দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: দ্বিতীয় পর্ব, ৬,৭ এবং ৮

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর
বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।  
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

অবশ্যই তেরেজার জানা নেই সেই রাতের কাহিনী, যখন তার মা তার বাবার কানে ফিসফিস করে বলেছিল, ’সাবধানে’; তার অপরাধী বিবেক সেই আদি পাপের মতই অস্পষ্ট। কিন্তু এর থেকে তার মুক্তি পাবার জন্য যা কিছু করার দরকার সে তা করেছে। পনেরো বছর বয়সেই তার মা তাকে স্কুল ছাড়িয়েছিল এবং ওয়েট্রেস হিসাবে কাজ শুরু করেছিল তখন থেকেই, তার আয়ের সবটুকু তার মার হাতে তুলে দিতে হয়েছে। তার মায়ের ভালোবাসা পাবার জন্য যা করার দরকার সবকিছু করার জন্য প্রস্তুত ছিল সে। পুরো সংসারের দেখাশোনা করেছে,তার ভাইবোনের যত্ন নিয়েছে, প্রতি রবিবার সারাটা দিন সে পার করেছে ঘর পরিষ্কার করে আর সবার কাপড় ধুয়ে। খুবই দু:খজনক বিষয়, কারন তার ক্লাসে সেই সবচেয়ে ছিল মেধাবী। আরো বেশী কিছু হবার ইচ্ছা ছিল তেরেজার, কিন্তু সেই ছোট্ট শহরে তার জন্য এর চেয়ে বেশী কিছু ছিল না। যখনই সে কাপড় ধুতে যেত,  টাবের পাশে একটি বই রাখতো সে, যখন সে পাতা উল্টাতো, কাপড় ধোয়ার পানি উপচে পড়ে প্রায়ই সেই বই ভিজিয়ে দিত।

তেরেজাদের বাসায়, লজ্জা বলে এমন কিছুরই অস্তিত্ব ছিলনা। ছোট ফ্ল্যাটে তার মা অর্ন্তবাস পরেই হাটা চলা করতো, কখনো ব্রা ছাড়া, কিংবা কখনো খু্ব গরমের দিনে,পুরো নগ্ন হয়ে। তার সৎ বাবা অবশ্যই নগ্ন হয়ে ঘুরতো না, কিন্তু যখনই তেরেজা গোছল করতে ঢুকতো, সেও প্রতিবার বাথরুমে ঢুকত। একবার তেরেজা বাথরুমের দরজা লাগিয়ে গোছল করেছিল শুধু এবং তার মা খুবই রেগে যায়, ‘তুমি নিজে কি মনে করছো, শুনি? মনে করেছো তোমার সৌন্দর্য সে কামড় দিয়ে খেয়ে নেবে?’

( এই বাদানুবাদ স্পষ্টতই প্রমান করে মেয়ের প্রতি তার ঘৃনা আসলে তার স্বামীর প্রতি সন্দেহ থেকে অনেক বেশী। তার কন্যার অপরাধ অসীম এবং সেটা তার স্বামীর অবিশ্বস্ততাও তার অংশ। তেরেজা নিজেকে মুক্ত করার ইচ্ছা, তার অধিকারের প্রতি জোর দাবী – যেমন গোছল করার সময় দরজা বন্ধ করার অধিকার – তেরেজার মার কাছে বেশী  অসহ্য ছিল, এমনকি তার স্বামীর তেরেজার প্রতি দুর্গন্ধময় পঙ্কিল কোন নজর দেবার সম্ভাবনার চেয়েও বেশী)।

একবার তেরেজার মা, শীতকালে, ঘরে যখন আলো জ্বলছে, তখন নগ্ন হয়ে  থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তেরেজা দৌড়ে গিয়ে খুব দ্রুত সব জানালার সব পর্দা টেনে দেয়, যেন রাস্তা থেকে কেউ কিছু না দেখতে পারে। এ কাজ করার সময়ই সে তার মা’র অট্টহাসি শুনতে পায়। পরের দিন যখনতার মার কয়েকজন বন্ধু বেড়াতে এসেছিল:একজন প্রতিবেশী, একজন মহিলা যার সাথে তার মা কাজ করে, একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষিকা, এছাড়া আরো দু তিন জন মহিলা,যারা প্রায়ই একসাথে জড়ো হতো। তেরেজা এবং তাদের কোন একজনের ষোল বছরের ছেলে কোন একটা পর্যায়ে সেই ঘরে ঢুকেছিল তাদের সম্ভাষন জানাতে;আর তার মা বন্ধুদের উপস্থিতিতে  সাথেই ‍সাথেই সুযোগ নেয় বর্ণনা করতে কেমন করে তেরেজা তার সম্ভ্রম রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল সেদিন; তার মা হাসছিল, এবং অন্য মহিলারাও তার সেই হাসিতে যোগ দেয়।  তার মা অভিযোগ করে বলে,তেরেজা কিছুতেই মানতে পারেনা,যে মানুষের শরীর প্রস্রাব করে, বায়ু ত্যাগ করে। লজ্জায় লাল হয়ে যায় তেরেজা, কিন্তু তার মা থামে না,’এতে এত লজ্জা পাবার কি আছে’?  নিজের করা এই প্রশ্নের উত্তরেই  যেন তার মা শব্দ করে বায়ুত্যাগ করে। সব মহিলারা আবারো একসাথে হেসে উঠে।

