দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১৩ এবং ১৪

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা
ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার

 
ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১৩

তাদের খালি ফ্ল্যাটের জন্য প্রথমে একটি বিছানা কেনে টমাস ( তখনও তাদের অন্য কোন আসবাব কেনার মত সঙ্গতি ছিল না) এবং চল্লিশ বছর বয়স্ক একজন মানুষের নতুন জীবন শুরু করার উন্মাদনায় তার পেশাগত কাজে ঝাপিয়ে পড়ে।

জেনেভাতে সে বেশ কিছু টেলিফোন করে।  রুশ আগ্রাসনের এক সপ্তাহ পর ঘটনাচক্রে সেখানে সাবিনার একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়েছিল, এবং তার ছোট দেশের প্রতি সমবেদনার ঢেউ এ জেনেভার শিল্প রসিকরা তার সব পেইন্টিং কিনে ফেলেছিলেন।

টেলিফোনে হাসতে হাসতে সাবিনা বলে, ’রুশদের কল্যানে আমি এখন একজন ধনী মহিলা’; সে টমাসকে তার তার নতুন স্টুডিও দেখার আমন্ত্রন জানায়, তাকে নিশ্চিৎ করে, প্রাহাতে সে যেমনটা দেখেছে, তার থেকে নতুন স্টুডিওটির খুব একটা ব্যতিক্রম হবে না। সাবিনার ওখানে বেড়াতে যেতে পারলে টমাস নি:সন্দেহে খু্‌বই খুশী হত, কিন্তু তেরেজার কাছে তার হঠাৎ অনুপস্থিতির জন্য কোন অজুহাত খুজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিল। আর সেকারনে সাবিনাই জুরিখে এসে থাকার জন্য একটি হোটেলে উঠেছিল। হাসপাতালের কাজ শেষে টমাস তার সাথে সেখানে দেখা করতে যায়। নীচের  রিসেপশন ডেস্ক থেকেই প্রথমে সে উপরে ফোন করে জানায়, সে এসেছে, তারপর তার রুমে যায়। যখন দরজা খোলে সাবিনা, টমাস তার সামনে সুন্দর দীর্ঘ পায়ের উপর সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা সাবিনাকে দেখে , প্যান্টি আর ব্রা ছাড়া পরনে আর কিছু নেই এবং একটি কালো বোওলার হ্যাট তার মাথায়। সাবিনা নিশ্চুপ, স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে টমাসের দিকে একপলকে তাকিয়ে। টমাসও তাই্ করে। হঠাৎ করে সে বুঝতে পারে, সাবিনা তাকে কত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। সাবিনার মাথা থেকে বোওলার হ্যাটটি খুলে বিছানার পাশের টেবিলে রাখে সে,তারপর তারা সঙ্গমের গভীরে ডুবে যায় আর  কোন কথা না বলে।

হোটেল থেকে বের হয়ে তার ফ্ল্যাটে যাবার পথে ( ততদিনে সেখানে কিছু চেয়ার, একটি টেবিল, কাউচ এবং কার্পেট যোগ হয়েছে) টমাস বেশ খুশীমনে ভাবছিল, শামুক যেমন তার খোলস রুপী বাসা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেও তার নিজের জীবন ধারনের পন্থাকেও তার সাথে বহন করে নিয়ে বেড়াতে পারছে। তেরেজা এবং সাবিনা তার জীবনের দুটি বীপরিত মেরুকে নির্দেশ করছে, পৃথক এবং অসমন্বয়যোগ্য, অথচ সমানভাবে কাঙ্খিত।

কিন্তু সে যে তার জীবন ধারনের পন্থাকে তার শরীরের অংশর মতই তার সাথে সবজায়গায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই সত্যটির আরেকটি অর্থ হলো তেরেজাও তার দুস্বপ্ন দেখা থেকে পরিত্রান পায়নি।

