দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৬

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা
ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

কাম বন্ধুত্বের অলিখিত চুক্তির শর্ত দাবী করছে যে টমাস তার জীবন থেকে সব ভালোবাসাকেই পরিত্যাগ করবে। যে মুহুর্তে সে চুক্তির এই শর্তটি লঙ্ঘন করছে, তার অন্য প্রেমিকারা অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরে নেমে আসে এবং  যে কোন সময় বিদ্রোহ করার জন্য একটি ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়।

সেকারনে, তেরেজা এবং তার ভারী সুটকেস এর জন্য টমাস একটি আলাদা ঘর ভাড়া করে। তেরেজাকে দেখাশোনা করা, তাকে রক্ষা করা, তার সঙ্গ উপভোগ করতে পারার ইচ্ছা পোষন করতো টমাস, কিন্তু সে কোন প্রয়োজন বোধ করেনি, তার আগের জীবনযাত্রা বদলে ফেলার জন্য। সে চাচ্ছিল না, কেউ জানতে পারুক যে, তেরেজা তার বাসায় রাত কাটাচ্ছে এবং তার সাথে ঘুমাচ্ছে। এক সাথে রাত কাটানো হচ্ছে ভালোবাসার করপাস ডেলিকটি [৯]।

টমাস কখনোই অন্যদের সাথে রাত কাটায়নি। ব্যপারটা খুব সহজ, যদি সে অন্য কারো বাসায় অবস্থান করে, সে যখনই চায়, তখনই সেখান থেকে বের হয়ে যেতে পারে। শুধু ব্যপারটায় ঝামেলা হয়, যখন অন্যরা তার বাসায় আসে এবং তাকে যথারীতি ব্যাখ্যা দিতে হয়; মধ্যরাত্রির পরে সে তাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবে কারন তার অনিদ্রারোগ আছে এবং আরেকজন মানুষের খুব কাছাকাছি শুয়ে আর পক্ষে ঘুমানো একেবারেই অসম্ভব। যদিও তার এই দাবী সত্যি থেকে খুব দুরে না, তারপরও সে তার অতিথিদের আসল এবং পুরো সত্যটা বলতে কখনো সাহস পায়নি: সঙ্গমের পরপরই সে তার নিজের নিয়ন্ত্রন ক্ষমতার বাইরে একধরনের তীব্র আকাঙ্খা বোধ করে একা থাকার জন্য; মধ্যরাতে  অচেনা কোন এক শরীরের পাশে ঘুম থেকে জাগা তার খুবই অপছন্দের একটি বিষয়; এবং সকালবেলায়  তার ফ্ল্যাটে একজন অনুপ্রবেশকারীর সাথে ঘুম থেকে ওঠা, তাকে আরো বেশী বিকর্ষন করে। বাথরুমে কেই তার দাত মাজার শব্দ শুনতে পাক সেটা সে কখনোই চায়না, এছাড়া সকালের অন্তরঙ্গ প্রাতরাশ ভাবনাও তাকে আদৌ আকর্ষন করে না।

সে কারনেই সে খুবই অবাক হয়, ঘুম ভেঙ্গে তেরেজাকে তার পাশে, তার হাত আকড়ে ধরে শুয়ে থাকতে দেখে। সে প্রায় পুরোপুরিই বুঝতে ব্যর্থ হয়, আসলে কি ঘটেছে। কিন্তু যখনই মনে মনে পেছনের কয়েক ঘন্টায় কি কি ঘটেছে, সেটা সে ভাবতে শুরু করলেই সে অনুভব করতে শুরু করে, এতদিন পর্যন্ত তার অজানা একটা সুখের আবেশ সেখান থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

সেই সময় থেকে তারা দুজনই একসাথে ঘুমানোর জন্য উন্মুখ হয়েই অপেক্ষা করতো। আমি এমন কি হয়তো বলতে পারবো, তাদের শারীরিক মিলনের উদ্দেশ্য যতটা না সুখ তারচেয়ে বরং সঙ্গম পরবর্তী যে ঘুম, সেটাই মুখ্য ছিল। প্রভাবটা অবশ্য বেশী পড়েছিল তেরেজার উপরেই। যখনই তেরেজা তার ভাড়া করা রুমে রাত কাটাতো ( যা খুব শীঘ্রই টমাসকে কাছে পাবার জন্য শুধুমাত্র একটা অজুহাতে পরিনত হয়েছিল), একা ঘুমানো তার জন্য ভীষন কঠিন হয়ে পড়তো; কিন্তু যখনই টমাসের কাছে খুব সহজেই ঘুমিয়ে পড়তো তেরেজা, যত অস্থিরই সে থাকুক না কেন। টমাস তাকে নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে রুপকথার গল্প বলতো, কিংবা শুধু আবোল তাবোল অর্থহীন কোন কথা, তার একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি করা শব্দ, কখনো হাস্যকর, কখনো তাকে সুস্থির করতো, সবকিছুই রুপান্তরিত হতো একটা অস্পষ্ট দৃশ্যে যা তেরেজাকে নিয়ে যেত ঘুমের জগতে, রাতের প্রথম স্বপ্ন দেখিয়ে। তেরেজার ঘুমের উপর এভাবে টমাসের পুর্ন নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে চাওয়া মাত্রই তেরেজাকে ঘুম পাড়াতে পারতো।

