দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৪

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।  
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার

কিন্তু  এরপর একদিন  হাসপাতালে অস্ত্রোপোচার করার মধ্যবর্তী বিরতিতে, একজন নার্স টমাসকে টেলিফোন ধরার জন্য ডেকে নিয়ে আসে। রিসিভার থেকে আসা তেরেজার গলার আওয়াজ সে শুনতে পায়। তীব্র একটা আনন্দ অনুভব করে টমাস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সন্ধ্যায় তার কিছু ব্যস্ততা ছিল, এর পরদিন ছাড়া তার বাসায় তেরেজাকে আসতে আমন্ত্রন জানাতে পারেনি টমাস। কিন্তু টেলিফোন ছাড়ার পরপরই, নিজেকে গালমন্দ করলো টমাস, তেরেজাকে সরাসরি তার বাসায় যাওয়ার কথা না বলবার জন্য। তার সন্ধ্যার পরিকল্পনাটা তো বাতিল করার জন্য যথেষ্ট সময় তো তার হাতে ছিল!  কল্পনা করার চেষ্টা করলো প্রাহাতে তেরেজা তার সাথে দেখা হবার আগের এই ছত্রিশ ঘন্টায় একা একা কি করেতে পারে এবং  প্রায় অর্ধেক মনস্থির করেই ফেলেছিল, এই মাত্র গাড়ীতে উঠে সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে তেরেজাকে খুজতে বের হবে।

পরের সন্ধ্যায় তেরেজা এলো, কাধ থেকে ঝোলানো একটা ব্যাগ নিয়ে, আগের চেয়েও আরো অনেক বেশী সুন্দর। তার বাহুর নীচে বেশ মোটা একটা বই, বইটা  ছিল আনা কারেনিনা। বেশ ভালো মেজাজে ছিলো তেরেজা, বরং একটু যেন বেশী উল্লাসময় প্রগলভ এবং চেষ্টা ছিল টমাসকে বোঝাতে, সে হঠাৎ করে তার ‍সাথে দেখা করতে এসেছে, যেন ব্যপারটা ঘটেছে কোন একটা সুযোগের কারনেই। প্রাহাতে সে একটা কাজে এসেছিল হয়তো ( এ পর্যায়ে তার সেই কাজ সম্বন্ধে তেরেজা বক্তব্য খানিকটা অস্পষ্ট হয়ে যায়) কোন একটা কাজ খুজে পাবার আশায়।

পরে,  তারা যখন নগ্ন হয়ে পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে খানিকটা সময় কাটাচ্ছিল, টমাস তাকে জিজ্ঞাসা করে, সে  থাকার জন্য কোথায় উঠেছে। ততক্ষনে অনেক রাত হয়েছে এবং সে তাকে গাড়ী দিয়ে সেখানে নামিয়ে দেবার প্রস্তাব করে। বিব্রত, তেরেজা উত্তর দেয়, সে এখনও কোন হোটেল ঠিক করেনি এবং তার স্যুটকেসটি সে রেখে এসেছে স্টেশনে।

মাত্র দুই দিন আগেই, টমাস ভয় পেয়েছিল, যদি তেরেজাকে সে প্রাহাতে আসার জন্য আমন্ত্রন জানায়, তবে সে তাকে তার বাকী জীবনটাই নিবেদন করতে পারে। যখনই তেরেজা তাকে বলে, তার স্যুটকেস আছে স্টেশনে, তাৎক্ষনিকভাবে সে বুঝতে পারে, সেই স্যুটকেসটাই তেরেজার সারা জীবন ধারন করে আছে এবং সে স্টেশনে এটি রেখে এসেছে শুধুমাত্র ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত না সে তার জীবনটা তাকে নিবেদন করতে পারে।

বাসার সামনে পার্ক করে রাখা টমাসের গাড়ীতে তারা দুজন এসে ওঠে এবং স্টেশনের দিকে রওনা দেয়। সেখানে গিয়ে রক্ষিত স্যুটকেসটি দাবী করে সে ( আকারে বিশাল এবং অত্যন্ত ভারী) এবং স্যুটকেশ আর তেরেজা দুজনকেই নিয়ে আসে তার ফ্ল্যাটে।

কেমন করে সে এত দ্রুত হঠাৎ এই সিদ্ধান্তে সে আসতে পারলো যখন এক পক্ষ ধরে এত বেশী দ্বিধান্তিত ছিল যে, এমন কি তেরেজা কেমন আছে সেটা জানতে চেয়ে একটা পোষ্ট কার্ড পর্যন্ত পাঠাতেও সে নিজেকে রাজী করতে পারেনি?

