দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: দ্বিতীয় পর্ব, ৪ এবং ৫

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর
বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।  
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

তেরেজার তার মায়ের মতই হয়েছিল, এবং সেটা শুধুমাত্র দেখতেই না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে, তেরেজার সমস্ত জীবনটাই হয়তো ছিল তার মায়ের জীবনের একটি ধারাবাহিকতা মাত্র; বিলিয়ার্ড টেবিলে কোন একটি বলের গতিপথ যেমন শুধুমাত্র একটি খেলোয়াড়ের বাহুর সুনির্দিষ্ট অবস্থান পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা, অনেকটাই সেরকম।

কোথায় এবং কখন এটি শুরু হয়েছিল, যে গতিময়তা একসময় রুপান্তরিত হয় তেরেজার জীবনে?

হয়তো সেই সময়ে,যখন তেরেজার নানা, প্রাহার একজন ব্যবসায়ী,তার কন্যা, তেরেজার মার সৌন্দর্য নিয়ে একটু বেশী মাত্রায় প্রশংসা করতে শুরু করেছিলেন সবাইকে শোনানোর জন্য।তখন তার বয়স তিন অথবা চার, তার বাবা হয়তো বলতেন তাকে তার চেহারা রাফায়েল এর ম্যাডোনার মত। তেরেজার চার বছর বয়সী মা বিষয়টি কোনদিনও ভুলতে পারেনি।কৈশোরে স্কুলে তার ডেস্কে বসে সে শিক্ষকদের কোন কথাই শুনতো না; বরং সে ভাবতো কোন চিত্রকর্মের মত দেখতে তার চেহারা।

তারপর তার বিয়ের সময় এলো একসময়। তেরেজার মা’র পানীপ্রার্থী ছিলো মোট নয়জন।তারা সবাই তার চারপাশে নতজানু হয়ে তাকে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকতো, মাঝখানে রাজকুমারী মত দাড়িয়ে তেরেজার মা, সে জানতোনা এদের মধ্যে কাকে সে বেছে নেবে। একজন সবচেয়ে সুন্দর, অন্য একজন হয়তো সবচেয়ে বুদ্ধিমান, তৃতীয় একজন হয়তো ছিলো সবচেয়ে ধনী, চতুর্থ জন হয়তোবা সবচে ভালো খেলোয়াড়, পঞ্চম জন হয়তো সেরা কোন পরিবারে ছেলে,ষষ্ঠ জন ভালো আবৃত্তিকার, সপ্তম জন অনেক দেশ ঘুরে বেরিয়েছে, অষ্টম জন বেহালা বাজাতে জানে,নবম জন ছিলো সবচেয়ে পুরুষালী। কিন্তু তারা সবাই একভাবে তার জন্য নতজানু হয়ে অপেক্ষা করেছে,তাদের হাটুতে সবারই ঠিক একই জায়গায় চামড়া গিয়েছিল শক্ত হয়ে।

এবং অবশেষে নবম জনকে যে কারনে সে নির্বাচন করেছিল, তার কারন সে এদের সবার মধ্যে ছিল সবচেয়ে পুরুষালী, তা কিন্তু না, বরং যখন তেরেজার মা তাদের সঙ্গমের সময় কানে কানে বার বার বলেছিল, ’সাবধানে, খুব সাবধানে’, সে উদ্দেশ্যমুলকভাবেই অসাবধানী আচরণ করেছিল এবং অবশেষে যখন কোন চিকিৎসককে খুজে পাওয়া গেল না, যে কিনা গর্ভপাত করাতে রাজী আছে, তেরেজার মা তখন তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। সুতরাং তেরেজারও জন্ম হয়েছিল। অগনিত আত্মীয় স্বজন যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে তার বিছানার চারপাশে জড়ো হয়ে ঝুকে পড়ে তাকে দেখে আহলাদিত শিশুদের মত স্বরে কথা বলছিল; তেরেজার মার মনে কিন্তু  কোন আনন্দই ছিল না, তার স্বরে কোন আহলাদ ছিল না। তেরেজার মা শুধু বাকী আট জন সম্ভাব্য প্রার্থীর কথাই ভাবছিল, যাদের সবাই হয়তোবা তার নবম পছন্দের চেয়ে আরো বেশী উত্তম হতে পারতো।

তার মেয়ের মতই, তেরেজার মাও প্রায়ই আয়নার দিকে তাকাতো। একদিন এভাবে অকস্মাৎ তার চোখের নীচে চামড়ার কুচকানো ভাজ নজরে পড়ে তার এবং সিদ্ধান্ত নেন, তার এই বিয়ের কোন অর্থ নেই আসলে। এই সময়টাতে তেরেজার মার সাথে পরিচয় হয় একজন অপুরুষালী এক পুরুষ এর সাথে, যে  ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রতারনার দায়ে অভিযুক্ত হিসাবে প্রমানিত হয়েছে, এছাড়া দুটো ব্যর্থ বিবাহ তো আছেই। তখন তেরেজার মার ঘৃনার বিষয় ছিল হাটুতে চামড়া শক্ত হয়ে যাওয়া সেই সব প্রাক্তন পানিপ্রার্থীরা। তার তখন তীব্র আবেগময় বাসনা  একটাই, অন্যদের পরিবর্তে এবার না হয় নিজের নতজানু হওয়াই জরুরী। সে যথারীতি নতজানু হয় তার এই প্রতারক বন্ধুর কাছে এবং তার স্বামী এবং তেরেজাকে ফেলে সে তার সংসার ত্যাগ করে এই লোকটি হাত ধরে।

