হরমোনাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল

 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে খানিকটা ইতিহাস চর্চা.. কয়েকজন অসাধারন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে …

প্রথমে..

ক্যাথেরিন ডেক্সটার ম্যাককরমিক নামটা সবার মনে রাখা উচিৎ, বিশেষ করে যদি আপনি নারী হন, কারন এই ভদ্রমহিলা না থাকলে আপনার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো; আজ এতদিন পর যদি তার একটি অবদানের কথা বলতেই হয় সেটি হচ্ছে .তিনি একটি গবেষনা কর্মে আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন..যে গবেষনাটিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস চিহ্নিত করেছিল .. most sweeping sociomedical revolution in history .. যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, সারা বিশ্বেই বা কি .., সেটি আসলেই গবেষনা করা অসম্ভব এর বিশালতার জন্য; তিনি আর্থিক সাহায্য করেছিলেন যে গবেষনাটির.. সেই গবেষনাটির ফলাফল ছিল… জন্ম নিয়ন্ত্রন বড়ি বা birth control pill, আরো সঠিক ভাবে হরমোনাল ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল।

Katharine Dexter McCormick

এবার মারগারেট স্যাঙ্গার…

তখনও নারীবাদীদের আন্দোলন শুরু হয়নি, জন্ম নিয়ন্ত্রনের স্বপক্ষে যুক্তিগুলো সীমাবদ্ধ শুধু বিবাহিত দম্পতির পরিবার পরিকল্পনার ভাষায় সীমাবদ্ধ, আর বড়জোর এর বাইরে সেই আলোচনার অংশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন কিংবা ইউজেনিকস এর বিভ্রান্ত ধারনায় সীমাবদ্ধ ; কোন নারীর নিজের শরীরের উপর তার নিয়ন্ত্রন আর অধিকারের বিষয়টি সেই যুক্তির অংশ ছিল না সেই সময়টিতে …; ১৯১৪ সালে মারগারেট স্যাঙ্গার প্রথম জন্ম নিয়ন্ত্রন বা birth control শব্দটিকে আলোচনায় নিয়ে আসেন, যেখানে তিনি জোর দেন এটি নারীর নিজের শরীর সম্বন্ধে কোন কিছু সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার হিসাবে। সেই সময় সাপোজিটরী আর নানা ধরনের ডুশ পদ্ধতি ছিল মুল পদ্ধতি জন্ম নিয়ন্ত্রনের, অবশ্য ইউরোপে তখন ডায়াফ্রামের প্রচলন হয়েছে।

margaret_sanger

মারগারেট স্যাঙ্গার পেশায় ছিলেন নার্স, এছাড়া তিনি যৌন স্বাস্থ্য সম্বন্ধে শিক্ষা দিতেন, বিশ্বাস করতে নারীদের প্রয়োজন তার নিজের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া.. কখন সে সন্তান ধারন করবে, আর তার সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনের জন্য যেটি একটি গুরুত্বপুর্ণ পুর্বশর্ত। আর এই সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা নারী সমাজে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বহু দুরে এগিয়ে নিয়ে যাবে; কিন্তু স্যাঙ্গারের জন্য বিষয়টি কিন্তু সহজ ছিল না, অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল বিষয়টি, যা এখনও বহু প্রেক্ষাপটেও টিকে আছে। কিভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রন করতে হয় সেটি শেখানোর জন্য তাকে আইনের হাতে ধরা পড়তে হয়েছে প্রথমে, পরে ইউরোপ থেকে ডায়াফ্রাম চোরাইপথে নিয়ে আসার মত অপরাধে তাকে আটক করা হয়েছে। এরকম একটি বৈরী পরিবেশে, প্রায় অসম্ভব ছিল জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকরী আর নিরাপদ কোন পদ্ধতি নিয়ে গবেষনার করার মত কোন অর্থ সাহায্য কল্পনাতীত একটি ব্যাপার ছিল।