তখন জুরিখে তাদের ছয় বা সাত মাস হয়েছিল, একদিন যখন টমাস এক সন্ধ্যায় দেরী করে বাসায় ফেরে, সে টেবিলের উপর  একটি চিঠি খুজে পায়, তেরেজা সেখানে তাকে জানায় সে প্রাহাতে ফিরে যাচ্ছে। সে চলে যাচ্ছে কারন বিদেশে বসবাস করার মত শক্তি তার নেই। সে জানে তার উচিৎ ছিল টমাসকে সাহায্য করা, কিন্তু সে জানেনা কিভাবে সে কাজটা করবে। সে তার নির্বুদ্ধিতাকে  স্বীকার করে নেয়, যখন সে ভেবেছিল, দেশের বাইরে গেলে হয়তো সে বদলে যাবে। সে ভেবেছিল রুশ আগ্রাসনের সময় তার অভিজ্ঞতা তাকে হয়তো বদলে দিয়েছে, ছেলেমানুষীর খোলস থেকে বেরিয়ে এসে আরো  বুদ্ধিমান এবং সাহসী, দৃঢ়চেতা হয়েছে সে, কিন্তু সে নিজের সম্বন্ধে শুধু উচ্চধারনাই পোষন করেছে কেবল।  টমাসের বোঝা সে বাড়িয়ে দিয়েছে, আর সে এই কাজটা করবে না। খুব বেশী দেরী হয়ে যাবার আগেই  প্রয়োজনীয়  এই উপসংহারটি সে টেনে দিতে চায় তাদের সম্পর্কে। সে ক্ষমা চায়,  কারেনিনকে তার সাথে নিয়ে যাবার জন্য।

বেশ কিছু ঘুমের ঔষধ খাবার পরও সকালের আগে টমাসের ঘুম হয় না। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিল শনিবার, সে বাসায় থাকতে পেরেছিল। প্রায় দেড়শ বার সে পুরো পরিস্থিতিটা নিয়ে ভাবে: তার নিজের দেশ এবং সারা পৃথিবীর মধ্যবর্তী সেই সীমানা আর আগের মত উন্মুক্ত নেই। কোন টেলিফোন বা টেলিগ্রাম পারবেনা তেরেজাকে ফিরিয়ে আনতে। কর্তৃপক্ষ দেশের বাইরে আর কোথাও তাকে যেতে দেবে না। তেরেজার বিদায় ভয়াবহ রকমের সুনিশ্চিৎ।

১৪

এবং তার যে কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই, এই বিষয়টির বোধ তাকে  ভারী হাতুড়ীর মত আঘাত করে, কিন্তু তারপরও ব্যাপারটা রহস্যজনকভাবেই তাকে সুস্থির বোধ করায়। ‍ তাকে সিদ্ধান্ত নিতে কেউ বাধ্য করছে না। সে কোন প্রয়োজন অনুভব করে না, কোর্টইয়ার্ডের অপর দিকে বাড়ীগুলোর দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে এবং ভাবতে, তার সাথে সে জীবন কাটাবে, কি কাটাবে না। তেরেজা নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে যায় টমাস। হতাশাগ্রস্থ ছিল সে, কিন্তু খেতে খেতেই তার সেই মুল হতাশাটার প্রভাব কমে আসে, দুর্বল হয়ে পড়ে, এরপর বেশ তাড়াতাড়ি বিষন্নতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না তার মনে।  তেরেজার সাথে কাটানো বছরগুলোর স্মৃতিচারন করতে গিয়ে সে অনুভব করে, তাদের কাহিনীর এর চেয়ে ভালো আর কোন সমাপ্তি হতে পারেনা। যদি কেউ এমন একটি গল্প তৈরী করতো, ঠিক এভাবে টমাস সেই কাহিনীটাকে শেষ করতো।