তেরেজার মা বেশ শব্দ করেই তার নাক পরিষ্কার করে, তার নিজের যৌন জীবন নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলে, এবং সে তার বাধানো দাত খুলে সবাইকে দেখাতেও  দারুন পছন্দ করে এবং জিভ দিয়ে সেই বাধানো দাতগুলো আলগা করার ব্যাপারে তার ছিল দারুন দক্ষতা।  এবং সাধারনত হাসির মাঝখানে সে উপরের দাতের পাটিটিকে নিচের পাটির সাথে এমন ভাবে ফেলে রাখতো,  যে তার চেহারায় ফুটে উঠতো ভয়ঙ্কর একটি অভিব্যক্তি।

তেরেজার মায়ের এই আচরণগুলো মুলত তার  নিজস্ব মতামতের একটি বিশাল  প্রকাশ কিংবা ইঙ্গিত; তা হলো সৌন্দর্য আর যৌবনকে পরিত্যাগ করার ঘোষনা। কোন এক সময় যখন নয়জন প্রেমিক তার চারপাশে ঘিরে নতজানু হয়ে প্রেম ভিক্ষা করতো, তখন সে তার নগ্নতাকে আতঙ্কের সাথেই পাহারা দিত, যেন সে তার দেহের মুল্যকে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে এর প্রতি প্রদর্শিত তার নম্রতা বা লজ্জার মানদন্ডে। এখন ভদ্রতা বা লজ্জাবোধই সে শুধু হারিয়ে ফেলেনি, যেন চুড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘোষনা করেছে তাদের সাথে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সে নতুন এই নির্লজ্জতাকে ব্যবহার করে  তার জীবনে নতুন একটি বিচ্ছেদরেখা সে অংকন করেছে, এবং ঘোষনা করেছে যে যৌবন এবং সৌন্দর্য  আসলে মুল্যহীন, যাকে অতিমুল্যায়ন করা হয়।

আমার কাছে তেরেজাকে মনে হয়, তার মায়ের এই মানসিকতারই ধারাবাহিকতা, যার মাধ্যমে তার মা নিজের কোন এক সময়ের একজন সুন্দরী যুবতীর জীবনকে পরিত্যাগ করেছে,অনেক দুর অতীতেই ।

(এবং যদি তেরেজার কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ বা ইত্স্তত আচরণ চোখে পড়ে,তার অন্যান্য আচরনে যদি সহজ সৌন্দর্যর কোন অভাব থেকে থাকে, আমরা যেন অবশ্যই অবাক না হই। তার মায়ের বড়দাগের, উন্মত্ত ‍, আত্মবিনাশী আচরণ তেরেজার উপর অমোচনীয় একটি প্রভাবের চিহ্ন রেখে গেছে।)

তেরেজার  মার দাবী তার প্রতি ঘটা প্রতিটি অবিচারের  সুবিচার করা হোক। সে চেয়েছিল অপরাধী যেন শাস্তি পায়। সে কারনেই সে তার মেয়েকে তারই সাথে  তার নির্লজ্জতার জগতে থাকতে সে বাধ্য করেছিল, যেখানে যৌবন আর সৌন্দর্যর কোন অর্থই নেই, যেখানে পৃথিবী একই রকম দেখতে অগনিত শরীরের বিশাল কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ছাড়া আর কিছুই না, যেখানে আত্মারা অদৃশ্য।

এখন আমরা ভালো করে বুঝতে পারবো তেরেজার গোপন পাপের অর্থ আসলে কি, আয়নার দিকে তার দীর্ঘ দৃষ্টি বা দ্রুত চাহনীর কারন। আসলে এটি তার মার সাথে তার একটি যুদ্ধ। অন্য সব শরীর থেকে আলাদা অনন্য একটি শরীর হবার তীব্র কামনা; খুজে পাওয়ার চেষ্টা করা,যে তার চেহারা প্রতিফলিত করছে খুব গভীর থেকে উপরে উঠে আসা আত্মার উপস্থিতি । খুব সহজ  কিন্তু না সে কাজটি: তার আত্মা-তার বিষন্ন, নীরিহ, আত্মপ্রচার বিমুখ আত্মাটি – যে তার শরীরের অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে এবং নিজেকে প্রকাশ করতে যে লজ্জা পায়।

