দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৩

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।  
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার


ড্রইং : কাজী মাহবুব হাসান

অনেক বছর ধরেই আমি টমাসের কথা ভাবছিলাম। কিন্তু  তাকে বোধহয় আরো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, শুধুমাত্র এইসব ভাবনার আলোকেই। তার ফ্লাটের জানালার সামনে তাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম,  মাঝের কোর্ট ইয়ার্ডের অন্য পাশে বিপরীত দিকের দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল সে, বুঝতে পারছিল না কি করবে সে।

তিন সপ্তাহ আগে একটি ছোট চেক শহরে তেরেজার সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিল। এমন কি একঘন্টাও তারা এক সাথে কাটায়নি। তেরেজা স্টেশন পর্যন্ত এসেছিল, যতক্ষন না  টমাস ট্রেনে উঠে বসেছে, ততক্ষন অপেক্ষাও করেছিল তার সাথে। এর ঠিক দশ দিন পর তেরেজা দেখা করতে এসেছিল তার সাথে। তার পৌছানোর দিনেই তারা সঙ্গম করেছিল। আর সে রাতেই হঠাৎ করে খুব জ্বর হয় তেরেজার, পুরো এক সপ্তাহ টমাসের ফ্লাটে সে থেকেছে ফ্লু নিয়ে।

প্রায় সম্পুর্ন এই আগন্তুকটির প্রতি টমাস একসময় এক ধরনের অবর্ণনীয় ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করেছিল। তার কাছে শিশুর মত মনে হয়েছে তেরেজাকে; একজন শিশু যাকে কেউ আলকাতরা দিয়ে লেপা একটা বুলরাশের [৫] এর ঝুড়িতে শুইয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে, যেন টমাস তাকে নদীর পাড় থেকে খুজে  নিয়ে আসে তার বিছানায়।

টমাসের সাথে সে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিল সেবার, যতদিন পর্যন্ত না সে  সুস্থ বোধ করে। তারপর ফিরে গিয়েছিল তার শহরে; প্রাহা [৬] থেকে প্রায় একশ পচিশ মাইল দুরে। এবং তারপর আমি যে সময়ের কথা দিয়ে টমাসের গল্প শুরু করেছি কিছুক্ষন আগে, সেই সময়টা এসেছিল এবং যে সময়টাকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন মুহুর্ত হিসাবে আমি দেখি: জানালার সামনে দাড়িয়ে কোর্ট ইয়ার্ডের অপর প্রান্তে টমাস তার বিপরীত দিকে দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল আর গভীরভাবে ভাবছিল;

সে কি তেরেজাকে প্রাহাতে আবার ডেকে আনবে স্থায়ী ভাবে থাকার জন্য? কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার ব্যপারে সে শঙ্কিত বোধ করে। কারন যদি তাকে আসার জন্য সে আমন্ত্রন জানায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তেরেজা অবশ্যই আসবে তার কাছে এবং তাকে উৎসর্গ করবে তার জীবন।

অথবা তেরেজার প্রতি অগ্রসর হওয়া থেকে তার কি বিরত থাকা উচিৎ? সেক্ষেত্রে মফস্বল শহরে একটি হোটেলের রেস্টুরেন্টে সে চিরকালই একজন ওয়েট্রেস হয়েই রয়ে যাবে এবং তার সাথে আর কখনোই দেখা হবেনা।

সে কি চাচ্ছে, সে আসুক নাকি চাচ্ছে না?

কোর্ট ইয়ার্ডের অপরপ্রান্তের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা ‍উত্তর খুজছিল টমাস।

বার বার টমাসের মনে পড়ছিল তার বিছানায় তেরেজার শুয়ে থাকার দৃশ্যটা; তার অতীত জীবনের কারো কথাই তেরেজা মনে করিয়ে দেয়না। সে না রক্ষিতা না স্ত্রী। সে যেন একটা শিশু, আলকাতরা লেপা বুলরাশের ঝুড়িতে কেউ তাকে তার বিছানা নদীর তীরে পাঠিয়ে দিয়েছে। ঘুমিয়ে ছিল তেরেজা। পাশে হাটু গেড়ে বসেছিল টমাস। তার জ্বরের নিশ্বাস ধীরে ধীরে দ্রুত হচ্ছিল এবং একসময় সে গোঙ্গানীর মত দুর্বল একটি আওয়াজ করে ওঠে। টমাস তার গাল তেরেজার গালের সাথে চেপে ধরে,ঘুমের মধ্যে তাকে ফিস ফিস করে কথা বলে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষন পর সে টের পায় তেরেজার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। অচেতনভাবেই তার গাল টমাসের গালের সাথে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে সে,  জ্বরের সুক্ষ একটা গন্ধ অনুভব করেছিল টমাস, আরো বেশী করে নিঃশ্বাসের সাথে গন্ধটি বুকের মধ্যে টেনে নেয় সে, যেন তেরেজার শরীরের অন্তরঙ্গতা দিয়ে নিজেকে অতিরিক্ত পুর্ন করতে চেষ্টা করছে সে এবং একই সাথে সে কল্পনা করছে, তার সাথে তেরেজা যেন আছে বহু বছর ধরে এবং এখন সে মারা যাচ্ছে। সুস্পষ্ট ভাবে হঠাৎ করে তার অনুভুতি হয়েছিল , তেরেজার মৃত্যু হলে সে আর বেচে থেকে পারবে না। তার পাশে শুয়ে এবং তার সাথে মরে যেতে চাইছিল টমাস। তার মাথার পাশে বালিশে টমাস তার মুখ চেপে ধরে রেখেছিল অনেকক্ষন ধরে।

এখন জানালার সামনে দাড়িয়ে সেই মুহুর্তগুলোকে বোঝার চেষ্টা করছে সে। তার ভিতরে ভালোবাসার  ঘোষনা ছাড়া আর কিইবা হতে পারে সেই মুহুর্তের অনুভুতিগুলো?

