দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১ এবং ২

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।  
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার

চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের [১] ধারনাটা খুব রহস্যময়, আর নীচাহ [২]  প্রায়ই এটি দিয়ে অন্য দার্শনিকদের ধাধার মধ্যে ফেলে দিতেন: এমনটা ভাবা যে, আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে ঠিক যেমনটা আগেই ঘটেছিল আর এই পুনরাবৃত্তিরও পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে অনন্তকাল; আসলেই এমন একটি উন্মত্ত অলীক ধারনার  অর্থ কি হতে পারে?

নেতিবাচক ভাবে যদি ব্যাখ্যা করতে চাই, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের মিথ বলছে যে, কোন একটি জীবন যা চিরকালের মত হারিয়ে গেছে, যা কখনোই আর ফিরে আসবে না, সে জীবন আসল ছায়ার মত, নির্ভার, আগে থেকেই মৃত এবং হতে পারে সেই জীবন দুঃসহভাবে কুৎসিত, সুন্দর কিংবা মহৎ, এর ভয়াবহতা, মহত্ব এবং সৌন্দর্য সব কিছুই অর্থহীন। চতুর্দশ শতাব্দীর দুই আফ্রিকার রাজ্যের মধ্যকার যুদ্ধকে যেমন আমরা যতুটুকু গুরুত্ব দেই, যে যুদ্ধ পৃথিবীর নিয়তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করেনি, এমন কি সেখানে লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গর তীব্রতম নিপীড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হয়েও যদি থাকে, সেই জীবনকে আসলে আমাদের তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই।

চতুর্দশ শতাব্দীর দুটি আফ্রিকার রাজ্যর মধ্যে যুদ্ধটাই কি বদলে যাবে যদি  বার বার এর পুনরাবৃত্তি হয়, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনে?

পরিবর্তিত হবে সেটি: এটি পরিবর্তিত হবে কঠিন একটি বস্তুতে, চিরস্থায়ী ভাবে প্রস্ফীত, যার অসারতা অসংস্কারযোগ্য।

যদি ফরাসী বিপ্লবের চিরন্তনভাবে পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, ফরাসী ঐতিহাসিকরা রোবসপিয়েরকে [৩] নিয়ে খানিকটা কম গর্ব অনুভব করতেন। কিন্তু যেহেতু তারা এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না, বিপ্লবের সেই রক্তাক্ত বছর গুলো পরিণত হয়েছে শুধুমাত্র কতগুলো শব্দ, তত্ত্ব আর আলোচনায়, পালকের মত হালকা হয়ে গেছে, আর কারো মনেই  তা ভীতির উদ্রেক করেনা। একজন রোবসপিয়ের, যে ইতিহাসে মাত্র একবার আসে এবং  যে রোবসপিয়েরের যার চিরন্তন পুনরাগমন ঘটে  ফরাসীদের মাথা কাটার জন্য, তাদের মধ্যে পার্থক্য অসীম।

সেকারনে আসুন আমরা অন্ততঃ একমত হই, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের ধারনাটি আমাদের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গী দেয়, যেখান থেকে সাধারনত কোন কিছুকে আমরা যেভাবে চিনি, তার থেকে ভিন্ন অনুভুত হয়: তারা আবির্ভুত হয় তাদের ক্ষনস্থায়ী প্রকৃতির গুরুত্ব হ্রাস করিয়ে দেয়া কোন পরিস্থিতি ছাড়াই। এই গুরুত্ব হ্রাস করানো পরিস্থিতি কোন একটি মতামতে পৌছাতে আমাদের বাধা দেয়। কারন কিভাবে আমরা কোন কিছুকে দোষারোপ করবো, যা ক্ষনস্থায়ী, আসা যাওয়ার মধ্যে তার অবস্থান? অবসানের গোধুলীবেলায় অতীতবিধুরতার আলোয় উদ্ভাসিত হয় সবকিছু, এমনকি গিলোটিনও।

কিছু দিন আগে, আমার ভিতর একটি অবিশ্বাস্য অনুভুতির উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম, হিটলারে উপর একটি বই এর পাতা উল্টাতে গিয়ে, তার কিছু প্রতিকৃতি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল: সেগুলো শৈশবে কথা মনে করে দিয়েছিল আমাকে। যুদ্ধের সময়ই আমি বড় হয়েছি, আমার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও তাদের জীবন দিয়েছেন হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। কিন্তু আমার জীবনের হারানো সেই সময়ের সব স্মৃতি, যা আর কোনদিনও ফিরে আসবে না, তার তুলনায়, তাদের মৃত্যু আসলে কি?