সব পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে পুরুষালী তার সেই পরিত্যক্ত স্বামী খু্বই মর্মাহত হন। তিনি  এতই মর্মাহত হন যে তার কাছে কোনকিছুরই অর্থ আর আগের মত ছিল না। সুতরাং কোনকিছুকে পরোয়া না করে, তার মনে যখনই যা আসতো তাই তিনি বলতে শুরু করেন। এবং কমিউনিষ্ট পুলিশরা, তার মন্তব্য করার দুঃসাহস দেখে বিস্মিত হয়ে প্রথামত তাকে গ্রেফতার করে, বিচার করা হয় এবং বেশ লম্বা সময়ের কারাদন্ডে তাকে দন্ডিতও করা হয়। কমিউনিষ্ট পুলিশ তার ফ্ল্যাটটি দখলে নেয় এবং শিশু তেরেজাকে তার মায়ের কাছে পাঠানো হয় থাকবার জন্য।

এই বিষন্নতম মানুষটি কারাগারে কিছুদিন থাকার পর হঠাৎ করেই মারা যান এবং তেরেজা ও তার মা এরপর একটি পাহাড়ী  ছোট শহরে সেই প্রতারক বন্ধুর সাথে বসবাস করা শুরু করেন। এই লোকটি একটা অফিসে চাকরী নেয় প্রথম, এবং তার মা জোগাড় করে একটি দোকানের চাকরী। তেরেজার মা আরো তিনটি সন্তান প্রসব করেন। তারপর আবার তেরেজার মা আয়নায় নিজেকে আবার লক্ষ্য করে দেখেছিলেন, তবে এবার তিনি আবিষ্কার করেন তিনি বৃদ্ধ এবং কুৎসিৎ।

তেরেজার মা যখন বুঝতে পারে, সব কিছুই তিনি হারিয়েছেন, তার নিজের সর্বনাশের জন্য দায়ী একজন দোষীকে খোজার প্রক্রিয়াটা শুরু করে সে। যে কেউই সেটা হতে পারে: তার প্রথম স্বামী, পুরুষালী তবে ভালোবাসা বঞ্চিত,যে তার ফিস ফিস করে বলা সাবধানবানী একদিন উপেক্ষা করেছিল; তার দ্বিতীয় স্বামী, অপুরুষালী এবং যথেষ্ট ভালোবাসায় সিক্ত, যে তাকে প্রাহা থেকে টেনে নিয়ে  এসেছে এই ছোট মফস্বল শহরে এবং তাকে একটি অবিচ্ছিন্ন স্থায়ী ঈর্ষার অবস্থার মধ্যে রেখেছে একটার পর একটা রমনী সাথে সম্পর্ক গড়ে যাবার মাধ্যমে। কিন্তু  এদের দুজনের বিরুদ্ধেই সে শক্তিহীন। যে একটি মাত্র মানুষ সম্পুর্ণ তার এবং যার কোন পালাবার উপায়ই নেই, তার যে বন্দী এই অপরাধীদের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবে, সে ছিল তার তেরেজা।

আসলেই, তেরেজাই কি মুল দোষী ছিল না তার মায়ের নিয়তি নির্ধারনের জন্য? তেরেজা , যে কিনা খুব সুন্দরী এক নারীর ডিম্বানু আর খুব পুরুষালী এক পুরুষের শুক্রাণুর এক অর্থহীন মিলন? হ্যা, নিয়তি নির্ধারক সেই সেকেন্ডটিতে, যার নাম দেয়া হয়েছিল তেরেজা, তার মার জীবনে নষ্ট হয়ে যাওয়া দুরপাল্লার দৌড়টি শুরু হয়েছিল।

তেরেজা’র মা কখনোই ভুলে যায়নি তার মেয়েকে মনে করিয়ে দিতে যে, মা হওয়া মানে সব কিছুকেই বিসর্জন দেয়া। তার কথায় সত্যতার একটা হালকা গন্ধ ছিল, যার ভিত্তি ছিল এক রমনীর অভিজ্ঞতা যে সবকিছু হারিয়েছিল তার সন্তানের জন্য। তেরেজা শুনতো এবং বিশ্বাস করতো, মা হওয়াটা জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান কিছুকে অর্জন করা এবং মা হওয়ার অর্থ একটি মহান আত্মত্যাগ। আর যদি কোন মা আত্মত্যাগেরই প্রতিভু হয়, তবে একজন  কন্যা হবে অপরাধবোধের, যার  সমাধান হবার কোন সম্ভাবনা নেই।

(((((চলবে))))))

One thought on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: দ্বিতীয় পর্ব, ৪ এবং ৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s