দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৯

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা 
ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

ল্যাটিন থেকে উৎপত্তি হয়েছে এমন সব ভাষাগুলো, ‘সমবেদনা’ বা  ‘compassion’ শব্দটি তৈরী করেছে একটি প্রিফিক্স বা উপসর্গ, যার অর্থ ‘এক সাথে’ বা ‘সহ বা সম’ (com-) এবং একটি রুট বা মুল শব্দ যার অর্থ ‘কষ্ট বা বেদনা’ ( ল্যাটিন, passio)  সংযুক্ত করে; কিন্তু অন্য ভাষাগুলোয়-যেমন, চেক,পোলিশ, জার্মান এবং সুইডিশ –এই শব্দটি বোঝাতে একটি বিশেষ্য পদ ব্যবহার করা হয়েছে, যা তৈরী হয়েছে, প্রায় একটি সমার্থক (ল্যাটিন উপজাত ভাষার মত) উপসর্গ এবং অপর একটি শব্দ যার অর্থ  ’‘অনুভুতি’ ( চেক, Sou-cit; পোলিশ, współ-czucie, জার্মান  Mit-gefül; সুইডিশ, med-känsla)।

ল্যাটিন থেকে উদ্ভুত ভাষাগুলোয় ’কমপ্যাশন’ এর অর্থ: অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছে এমন ব্যাপারটি আমরা শীতলভাবে শুধু দেখে যেতে পারিনা; বা যারা কষ্ট পাচ্ছে, আমরা তাদের সমব্যথী হই; আরেকটি শব্দ যার প্রায় একই রকম অর্থ, তাহলো ‘পিটি (pity) বা করুনা’ ( ফরাসী pitié; ‍ইতালীয়, pietà; ইত্যাদি), যা কোন কষ্ট্য সহ্যকারীর প্রতি এক ধরনের অবনমন প্রক্রিয়া কাজ করে, যেমন:‘এই মহিলার প্রতি করুনা করুন, এর অর্থ, আমরা তার চেয়ে অনেক ভালো আছি, আমাদের তার পর্যায়ে  আসতে হবে, বা নিচে নামিয়ে ফেলতে হবে আমাদের’।

সে কারনেই ’কমপ্যাশন’ শব্দটি প্রায়ই সন্দেহের উদ্রেক করে। এমন একটা অনুভুতিকে এটি নির্দিষ্ট করে দেয়, যা মনে করা হয়  অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের এবং দ্বিতীয় শ্রেনীর, ভালোবাসার সাথে যার সংশ্লিষ্টতা খুবই সামান্য। কাউকে সমব্যাথী হয়ে বা সমবেদনার ( অর্থাৎ কমপ্যাশন) কারনে ভালোবাসার অর্থ আসলে, ভালো না বাসা।

যে ভাষাগুলোয় ‘’কমপ্যাশন’ শব্দটি তৈরী করেছে মুল শব্দ ’কষ্ট বা সাফারিং’ থেকে নয়, বরং মুল ’ফিলিং বা অনুভুতি’ থেকে, সেই শব্দগুলোও প্রায় একই রকমভাবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে, এই শব্দগুলো  যে একটি খারাপ বা নিম্নমানের ভাবাবেগকে চিহ্নিত করছে, সেটা নিয়ে তর্ক করাটা বেশ কঠিন । শব্দটির উৎপত্তি সংক্রান্ত অর্থটির গোপন শক্তি, শব্দগুলোকে অন্যে এক অর্থের আলোয় উদ্ভাসিত করে এবং এর অর্থকে দেয় বিশালতা: কারো প্রতি ‘’সমবেদনা বা কমপ্যাশন’ (সহ অনুভুতি) অর্থ শুধু আরেকজনের দুর্ভাগ্যর সাথে বসবাস করাই না বরং তার সাথে একাত্ম হয়ে তার যে কোন অনুভুতিকে সমান ভাবে অনুভব করা  -আনন্দ,দুশ্চিন্তা, সুখ, যন্ত্রনা। এই ধরনের ’কমপ্যাশন’ (Soucit; współczucie, Mitgefül; med-känsla অর্থে) সেকারনে ইঙ্গিত দেয়, অনুভুতি ও সহানুভুতির সর্ব্বোচ্চ কল্পনাক্ষমতার ও আবেগীয় এক টেলিপ্যাথীর বা দুর অনুধাবনের। ভাবাবেগের প্রাধান্যপরম্পরার স্তরবিন্যাসে, তাহলে, এর অবস্থান সবার শীর্ষে।

টমাসের কাছে তার নোখের নীচে সুচ ফোটানোর স্বপ্নের বিবরণ দিয়ে, তেরেজা, নিজের অনিচ্ছাতেই প্রকাশ করে ফেলেছিল, সে তার টেবিলের ড্রয়ারের জিনিসপত্র ঘেটেছে। যদি তেরেজা না হয়ে অন্য কোন নারী হত যে এই কাজটি করেছে, টমাস তার সাথে আর কখনোই কথা বলতো না, সেটা জেনেই তেরেজা, তাকে বলে, ‘আমাকে তাহলে বের করে দাও!’; কিন্তু টমাস তাকে বের করে দেবার বদলে, তার হাত ধরে, আঙ্গুলের মাথায় চুমু খায়, কারন সেই মুহুর্তে টমাস নিজেও তেরেজার নোখের নীচের সেই কষ্ট অনুভব করেছিল সুস্পষ্টভাবে, যেন তেরেজার আঙ্গুলের স্নায়ুগুলো সরাসরি তার নিজের মস্তিষ্কে প্রবাহিত করেছে সেই অনুভুতিটাকে।

যে কোন মানুষ,যে শয়তানের এই উপহার, ’সমবেদনা বা কমপ্যশন’ (সহানুভুতি বা কো-ফিলিং) এর সুবিধা আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা তেরেজাকে তার কাজের জন্য শীতলভাবেই দোষী সাব্যস্ত করতে কোন দ্বিধা করবেনা, কারন ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা অত্যন্ত পবিত্র একটা জিনিস, এবং টেবিলের ড্রয়ার, যেখানে অন্তরঙ্গ চিঠিপত্র থাকে তা কখনোই খোলা উচিৎ না। কিন্তু টমাসের নিয়তি ( বা অভিশাপ) যেহেতু ‘কমপ্যাশন বা সমবেদনা‘, সে অনুভব করেছিল, যেন সে নিজেই টেবিলের এর খোলা ড্রয়ারের সামনে হাটু গেঢ়ে দাড়িয়ে আছে, সাবিনার লেখা চিঠিগুলো থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। সে  তেরেজাকে বুঝতে পেরেছিল,  তার উপর রাগ করে থাকতে, টমাস শুধু অক্ষমই না, সে তাকে আরো বেশী ভালোবেসেছিল।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s