একদিন কোন আমন্ত্রন ছাড়াই তেরেজা তার কাছে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই একদিন সে চলে গেছে। ভারী একটা সুটকেস নিয়ে সে এসেছিল, ভারী একটা সুটকেস নিয়েই সে ফিরে গেছে।

বিল পরিশোধ করে রেস্টুরেন্ট থেকে সে বের হয়ে আসে। রাস্তা দিয়ে হাটতে থাকে, তার বিষন্নতাও ধীরে ধীরে বাড়ছিল আরো সুন্দর হয়ে।  তার জীবনের প্রায় সাতটি বছর সে কাটিয়েছিল তেরেজার সাথে ‌ এবং সে অনুধাবন করে,  তেরেজার সাথে কাটানো সেই বছরগুলো স্মৃতি,আসল সেই সময়ের তুলনায় বরং বেশী আকর্ষনীয় মনে হয়েছিল টমাসের কাছে।

তেরেজার জন্য তার ভালোবাসা অবশ্যই সুন্দর, কিন্তু সেটা আবার খুব ক্লান্তিকরও ছিল: সারাক্ষনই তেরেজার কাছ থেকে নানা কিছু লুকিয়ে রাখতে সে বাধ্য হয়েছে, কখনো ভান করতে হয়েছে, লুকাতে হয়েছে তার আসল অনুভুতি, দোষ স্বীকার করতে হয়েছে, তাকে খুশী করতে হয়েছে, অস্থির হলে ঠান্ডা করতে হয়েছে, তেরেজার জন্য তার অনুভুতির প্রমান তাকে দিতে হয়েছে বহুবার, তার হিংসার অভিযোগেগুলোর আসামী হতে হয়েছে,  তেরজার কষ্ট, আর  দু:স্বপ্নর জন্য তার অপরাধবোধে ভোগা, অজুহাত দেয়া, ক্ষমা চাওয়া,এসব কিছু যা কিছু ছিল ক্লান্তিকর তাদের সেই সম্পর্কে ,আজ সব বিলীন হয়ে, অবশিষ্ট রয়ে গেছে শুধুমাত্র এর সৌন্দর্যটুকু।

সেই শনিবারেই প্রথম টমাসকে জুরিখের রাস্তায় একা একা হাটতে দেখা গেল, তার স্বাধীনতার মাদকীয় গন্ধে নেশাগ্রস্থ হয়ে। রাস্তার প্রতিটা বাকে তার জন্য এখন অপেক্ষা করছে নতুন কোন অভিযান। ভবিষ্যৎ  আবারো রুপান্তরিত হয়েছে গোপনীয় কোন বিষয়ে। তার পুরোনো স্বাধীন ব্যাচেলর জীবনের অভিমুখেই সে যাত্রা শুরু করেছে, যে জীবনটাকে একসময় সে তার নিয়তি বলেই মনে করেছিল, যে জীবন সে যেমন, তাকে ঠিক তেমনই হবার সুযোগ দেবে।

সাতটা বছর সে তেরেজার সাথে বন্দী জীবন কাটিয়েছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল তেরেজার দৃষ্টি , বলা যায় সে তার গোড়ালীতে লোহার বেড়ী পরিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ করে যেন তার পদক্ষেপে সে হালকা বোধ করে। সে যেন ভাসতে থাকে;পারমেনিডেজ এর যাদুর ক্ষেত্রে সে প্রবেশ করেছে তখন: সে তার বেঁচে থাকার মাদকীয় মধুর নির্ভারতা উপভোগ করতে শুরু করে।

(সেকি সাবিনাকে জেনেভায় ফোন করতে চাচ্ছিল? কিংবা অন্য নারী বন্ধুদের, যাদের সাথে জুরিখে গত সাত মাসে তার পরিচয় হয়েছে? না, একদমই না। হয়তো সে বুঝতে পেরেছিল যে অন্য কোন নারী তার তেরেজার স্মৃতিকে আরো অসহনীয় বেদনাময় করে তুলবে।)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s