কিন্তু এটা কি ভালোবাসা ছিল? তার পাশে শুয়ে মৃত্যুর বাসনাটা স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি: তেরেজাকে এর আগে সে দেখেছিল মাত্র একবার। এটা কি সেই পুরুষের উন্মত্ততা, যে তার অন্তর থেকেই জানে তার ভালো না বাসতে পারার অক্ষমতার কথা, অথচ সে অনুভব করেছে, এমন অনুভুতির প্ররোচনার জন্য কোন আত্মপ্রবঞ্চনীয় প্রয়োজনীয়তা। তার অবচেতন মন কি এতই ভীরু যে, এই কমেডির জন্য সে সঙ্গী হিসাবে পছন্দ করেছে দুর্ভাগা মফস্বল শহরের কোন ওয়েট্রেসকে,  যার বাস্তবিক অর্থে তার জীবনে প্রবেশ করার কোন সম্ভাবনাই নেই!

কোর্ট ইয়ার্ডের ওপাশে ময়লা দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে, সে বুঝতে পেরেছিল, তার কোন ধারনাই নেই এটা কি নিছক পাগলামী ছিল নাকি ভালোবাসা।

এবং টমাস খুবই অস্থির বোধ করছিল, এরকম কোন পরিস্থিতিতে যখন কোন প্রকৃত পুরুষ তাৎক্ষনিকভাবে বুঝতে পারতো তার কি করা উচিৎ, সেখানে সে ভুগছে এই অস্বস্তিকর দোটানায় এবং সেকারনে সে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম মুহুর্তগুলোর অনুভুতি থেকে নিজেকে যেন বঞ্চিত করছিল ( তেরেজার বিছানার পাশে হাটু গেড়ে বসে থাকা এবং ভাবা যে তেরেজার মৃত্যু হলে তার পক্ষেও বেচে থাকা সম্ভব না)।

নিজের উপর বিরক্তিটা রয়েই গেল যতক্ষন না পর্যন্ত অবশেষে সে বুঝতে পারে, সে কি চাচ্ছে সেটা না জানাটাই আসলে খুবই স্বাভাবিক।

আমরা কখনোই আসলে জানতে পারিনা, কি চাইবো বা কি চাইতে হবে, কারন, শুধু মাত্র একটি জীবন কাটিয়ে, আমরা যেমন না পারি আমাদের অতীতের জীবনের সাথে একে তুলনা করতে, তেমনি পারি না এই ‍চাওয়াকে আমাদের অনাগত জীবনগুলোতে শুধরিয়ে সঠিক করে নিতে।

তেরেজার সাথে থাকাটাই কি ভালো হবে নাকি একা থাকা ?

পরীক্ষা করার কোন উপায় নেই কোন সিদ্ধান্তটি আসলে অপেক্ষাকৃত ভালো, কারন তুলনা করার কোন মানদন্ডও নেই। জীবন যেভাবে আমাদের মুখোমুখি হচ্ছে আমরাও সেভাবেই বাঁচি, কোন সতর্কবানী ছাড়াই, হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া কোন অভিনেতার মত। এবং সেই জীবনের কি মুল্য হতে পারে যদি জীবনের জন্য প্রথম রিহার্সেলটাই আসল জীবন হয়ে থাকে? সেকারনেই জীবনটা সবসময় একটা রেখাচিত্রের মত। না, রেখাচিত্র শব্দটি ঠিক হলো না। কারন রেখাচিত্র হলো কোন কিছুর নকশা, কোন একটা ছবির মুল ভিত্তি, অন্যদিকে যে রেখাচিত্র আমাদের জীবন, সেটি আসলে কোনকিছুরই রেখাচিত্র নয়, কোন ছবি ছাড়া একটি নকশা মাত্র।

টমাস স্বগোতক্তি করে, আইনমল ইস্ত কাইনমল [৭], এই জার্মান প্রবাদবাক্যটি যা বলে তা হলো, শুধু মাত্র একবারের জন্য যা ঘটে, তা আসলে কোনদিনও একেবারে না ঘটবার মতই। যদি মাত্র একটি জীবন আমরা বাচার জন্য পাই, তাহলে হয়তো আমরা আসলে কোনদিনও বেচেই থাকিনি।

_______________________________

[৫] বুলরাশ: এক ধরনের ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ।
[৬] প্রাহা:  প্রাগ চেক প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শহর এবং রাজধানী। চেক ভাষায় উচ্চারন প্রাহা।
[৭] Einmal ist keinmal:  একটি জার্মান প্রবাদ, যার  ইংরেজী অর্থ Once is never।

2 thoughts on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ৩

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s