দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৭

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা 
ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

রাতের মাঝামাঝি কোন এক সময়, তেরেজা হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে যন্ত্রনায় গোঙ্গাতে শুরু করে। টমাস তার ঘুম ভাঙ্গায়,কিন্তু যখনই সে চোখ খুলে টমাসকে দেখে,ঘৃণার সাথেই বলে ওঠে,’আমার কাছ থেকে তুমি সরে যাও! আমার কাছ থেকে তুমি সরে যাও’!এরপর তেরেজা তার দেখা দুস্বপ্নটি তাকে বর্ণনা করে:  তারা দুজন এবং সাবিনা বিশাল একটা ঘরের মধ্যে একসাথে,ঘরটির মাঝখানে একটি বিছানা,অনেকটা নাট্য মঞ্চের প্ল্যাটফর্মের মত। যখন টমাস সেখানে সাবিনার সাথে সঙ্গমে ব্যস্ত হয়, সে তেরেজাকে নির্দেশ দেয় এক কোনায় দাড়িয়ে থাকতে; এই দৃশ্যটি তেরেজাকে অসহ্য কষ্ট দিতে থাকে। হৃদয়ের এই যন্ত্রনাটাকে শরীরের যন্ত্রনা দিয়ে লাঘব করার আশায়,তেরেজা তার আঙ্গুলের নোখগুলোর নীচে সুঁই দিয়ে খোঁচাতে থাকে। হাতগুলো শক্ত করে মুঠো বানিয়ে তেরেজা  বলে ‘এত বেশী যন্ত্রনা হচ্ছিল’,যেন সত্যি আঙ্গুলগুলো সুইঁ এর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে।

নিজের বুকের মধ্যে টমাস টেনে নেয় তেরেজাকে এবং ধীরে ধীরে ( বেশ অনেকক্ষন ধরে বেশ তীব্র ভাবে তেরেজা কাঁপছিল) টমাসের আলিঙ্গনে ঘুমিয়ে পড়ে একসময় তেরেজা।

পরের দিন, স্বপ্নটির কথা ভাবার সময় টমাসের একটা বিষয় মনে পড়ে। সে তার ডেস্কের একটি ড্রয়ার খুলে তাকে লেখা সাবিনার চিঠির একটি প্যাকেট বের করে আনে। বেশী সময় লাগলো না তার এই অনুচ্ছেদটি খুজে পেতে: তোমার সাথে আমি আমার স্টুডিওতে সঙ্গম করতে চাই,এটা হবে চারপাশে মানুষ দিয়ে ঘেরা মঞ্চের মত করে। দর্শকদের কারোরই কাছে আসার অনুমতি নেই,কিন্তু তারা আমাদের দিক থেকে চোখ সরাতেও পারবে না…..।

সবচেয়ে খারাপ বিষয়টি টমাসের মনে হলো,চিঠিটিতে তারিখ ছিল,বেশ সাম্প্রতিক একটি চিঠি,টমাসের সাথে তেরেজার সাথে থাকা শুরু হবার বেশ পরেই লেখা।

’তাহলে তুমি আমার চিঠিপত্র ঘাটাঘাটি করেছো!’

তেরেজা অস্বীকার করে না,‘আমাকে বের করে দাও,তাহলে!

কিন্তু, না, তেরেজাকে সে বের করে দেয়নি।  সাবিনার স্টুডিওর দেয়ালে পিঠ চেপে দাড়ানো তেরেজা তার নোখের নীচে সুঁই ঢোকাচ্ছে, এমন দৃশ্যটা কল্পনা করতে পেরেছিল টমাস। তেরেজার আঙ্গুলগুলো সে নিজের হাতের মধ্যে নিয়েছিল, আদর করেছিল হাত দিয়ে, ঠোটে ছুইয়ে চুমু খেয়েছিল, যেন এখনো সেখানে রক্ত লেগে আছে।

কিন্তু এরপর থেকেই প্রায় সবকিছু যেন টমাসের বিরুদ্ধে যেন ষড়যন্ত্র মেতে উঠলো। তার গোপন জীবন সম্বন্ধে তেরেজার নতুন কিছু না জানতে পারা ছাড়া, এমন কোন দিন অতিবাহিত হয়নি এরপর।

প্রথম প্রথশ টমাস সবই অস্বীকার করেছে, এরপর যখন খুব অনায়াসে চোখে পড়ার মত প্রমান খুজে পাওয়া যায়, টমাসও যুক্তি দেয় এবং দাবী করে, তার জীবনের বহুগামীতা অন্ততপক্ষে তেরেজার জন্য তার ভালোবাসায় কোন অন্তরায় সৃষ্টি করছে না। কিন্তু টমাসের আচরন পরস্পরবিরোধী: প্রথমে সে তার বিশ্বাসভঙ্গতাগুলোকে অস্বীকার করে, তারপর সে চেষ্টা করে সেই কাজগুলোর নায্যতা প্রতিপাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি দিতে।