সুতরাং যেদিন  টমাসকে সে প্রথমবারের মত দেখছিল, রেষ্টুরেন্টের মদ্যপ লোকগুলোর মধ্য দিয়ে নিজেকে বাচিয়ে, বিয়ারের বোতলের ভারে ক্লান্ত শরীরে তার আত্মা আসলে ছিল তার পাকস্হলী বা অগ্নাশয় স্তরে। তারপর যখন টমাস তাকে ডাকে, সেই ডাকটি তার কাছে ছিল অনেক অর্থবহ, কারন এই ডাকটি এসেছে এমন কারো কাছ থেকে যে তার মাকে চেনে না বা এমন কোন মাতাল কাছ থেকেও না, যারা  প্রতিদিনই অশ্লীল মন্তব্য করে। টমাসের বহিরাগত পরিচয়টি তাকে সবার চেয়ে পৃথক অন্য একটি স্তরে নিয়ে যায়।

তেরেজার চোখে, আরো একটি বিষয়, টমাসকে তার পরিচিত সবার চেয়ে উপরের স্তরে নিয়ে গিয়েছিল: সেটির কারন হলো,টমাসের টেবিলে উপর একটা খোলা বই ছিল। এই রেস্টুরেন্টের ভিতর এর আগে কেউই কোনদিনও বই খোলেনি এর আগে। তেরেজার চোখে বই হচ্ছে গোপন একটি ভ্রাতৃত্ত্বের পরিচয় চিহ্ন। কারন তাকে ঘিরে থাকা বাস্তব সেই স্থুল ও অশ্লীল পৃথিবীর বিরুদ্ধে  তেরেজার একটাই অস্ত্র ছিল: মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরী থেকে ধার করা বই এবং বিশেষ করে উপন্যাস। যে কোন উপন্যাসই সে সাগ্রহে পড়তো,ফিল্ডিং থেকে টমাস মান। তারা তাকে শুধুমাত্র  স্বস্তিহীন অপুর্ন একটি জীবন থেকে কাল্পনিক একটি মুক্তির পথের সম্ভবনাই দেখায়নি,   স্পর্শ করা যায় এমন কোন বস্তু হিসাবেও তার কাছে বইয়ের অর্থ ছিল খানিকটা ভিন্ন: রাস্তায় বগলের নীচে বই নিয়ে হাটতে ভালোবাসতো তেরেজা। এক শতাব্দী আগে ফ্যাশনদুরস্ত কারো কাছে অভিজাত ছড়ির যেমন অবস্থান ছিল, তেরেজার কাছে বইও একই অর্থ বহন করতো। সবার কাছ থেকে যা আলাদা করতো তেরেজাকে।

(বইএর সাথে অতীতের ফ্যাশন দৃরস্ত কারো হাতের অভিজাত ছড়ির তুলনা করার পুরোপুরি সঠিক না। অতীতের  ফ্যাশনপ্রিয় কারো জন্য অভিজাত ছড়ি তাকে সবার থেকে আলাদা করা ছাড়াও তাকে আধুনিক বা ‍হাল ফ্যাশনের মানুষেও রুপান্তরিত করতো। বইও তেরেজাকে ভিন্ন করতো সবার চেয়ে, কিন্তু অতীতমুখী ফ্যাশনের চিহ্ন হিসাবে। অবশ্যই তার বয়স এতো অল্প ছিল যে, সে বুঝতেই পারেনি অন্যদের চোখে সে আসলে কত পুরোনো ফ্যাশনের একজন ছিল। তরুনরা, যারা কানের মধ্যে একটি ট্রানজিস্টর রেডিও চেপে ঘুরে বেড়াতো, তেরেজার কাছে  এসব খুবই ছেলেমানুষী মনে হত, তার কাছে কখনো মনে হয়নি তারা আসলে হাল ফ্যাশনের ধারাতেই আছে);

সুতরাং যে মানুষটা তাকে সেদিন তার টেবিলে খাবারে অর্ডার দিতে ডেকেছিল, সে ছিল একই সাথে আগান্তুক এবং গোপন ভ্রাতৃত্বের সংঘের একজন সদস্য। বেশ দয়ালু কন্ঠস্বরে টমাস তাকে ডেকেছিল এবং তেরেজা অনুভব করেছিল তার রক্তনালী এবং চামড়ার অদৃশ্য অগনিত ছিদ্র দিয়ে যেন তাড়াহুড়া করে দ্রুত বেরিয়ে আসছিল তার আত্মা এই আগান্তুকটিকে নিজেকে দেখানো জন্য।

(((((((((((((((চলবে))))))))))))))))))))))))))

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s