বিস্মিত সে নিজেও হয়েছিল। তার মেনে চলা মুল নীতিগুলোর বিরুদ্ধে সে কাজটি করেছে। দশ বছর আগে যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল, সেই ঘটনাকে, অন্যরা যেভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানকে উদযাপন করে, ঠিক সেভাবে উদযাপন করেছিল টমাস। সে বুঝতে পেরেছিল, কোন নারীর পাশাপাশি বসবাস করার জন্য তার জন্ম হয়নি। একমাত্র একজন ব্যাচেলরের জীবনেই সে তার নিজের পুর্নতা পাবে। সে তার জীবনটা এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছিল যেন কোন নারী স্যুটকেস নিয়ে সেখানে ঢুকতে না পারে। এ কারনেই তার ফ্ল্যাটে একটা মাত্র বিছানা। যদিও সেটা যথেষ্ট প্রশস্ত, টমাস তার প্রেমিকাদের বলতো কারো পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে সে ঘুমাতে পারেনা এবং সাধারনত: মধ্যরাতের পর সে তাদের বাড়ী পৌছে দিয়ে আসতো। সুতরাং তার বাসায় তেরেজার প্রথম বেড়াতে আসার সময় তার পাশে টমাসের না শোবার কারন শুধুমাত্র ফ্লুই ছিলনা । সেবার প্রথম রাত সে কাটিয়েছিল তার বড় আর্মচেয়ারে, আর সপ্তাহের বাকী দিনগুলো সে গাড়ী চালিয়ে ফেরত গেছে হাসপাতালে, সেখানে তার অফিসে একটা অস্থায়ী বিছানা আছে ।

কিন্তু এবার  তেরেজার পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছিল টমাস। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সে তার পাশে তেরেজাকে দেখে, তার হাত ধরে তখনও সে ঘুমিয়ে। তারা কি সারা রাত হাতে হাত ধরে কাটিয়েছিল? তার জন্য এটা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন।

এবং ঘুমের মধ্যে তেরেজা  যখন গভীর ভাবে ঘুমের শ্বাস নিচ্ছিল তার হাতে ধরা ছিল টমাসের হাত (বেশ শক্ত করে ধরা: তেরেজার শক্ত করে আকড়ে ধরে রাখা হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়াতে পারছিল না টমাস), বিশাল আকারের স্যুটকেসটা দাড়িয়ে ছিল বিছানার পাশে।

ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবার ভয়ে তেরেজার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকে সে এবং খুব সাবধানে পাশ ফিরে শোয় তেরেজাকে একটু ভালো করে দেখার জন্য। আবারও তার কাছে মনে হলো তেরেজা যেন একটা শিশু, যাকে আলকাতরা লেপা বুলরাশের ঝুড়িতে শুইয়ে দিয়ে কেউ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। সে নিশ্চয়ই শিশু সহ এই ঝুড়িটি উত্তাল নদীতে ভেসে যেতে দিতে পারেনা! ফারাও কন্যা যদি মোজেসকে নিয়ে ভেসে যাওয়া ঝুড়িটা ঢেউ থেকে ছিনিয়ে না নিত, কোন ওল্ড টেস্টামেন্টও লেখা হতো না, এখন সভ্যতা বলতে আমরা যা জানি সেটারও অস্তিত্ব থাকতো না। কত প্রাচীন পুরাণ কাহিনীর শুরু হয়েছে পরিত্যক্ত শিশুকে রক্ষা করার মধ্য দিয়ে। পলিবাস যদি শিশু ইডিপাসকে না প্রতিপালন করতো, সফোক্লিস কি তার সবচেয়ে সুন্দরতম  ট্রাজেডীটি লিখতে পারতেন!

টমাস সেই সময় অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কখনো কখনো রুপক গুলো খুবই ভয়ঙ্কর হতে পারে। রুপকগুলোকে হালকা ভাবে নেয়া ঠিক না। একটি মাত্র রুপকই কিন্তু পারে ভালোবাসার জন্ম দিতে।

One thought on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৪

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s