হিটলারের সাথে এই পুনর্মিলন আসলে প্রকাশ করে, এই পৃথিবীর একটি গভীরতম নৈতিক বিকৃতি, যা নির্ভর করে প্রধানত পুনরাবৃত্তির অনস্তিত্বের উপর, কারন এই পৃথিবীতে সবকিছুই পুর্বেই ক্ষমাপ্রাপ্ত এবং সেকারনে সবকিছুই নৈরাশ্যজনকভাবেই অনুমতিপ্রাপ্ত।

যদি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের অসীম সংখ্যক বার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে অনন্ত কালের কাছে আমরা চিরবন্দী, যেমন পেরেক ঠুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল যীশু খৃষ্টকে। ভয়াবহ একটি ভবিষ্যত। চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের পৃথিবীতে দুঃসহ দায়িত্বের ভার আমাদের প্রত্যেকটি কাজের উপর ভর করে থাকে। একারনেরই নীচাহ চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের ধারনাটি চিহ্নিত করেছেন সবচেয়ে ভারী বোঝা হিসাবে।

যদি চিরন্তন প্রত্যাবর্তন আমাদের উপর সবচেয়ে ভারী বোঝাই হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জীবনগুলো এর বিপরীতে সুস্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত হতে পারে তাদের সব চমৎকার নির্ভারতা সহ।

কিন্তু  এই ভার কি আসলেই নিন্দনীয় আর নির্ভারতা চমকপ্রদ? সবচেয়ে ভারী বোঝা গুলো আমাদের ভেঙ্গে ফেলে, আমরা এর নীচে পতিত এবং পিষ্ট হই। আমাদের মাটির সাথে এটি চেপে ধরে রাখে। কিন্তু প্রতিটি যুগের ভালোবাসার কবিতায়, নারী পুরুষের শরীরের ভার তাদের উপর অনুভব করার তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ করে আসছে। সবচেয়ে ভারী বোঝা তাহলে একই সাথে জীবনের সবচেয়ে তীব্র পরিপুর্নতারও একটি দৃশ্য। বোঝা যত ভারী হবে, আমাদের জীবন ততই পৃথিবীর সন্নিকটে আসে, তত বেশী বাস্তব আর সত্যি হয়।

বীপরিতে, বোঝার চুড়ান্ত অনুপস্থিতি মানুষকে বাতাসের চেয়েও নির্ভার করে তোলে, অনেক উপরে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, পৃথিবী এবং পার্থিব অস্তিত্বকে পরিত্যাগ করে এবং রুপান্তরিত করে শুধু আংশিক সত্যে, তার প্রতিটি কর্ম যেমন মুক্ত ঠিক তেমনই গুরুত্বহীন।

তাহলে আমরা কোনটাকে বেছে নেব? ভার নাকি নির্ভারতা?

খৃষ্টপুর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারমেনিডিজ [৪] ঠিক এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি পৃথিবীটাকে  বিভাজিত দেখেছিলেন বীপরিতমুখী যুগলে: আলো/অন্ধকার, সুক্ষতা/স্থুলতা, উষ্ণতা/শীতলতা, অস্তিত্ব/অনস্তিত্ব। এই বীপরিতমুখী যুগলে অর্ধেককে তিনি চিহ্নিত করেছেন ইতিবাচক হিসাবে( আলো, সুক্ষতা,উষ্ণতা, অস্তিত্ব) এবং অন্য অর্ধেককে নেতিবাচক হিসাবে। আমরা  ইতিবাচক এবং নেতিবাচক মেরুতে তার এই বিভাজন প্রক্রিয়াকে শিশুসুলভ সরল মনে করতে পারি শুধু একটি সমস্যা ছাড়া: কোনটি ইতিবাচক, ভার নাকি নির্ভারতা?

পারমেনিডিজ এর উত্তর ছিল: নির্ভারতাই ইতিবাচক, ভার নেতিবাচক।

তিনি কি সঠিক অথবা না? সেটাই প্রশ্ন। শুধুমাত্র  একটি বিষয় নিশ্চিত তা  হলো: নির্ভারতা/ভার বৈপরীত্যটি সবচেয়ে বেশী রহস্যময় আর অস্পষ্টতম একটি বিষয়।

____________________________

[১]  Eternal return : নীচাহ’র একটি দর্শন
[২] ফ্রিয়েডরিশ নীচাহ : বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক
[৩] ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়ের: ফরাসী বিপ্লবের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব।
[৪] পারমেনিডেজ: গ্রীক দার্শনিক

Advertisements

One thought on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১ এবং ২

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s