যখন তারা একসাথে ঘুমাতো, প্রথম রাতের মতই টমাসকে সে ধরে রাখতো শক্ত করে, কখনো কব্জি, আঙ্গুল বা গোড়ালী। যদি কখনো টমাস তেরেজাকে ঘুম না ভাঙ্গিয়ে উঠতে চাইতো, তাকে বদলি কোন কিছু ব্যবহার করতে হতো। যেহেতু সে টমাসকে এমনকি তার ঘুমের মধ্যে খুব সাবধানে পাহারা দিয়ে রাখতো, তেরেজার হাতের বাধুনী থেকে নিজের আঙ্গুল ছাড়িয়ে নেবার প্রক্রিয়ায় সবসময়ই সে তার ঘুম আংশিক ভাঙ্গিয়ে দিয়ে সফল হত আর তখন টমাস তাকে শান্ত করতো, তার হাতের ভিতর অন্য কিছু গুজে দিয়ে ( গোল করে পাকানো পায়জামার উপরে পড়ার কাপড়, স্লিপার কিংবা বই) যা তেরেজা এমন শক্ত করে ধরতো, যেন টমাসের শরীরেরই কোন অংশ, তারপর আবার ঘুমিয়ে যেত।

একবার, যখন সে কেবল তেরেজাকে ঘুম পাড়িয়েছে, কিন্তু তেরেজা কেবল স্বপ্নের প্রথম স্তরটির বেশী পার হয়নি, সুতরাং তখনও টমাসের গলার আওয়াজ সে শুনছিল, টমাস তাকে বলে, ’বিদায়, আমি এখন যাচ্ছি’; তেরেজা তাকে ঘুমের মধ্যেই জিজ্ঞাসা করে, ’কোথায়’? একটু রুঢ় স্বরে টমাস উত্তর দেয়, ’এখান থেকে দুরে’; তেরেজা বিছানার উপরে উঠে বলে, ’তাহলে আমিও তোমার সাথে যাবো’। ’না, তুমি আমার সাথে যেতে পারবেনা, আমি সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছ’ ‘’, টমাস বলে দরজা খুলে হলের মধ্যে বেরিয়ে আসতে আসতে। তেরেজা ঘুম চোখেই উঠে দাড়ায় এবং টমাসের পেছন পেছন হলে চলে আসে, ছোট রাত্রিবাসের নীচে পুরো নগ্ন তেরেজা। তার দৃষ্টি শুন্য, অভিব্যক্তিহীন, তবে বেশ ক্লান্তিহীনভাবে সে হেটে আসে টমাসের পিছু পিছু; ফ্ল্যাটের হল থেকে বেরিয়ে বিল্ডিং এর হলে আসে টমাস ( যে হলটি সবার জন্য উন্মুক্ত), তার মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে। কিন্তু ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে তেরেজাও বেরিয়ে আসে হলে তাকে অনুসরন করে, তার ঘুমের মধ্যেই সে যেন নিশ্চিৎ ভাবে বুঝতে পেরেছে, টমাস তাকে একেবারে ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং তাকে তার থামাতে হবে। সিড়ি দিয়ে নেমে প্রথম ল্যান্ডিং এসে অপেক্ষা করে টমাস, তেরেজার জন্য। তেরেজাও সেখানে নেমে আসে এবং টমাসের হাত ধরে তাকে আবার বিছানায় নিয়ে আসে।

টমাস এই উপসংহারে পৌছেছিল: কোন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হওয়া আর কোন নারীর সাথে ঘুমানো, দুটো আসলে পৃথক তীব্র আবেগীয় অনুভুতি, শুধু পৃথকই না, একেবারে বীপরিত। সঙ্গমের কামনার মধ্যে ভালোবাসা আসলে তার উপস্থিতিকে অনুভত করায় না ( যে কামনা অসংখ্য রমনীর প্রতি হতে পারে) বরং একসাথে ঘুমানোর কামনা মধ্যেই সে তার উপস্থিতিটা জানান দেয়( যে কামনা শুধুমাত্র একটি নারীর প্রতি সীমাবদ্ধ)।

((((((((((((চলবে)))))))))))))))))))))))))))))

______________________________________

[৯] করপাস ডেলিকটি: Corpus delicti (Latin: “body of crime”) is a term from Western jurisprudence referring to the principle that a crime must have been proven to have occurred before a person can be convicted of committing that crime.

Advertisements

2 thoughts on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৬

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s