দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১১ এবং ১২

মিলান কুন্দেরা’র উপন্যাস  দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং এর বাংলা
ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান।
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা

প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১১

তেরেজার কষ্টকে খানিকটা সহনীয় করার প্রচেষ্টায় টমাস তাকে বিয়ে করে (অবশেষে তারা তেরেজার জন্য ভাড়া করা সেই রুমটা ছেড়ে দিতে সক্ষম হয়,যদিও তেরেজা সেখানে রাত কাটায়নি বহুদিন হলো) এবং তাকে একটা কুকুর ছানা উপহার দেয়।

তার এক সহকর্মীর সেন্ট বার্নার্ড ব্রিডের পোষা কুকুরের গর্ভে জন্ম নেয়া বাচ্চাটির বাবা অবশ্য্ তার প্রতিবেশীর জার্মান শেপার্ডটি। কেউই এই মিশ্র জাতের এই ছোট কুকুর ছানাগুলোকে চাইছিল না এবং তার সহকর্মীও এদের মেরে ফেলার কথা সহজে ভাবতেও চাইছিল না।

ছানাগুলোকে যেদিন টমাস প্রথম দেখেছিল, টমাস জানতো যে, সে যাদের বাতিল করবে তাদের নিয়তিতে রয়েছে অনিবার্য্য মৃত্যু; নিজেকে তার মনে হয়েছিল যেন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট, চারজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সামনে দাড়ানো, যার ক্ষমতা আছে মাত্র একজনের জীবন বাচানোর।

অবশেষে টমাস এদের একজনকে বেছে নেয়:  একটা মেয়ে কুকুর ছানা, যার দেহের গড়ন জার্মান শেপার্ড এর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং মাথাটি মা সেন্ট বার্নার্ড এর মত। তেরেজার জন্য সে এটিকে বাসায় নিয়ে আসে, দেখামাত্রই তেরেজা তাকে বুকে তুলে নেয়, ছানাটি সাথে সাথে তেরেজার কাপড়ে প্রশ্রাব করে দেয়।

এরপর দুজনে মিলে এর একটি নাম ঠিক করার চেষ্টা করে। টমাস চাচ্ছিল, এর নাম এমন হবে যেন স্পষ্ট বোঝা যায় এটি তেরেজার কুকুর এবং সে ভাবছিল তেরেজা যখন প্রথম প্রাহা’তে  না বলে চলে এসেছিল, তখন তার বাহুর নীচে চেপে ধরে রাখা বইটার কথা; সেটা ভেবেই টমাস প্রস্তাব করে, তারা এই কুকুর ছানাকে ডাকবে টলস্টয়।

তেরেজা প্রতিবাদ করে বলে, ’এর নাম টলস্টয় হতেই পারেনা, কারন, ও তো মেয়ে, আনা কারেনিনা বলে ডাকলে কেমন হয়?’

টমাস বলেছিল, ’এর নাম আনা কারেনিনা হতেই পারে না, কোন রমনীর এত হাস্যকর মুখশ্রী হতে পারেনা, বরং এর চেহারা অনেকটা কারেনিন এর মত, হ্যা, আনার স্বামী, ঠিক এভাবেই আমি তার চেহারাটা কল্পনা করেছিলাম’।

‘কিন্তু কারেনিন বলে ডাকলে কি বিষয়টা তার লিঙ্গ পরিচয়ে কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে নাতো আবার’?

তেরেজার এই প্রশ্নের জবাবে টমাসের উত্তর ছিল, ’খু্বই সম্ভব, হতে পারে সেটা, একটা মেয়ে কুকুরকে সারাক্ষন কোন পুরুষের নাম ধরে ডাকলে, সে নারী সমকামীতার বৈশিষ্ট প্রদর্শন করতে পারে’।

বিস্ময়কর ব্যাপার, টমাসের কথা সত্যিও হয়েছিল। যদি মেয়ে কুকুর ছানারা সাধারনত তাদের নারী মনিবের তুলনায় বেশী পুরুষ মনিব ঘেষা, কারেনিনকে দেখা গেল এর ব্যতিক্রম, স্পষ্টতই সে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে যে, তেরেজাকে সে বেশী ভালোবাসে। এজন্য টমাসও কারেনিনের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। কুকুর ছানাটার মাথায় বুলিয়ে টমাস বলতো, ’সাবাশ, কারেনিন! আমি তোমার কাছে এটাই চেয়েছিলাম, যেহেতু আমি  একা তেরেজার সাথে সামলে উঠতে পারছি না,  তোমার আমাকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে’।

