দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১৫

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা
ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১৫

টমাসের এই অদ্ভুত বিষন্ন মুগ্ধতা স্থায়ী ছিল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু সোমবারে, সবকিছু বদলে যায়-টমাসের চিন্তায় তেরেজা জোর করে ঢুকে পড়ে:তেরেজাকে সে কল্পনা করে টেবিলে বসে তার জন্য বিদায়ের সেই চিঠিটি লিখছে, তার মনে হয় তেরেজার হাত একটু কাপছে;টমাস দেখতে পায়, ভারী স্যুটকেসটা সে টানছে এক হাতে, অন্য হাতে ধরা কারেনিনর এর গলায় বাধা বাধনটা। টমাস কল্পনা করে, তেরেজা প্রাহাতে তাদের ফাকা ফ্ল্যাটের দরজা খুলছে; আর  সম্পুর্নতম পরিত্যক্ততার দীর্ঘশ্বাস তেরেজা তার মুখের উপর অনুভব করে।

টমাসের সেই দুটি সুন্দর বিষন্ন দিনে, তার সমবেদনা ( আবেগীয় টেলিপ্যাথির সেই অভিশাপ) ছিল অনুপস্থিত, যেন খনি শ্রমিকদের  রোববারের গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিল সেটি, যাদের সারা সপ্তাহ পরিশ্রমের পর সোমবারের আবার প্ররিশ্রমের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে হয়।

রোগীদের চিকিৎসা করার বদলে টমাস তেরেজাকে দেখে; নিজেকে মনে করিয়ে দেবার আন্তরিক চেষ্টা করে সে, তেরেজাকে নিয়ে কোন চিন্তা করো না,তার কথা ভেবো না;টমাস নিজেকে বলে, আমি সমবেদনার অসুখে অসুস্থ হয়ে পড়েছি, ভালোই হয়েছে সে চলে গেছে,আমি আর তাকে কখনোই দেখবো না; যদিও এটা কিন্ত তেরেজা না, যার থেকে আমাকে মুক্তি পেতে হবে – বরং সেই অসুখ,অসহনীয় সমবেদনা, আমার ধারনা ছিল  যার থেকে আমি সুরক্ষিত,কিন্তু শুধুই ততক্ষনই,যতক্ষন অবধি তেরেজা আমাকে এই সমবেদনার অসুখ দিয়ে সংক্রমিত করেনি।

শনিবার এবং রোববারে,টমাস অনুভব করেছিল, বেচে থাকার একটা মধুর নির্ভারতা ভবিষ্যতের গভীর থেকে তাকে স্পর্শ করছে। কিন্তু  সোমবার, সে অনুভব করে সম্পুর্ণ অচেনা একটি ভার; রুশ ট্যাঙ্কের টন পরিমান স্টীলের ভার সেই তুলনায় যেন কিছুই নয়। কারন সমবেদনার তুলনায় আর কোন কিছুই ভারী নয়,আমরা যে কষ্টটা অন্য আরেকজনের জন্য অনুভব করতে পারি,তার তুলনায় নিজের কষ্টের ওজনও এতো ভারী মনে হয়না। কারন, অন্য কারো জন্য,আমাদের অনুভুত সেই কষ্টটি আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে কল্পনায় ভর করে, এবং প্রলম্বিত হতে থাকে শত প্রতিধ্বনীতে।

নিজেকে বারবার সে সতর্ক করেছিল, সমবেদনার অনুভুতির কাছে কিছুতেই হার না মানতে; আর  সমবেদনা যেন মাথা নীচু করে খানিকটা অপরাধবোধ নিয়ে শুনছিল তার নিষেধাজ্ঞা। সমবেদনা জানতো তার আচরন উদ্ধত অংহকারপুর্ণ; তারপরও সে তার অবস্থান ত্যাগ করেনি এক বিন্দু; এবং তেরেজার চলে যাবার পর পঞ্চম দিনে টমাস তার হাসপাতালের পরিচালককে ( যিনি রুশ আগ্রাসনের পর প্রতিদিন প্রাহাতে টমাসকে ফোন করতেন)জানায়, তাকে তার নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে এখনই। টমাস লজ্জিত ছিল, কারন সে জানতো, এ ধরনের কোন পদক্ষেপ দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন এবং ক্ষমার অযোগ্য বলে মনে হতে পারে তার কাছে। সে ভেবেছিল, তেরেজা এবং তার জন্য টেবিলের উপর রেখে যাওয়া চিঠিটার কথা তাকে বলে মনের কিছুটা ভার লাঘব করবে,কিন্তু সেটা না করার সিদ্ধান্ত নেয় সে; সুইস পরিচালক এর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তেরেজার এই অন্তর্ধান শুধু পাগলামী আর ঘৃন্য একটি কাজই মনে হতে পারে। এবং টমাস তেরেজাকে নিয়ে খারাপ কিছু ভাবার ‍সুযোগ  কাউকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

হাসপাতালের পরিচালক মুলত: অপমানিত বোধ করলেন।

টমাস শুধু কাধ ঝাকালো এবং বললো, এস মুস সাইন।

এস মুস সাইন(es muss sein? জার্মান ভাষায় যার অর্থ, এটা হতেই হবে);টমাসের এই বাক্যের ব্যবহার আসলে কিন্তু পরোক্ষভাবে ভিন্ন একটি ধারনার উল্লেখ মাত্র। বীটহোভেন এর শেষ কোয়ার্টেটটি নীচের দুটো মোটিফ বা স্থায়ী ভাব বা সুরের উপর ভিত্তি করে লেখা:

এই শব্দগুলোর অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্য বীটহোভেন নিজেই এই মুভমেন্টটা (সঙ্গীতের) শুরু করেছিলেন একটি বাক্য দিয়ে,’Der schwer gefasste entschulss’ , যা সাধারনত অনুদিত হয়ে থাকে, ’একটি অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত’ ।

বিটহোভেন এর প্রতি এই পরোক্ষ ইঙ্গিত আসলে টমাসের তেরেজার কাছেই ফিরে যাবার প্রথম পদক্ষেপ, কারন তেরেজাই তাকে বীটহোভেন এর কোয়ার্ট্রেট আর সোনাটার রেকর্ডগুলো কেনার জন্য আগ্রহী করেছিল একসময়।

এই পরোক্ষ সম্পর্কটা টমাস যতটুকু ভেবেছিল তা আরো বেশী প্রাসঙ্গিক কারন এই সুইস ডাক্তারটি নিজেই একজন গভীর সঙ্গীতপ্রেমী; শান্তভাবে মুচকি হেসে, বীটহোভেন এর মেলোডির মোটিফের সুরেই জিজ্ঞাসা করেন, মুস এস সাইন ( muss es sein? অবশ্যই কি তা করতে হবে?)?

ইয়া, এস মুস সাইন ( হ্যা, অবশ্যই তা করতে হবে) টমাস আরো একবার তা বলে।

2 thoughts on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১৫

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s