টমাস একবার যখন টেলিফোনে কারো সাথে দেখার করার তারিখ ঠিক করে বিদায় জানাচ্ছিল, তখনই পাশের ঘর থেকে একটা দাঁতে দাঁত লাগার মত অদ্ভুত আওয়াজ সে শুনতে পায়।

ঘটনাক্রমে, সেদিন তার অজান্তেই তেরেজা বাসায় ফিরে এসেছিল। ঔষধের বোতল থেকে কোন কিছু গলায় ঢালার সময় তেরেজা, এসময় তার হাত এক বাজে ভাবে কাপছিল, যে কাচের বোতল তার দাতের সাথে বাড়ি খায় স্বশব্দে।

টমাস তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে, যেন তেরেজাকে সে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বোতলটি ছিটকে পড়ে মেঝেতে, তার কার্পেটে একটা দাগ তৈরী করে ভ্যালেরিয়ান ড্রপস [১০]; তেরেজাও টমাসের হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্য বেশ ভালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তেরেজার দুই হাতের কব্জি ধরে, পেছন থেকে শক্ত করে ধরে থাকতে হয় টমাসকে প্রায় সিকি ঘন্টাকাল, তাকে শান্ত করতে।

টমাস জানতো, সে একটা অযৌক্তিক অবস্থানে আছে, কারন সম্পুর্ন অসমতায় যার ভিত্তি।

একদিন সন্ধ্যায়, সাবিনার সাথে তার চিঠিপত্র তেরেজার আবিষ্কারের আগে, তেরেজার নতুন চাকরীর সুখবর উদযাপন উপলক্ষ্যে কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে তারা একটি বার এ গিয়েছিল। সেই সাপ্তাহিকীতে তেরেজার পদোন্নতি হয়েছে,ডার্ক রুম টেকটিশিয়ান থেকেসে এখন স্টাফ ফটোগ্রাফার। যেহেতু টমাস নাচার ব্যাপারে কোন আগ্রহ ছিল না, তার একজন অপেক্ষাকৃত তরুন সহকর্মী তেরেজার সাথে তার সেই দ্বায়িত্বটা পালন করেছিল সেদিন। নাচের ফ্লোরে তাদের যুগলকে চমৎকার লাগছিল এবং টমাসের মনে হয়েছিল, তেরেজাকে এর চেয়ে সুন্দর  সে আগে কোনদিনও দেখেনি। সে অবাক হয়ে দেখছিল, তেরেজা কত অনায়াসে, তাৎক্ষনিকভাবেই নির্ভুল সুক্ষতার আর আনুগত্যের সাথে তার নাচের সঙ্গীর ইচ্ছাকে অনুসরণ করতে পারছিল। নাচটাকে টমাসের মনে হচ্ছিল যেন তেরেজার নিজেকে পুর্ণ নিবেদনের একটা ঘোষনা, তার নাচের সঙ্গীর সামান্যতম ইচ্ছা পুরন করার জন্য তার গভীরতম কামনা; যা এই সঙ্গী পুরুষটির সাথে তার সম্পর্কের কোন বাধ্যবাধকতায় আরোপিত না; যদি টমাসের সাথে তেরেজার পরিচয় না হত, তেরেজা তার সাথে দেখা হওয়া যে কোন পুরুষের আহবানে সাড়া দেবার জন্য হয়ত তৈরী থাকতো। টমাসের কোন কষ্টই হলোনা, তার তরুন সহকর্মী আর তেরেজাকে প্রেমিক প্রেমিকা হিসাবে কল্পনা করতে। এবং এত অনায়াসে সেই কাহিনী সে কল্পনা করতে পেরেছিল দেখে, বেশ  আহতবোধ করলো টমাস। সে বুঝতে পারে, তেরেজার শরীর যে কোন পুরুষ শরীরের সাথে সঙ্গমরত ভাবাটা খুবই সহজ, এবং এই চিন্তাটি তার মেজাজটাকে নষ্ট করে ফেলে অবোধ্য অস্থিরতায়। সেদিন অনেক গভীর রাত না হওয়া পর্যন্ত, বাসায়, তেরেজার কাছে টমাস স্বীকার করেনি, তার ঈর্ষান্বিত হবার কথাটি।

শুধু কিছু কাল্পনিক হাইপোথিসিসের উপর ভর করা, এই অর্থহীন ঈর্ষা, প্রমান করে, তেরেজার বিশ্বস্ততাকে সে তাদের সম্পর্কের একটি নি:শর্ত সত্য হিসাবে আসলে সে ধরে নিয়েছে। তাহলে কেমন করে সে তেরেজার প্রতি অসন্তুষ্ট হতে পারে, যখন তার খুবই বাস্তব, রক্ষিতা বা প্রেমিকাদের প্রতি প্রদর্শিত তেরেজার ঈর্ষার জন্য ?

(((((((((((((((((((((((((((((চলবে))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))

[১০] ভ্যালেরিয়ান ড্রপস: এক ধরনের ভেষজ ঘুমের  ঔষধ।

One thought on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৭

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s