কিন্তু এমনকি কারেনিন এর সাহায্য নিয়েও টমাস তেরেজাকে সুখী করতে ব্যর্থ হয়। সে তার এই ব্যর্থতাটার স্বরুপটা প্রথম বুঝতে পারে, আরো কয়েক বছর পর, আগ্রাসী রুশ সামরিক ট্যাঙ্ক বাহিনীর তার দেশটিকে দখল নেবার প্রায় দশ দিনের মাথায়। সেটা ছিল, ১৯৬৮ সালের আগষ্ট মাস এবং টমাস জুরিখের একটি হাসপাতাল থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফোন পাচ্ছিল। সেখানের হাসপাতালের ডিরেক্টর, একজন চিকিৎসক, টমাসের সাথে যার বন্ধুত্ব হয়েছিল একটি আর্ন্তজাতিক সম্মেলনের সময়, রুশ দের চেক আগ্রাসনের সময় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন টমাসকে নিয়ে, একারনে বার বার তাকে জুরিখে কাজ দেবার প্রস্তাব করছিলেন।

 ১২

দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই টমাস যদি এই সুইস ডাক্তারের প্রস্তাব বাতিল করে থাকে, সেটার কার আসলে তেরেজা। সে ধরেই নিয়েছিল, তেরেজা কখনোই দেশ ছেড়ে যাবে না। রুশ আগ্রাসনের প্রথম সপ্তাহ তেরেজা যেন একটা ঘোরের মধ্যে সময় কাটিয়েছে, কারো সেটা মনে হতে পারে প্রায় সুখের মত। সারাদিন ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে সে, ছবি তুলে তুলে রোল রোল ফিল্ম সে পাচার করেছে বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে, আক্ষরিক অর্থেই, সেগুলো পাবার জন্য  তারা যুদ্ধ করেছে নিজেদের মধ্যে। একবার তেরেজা বেশ বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিল, এক দল প্রতিবাদী জনতার দিকে পিস্তল তাক করা এক রুশ অফিসারের ‌একটা ক্লোজ আপ ছবি তোলে তেরেজা। তাকে বন্দী করা হয় সাথে সাথেই এবং রুশ সামরিক হেডকোয়ার্টারের জেলে তাকে রাত কাটাতে হয়। সেখানে তারা তাকে হুমকি দেয়, এরপর তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে বলে, কিন্তু ছাড়া পা্বার পর পরই তেরেজা তার ক্যামেরা নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ে।

সে কারনে টমাস খুবই অবাক হয়, যখন রুশ আগ্রাসনের দশম দিনে তেরেজা তাকে জিজ্ঞাসা করে,’ তুমি কি কারনে সুইজারল্যান্ড যেতে চাচ্ছো না?’

’ আমি কেন যাবো?’

’তোমার জন্য এখানে থাকাটা ওরা কঠিন করে ফেলবে’।

’ওরা যে কারো জন্য এখানে থাকাটা কঠিন দিতে পারে’, টমাস হাত নাড়িয়ে কথাটার উত্তর দেয়, ’আর তুমি’? ’তুমি বিদেশে থাকতে পারবে’?

’কেন না?’

’তুমি দেশের জন্য নিজের জীবনের ঝুকি নিচ্ছো প্রতিদিন, তুমি কিভাবে নির্বিকারভাবে দেশটাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছো?’

’এখন যেহেতু দুবসেক (১১) ফিরে এসেছে, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে’, তেরেজা বলে।

সত্যি, প্রথম সপ্তাহের বেশী প্রাথমিক এই উল্লাস আর টেকে নি, রুশ সামরিক বাহিনী দেশের জনগনের প্রতিনিধি সব নেতাদের দল বেধে ধরে নিয়ে যায় অপরাধীদের মত। কেউ জানেনা তারা কোথায় এখন, ধারনা করা হচ্ছিল তারা বেচে নেই, রুশদের প্রতি ঘৃনা মানুষগুলোকে মাতাল করে রেখেছিল, মদের মত। সেটা ছিল মদমত্ত ঘৃনার উৎসব। চেক শহরগুলোর দেয়ালে শোভা বাড়িয়েছিল হাজার হাজার হাতে আঁকা পোষ্টার যার মধ্যে ছিল ব্রেজনেভ ও তার সৈন্যদের অশিক্ষিতদের সার্কাস আখ্যা নিয়ে নানা তীর্যক মন্তব্য, ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা আর কার্টুন। কিন্তু কোন কার্নিভালই আসলে চিরকাল চলতে পারেনা। ইতিমধ্যেই রুশরা মস্কোতে ধরে নিয়ে যাওয়া চেক প্রতিনিধিদের জোর করেই একটা সমঝোতার চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। দুবসেক তাদের নিয়ে প্রাহাতে ফিরে আসার পর রেডিওতে একটি ভাষন দেন, ছয় দিনের বন্দীত্ব তাকে স্পষ্টতই এক বিদ্ধস্ত করেছিল, তিনি কোন শব্দ উচ্চারণ করতেই পারছিলেন না। বার বার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল তার, যেন শ্বাস নিতে পারছেন না, প্রতিটি ধীরে ধীরে উচ্চারিত বাক্যের মধ্যে ছিল দীর্ঘ বিরতি, কখনো প্রায় আধা মিনিট।

