাথেই ম্লান হয়ে যায়।

তেরেজা তার নিজেকে তার শরীর দিয়েই দেখার চেষ্টা করে। একারনেই, কৈশোর থেকেই সে বার বার আয়নার সামনে দাড়াতো, এবং যেহেতু তার ভয় ছিল তার মা এভাবে তার আয়নায় উকি মারাটা দেখে ফেলতে পারে, সেকারনেই প্রতিবার আয়নায় চোখ রাখার কাজটায় মিশ্রিত ছিল গোপনীয় কোন পাপ।

কোন অহংকার কিন্তু তাকে আয়নার সামনে টানেনি; তেরেজা তার নিজের ’আমিকে’ দেখারই তীব্র বিস্ময় আর আনন্দ ছিল মুখ্য। সে ভুলে যেত, সে শুধু তার শরীরের নানা যন্ত্রের ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেলটির দিকে তাকিয়ে আছে মাত্র; সে ভাবতো তার মুখায়ববের মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল আলো হয়ে বেরিয়ে আসা তার আত্মাকে যেন দেখছে। সে ভুলে যেত, নাক হচ্ছে সেই পাইপের মুখ যা অক্সিজেন নিয়ে যায় ফুসফুসে;সে দেখতো তার নিজস্ব প্রকৃতির নিখুত এবং সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি।

অনেক দীর্ঘ সময় ধরেই আয়নায় নিজেকে দেখতো তেরেজা, মাঝে মাঝে বিচলিত হত সে, চেহারায় তার মায়ের বৈশিষ্টগুলো লক্ষ্য করে। সেই বৈশিষ্টগুলোকে সরিয়ে দেবার ইচ্ছায় এবং শুধু তার নিজের টুকু ধরে রাখার চেষ্টায় সে আরো বেশী গভীর মনোযোগ দিয়ে তার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতো; আর যখনই সে সফল হতো,অদ্ভুত এক আনন্দের মত্ততা অনুভব করতো তেরেজা সেই সময়: তার শরীরের ভিতর থেকে উঠে আসতো তার আত্মা, যেমন করে কোন জাহাজের গভীর থেকে  বের হয়ে আসে নাবিকরা দল বেধে, ছড়িয়ে পরে ডেকের উপর, আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ায় আর বিজয়ের আনন্দ উল্লাসে গান গায়।

(((((((((((((((((((চলবে))))))))))))))))))))))))))))))))) 

[১] Einmal ist keinmal:  একটি জার্মান প্রবাদ, যার  ইংরেজী অর্থ Once is never।

One thought on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: দ্বিতীয় পর্ব, ১,২ এবং ৩

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s