এই সমঝোতা দেশটিকে একটি খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে সহায়তা করেছিল: কারন সম্ভাব্য গনহারে হত্যা এবং সাইবেরিয়ায় লেবার ক্যাম্পে প্রেরণ করার সম্ভাবনা সবাইকেই আতঙ্কে রেখেছিল। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছিল অবশেষে, সেটা হল, দেশকে এবার তার শক্তিশালী রুশ দখলকারীর প্রতি নতমস্তক হতে হবে। এবং চিরকালই হোচট খেয়ে চলতে হবে, তোতলাতে হবে, আলেক্সান্ডার দুবসেক এর মতই শ্বাস নেবার জন্য বাতাসের সংকটে পড়তে হবে। কার্নিভালের আনন্দ শেষ, দৈনন্দিন জীবনের অপমানের সুচনা হলো।

তেরেজা টমাসকে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এবং টমাস জানে সব সত্যি। কিন্তু টমাস জানতো, এই সবকিছুর নীচে লুকানো আছে অন্য একটি, আরো মৌলিক সত্য, যে কারনে তেরেজা প্রাহা ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে: আসলে আগে এখানে সে কখনোই সুখী ছিলো ‍না। যে দিনগুলোতে প্রাহার রাস্তায় রাস্তায় হেটে যে রুশ সৈন্যদের ছবি তুলেছিল সব বিপদের শঙ্কাকে তুচ্ছ করে, সেই দিনগুলোই ছিল তার জীবনের সেরা কয়টি দিন। সেই সময়টায় সেই টেলিভিশন সিরিজগুলোর মত তার দু:স্বপ্নের ধারা ব্যহত হয়েছিল এবং কিছু সুখের রাত অবশেষে সে কাটাতে পেরেছিল। রুশরা যেন তাদের ট্যাঙ্ক নিয়ে তার জীবনের ভারসাম্যও ফিরিয়ে দিয়েছিল, এখন যেহেতু এই কার্ণিভাল শেষ, আবার দুস্বপ্নের ভয় তাকে আতঙ্কিত করে তুলছে, তেরেজা সেই পরিস্থিতি থেকে পালাতে চাইছিল। সেই পরিস্থিতিগুলোকে তেরেজা এখন চিনতে পেরেছে, যখন সে নিজেকে শক্তিশালী আর পুর্ণ অনুভব করে, এবং সে মনে প্রানে চাইছিল, দেশ ছেড়ে পৃথিবীর মুখোমুখি হয়ে অন্যকোথাও সেই পরিস্থিতিগুলোকে আবার খুজে নিতে।

টমাস শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল, ’তোমার অস্বস্তি লাগছে না যে, সাবিনাও সুইজারল্যান্ডে চলে গেছে?’

’জেনেভা তো আর জুরিখ না’, তেরেজা বলে, ’প্রাহাতে সে যতটা ছিল ওখানে তার চেয়ে অনেক কম ঝামেলার কারন হবে’।

যে মানুষটি তার বসবাসের জায়গা ছেড়ে চলে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়, সে একজন দু:খী মানুষ। একারনেই টমাস তেরেজার দেশ ছাড়ার ইচ্ছাটাকে মেনে নেয়, একজন অপরাধী যেমন তার শাস্তি মাথা পেতে নেয় এবং একদিন সে, তেরেজা এবং কারেনিন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহরে নিজেদের আবিষ্কার করে।

(((((((((((((((((((((((((((((((((((চলবে)))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))

[১১] আলেক্সান্ডার দুবসেক: Alexander Dubček  (27 November 1921 – 7 November 1992) was a Slovak politician and briefly leader of Czechoslovakia(1968–1969), famous for his attempt to reform the communist regime during the Prague Spring. Later, after the overthrow of the government in 1989, he was Chairman of the federal Czecho-Slovak parliament.

One thought on “দি আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং: প্রথম পর্ব, ১১ এবং ১২

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s