মারগারেট স্যাঙ্গারের সাথে ক্যাথরিন ম্যাককরমিক এর দেখা হয়েছিল নারী অধিকার আদায়ে সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসাবে। তিনি তখন National American Woman Suffrage ও the League of Women Voters এর নেতৃত্বে.. ১৯২০ সালে ১৯ তম সংশোধনীতে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিৎ হয়েছিল, ক্যাথরিন পারিবারিকভাবে বিত্তশালী ছিলেন, এছাড়া তার স্বামীর সম্পত্তি ছিল অনেক, কিন্তু স্বামী স্ট্যানলী আক্রান্ত ছিলেন সিজোফ্রেনিয়ায় ( তখন রোগটি সম্বন্ধে তেমন কোন ধারনা ছিল না); ক্যাথরিন নিজে একজন জীববিজ্ঞানী ছিলেন, MIT থেকে গ্রাজুয়েট করা তিনি দ্বিতীয় নারী। ১৯৪৭ সালে তার স্বামী স্ট্যানলী মৃত্যুবরণ করেন, তার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন ক্যাথরিন। যেদিনই তিনি এই সম্পত্তির মালিক হন, সেদিনই তিনি মারগারেটকে চিঠি লেখেন তার উপদেশ চেয়ে, কি করবেন এর সুব্যবহারের জন্য।

সেই সময় মারগারেট স্যাঙ্গার তাকে পরিচয় করিয়ে দেন গবেষক গ্রেগরী পিঙ্কাস এর সাথে, তিনি তখন ডিম্বানু নিষিক্তকরন আর হরমোন নিয়ে গবেষনা করছিলেন, এর কিছুদিন আগে যে ঔষধ কোম্পানী তাকে আর্থিক সহায়তা করে আসছিল তারা সেই সাহায্য বন্ধ করে দেয়, কারন তার গবেষনায় কোন লাভ জনক কিছু ছিল না।

Gregory Goodwin Pincus ছিলেন পোল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা এক ইহুদী পরিবারের মেধাবী সন্তান। তিনি নানা বিষয়ে কাজ করলেও স্তন্যপায়ী প্রানীদের প্রজনন তন্ত্র নিয়ে গবেষনা তার অন্যতম প্রিয় বিষয় ছিল। তবে তিনি তখন মুলত কাজ করছিলেন, ইনফার্টিলিটি নিয়ে, ১৯৫১ সালে একটি ডিনারের দাওয়াতে তার সাথে দেখা হয় মারগারেট স্যাঙ্গার এর, ডিনারটির আয়োজক ছিলেন Abraham Stone, যিনি তখন Margaret Sanger Research Bureau ও Planned Parenthood Federation of America (PPFA) এর মেডিকেল ডিরেক্টর। তিনি PPFA থেকে ছোট একটি গ্রান্ট যোগাড় করে দিয়েছিলেন হরমোনাল কন্টাসেপটিভ পিল নিয়ে গবেষনা করার জন্য। পিঙ্কাস সেই সময় চীনা আমেরিকান গবেষক Min Chueh Chang কে সাথে নিয়ে প্রমান করেছিলেন প্রজেস্টেরণ অভ্যুলেশন বা ডিম্বাশয়ের ফলিকলের দেয়াল ভেঙ্গে ডিম্বানু কোষের বেরিয়ে আসাটাকে প্রতিরোধ করতে পারে।

 

Gregory_Pincus

ক্যাথরিন সেই সময় তাকে ২ মিলিয়ন ডলার ( যা বর্তমান মুলে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার এর কাছাকাছি হবে) দান করেন, জন্ম নিয়ন্ত্রন বড়ি আবিষ্কারের জন্য। পিঙ্কাসের গবেষনায় প্রথম আবিষ্কৃত হয় জন্ম নিয়ন্ত্রনের বড়ি, যার কেন্দ্রে হরমোন। পিল টি নিরাপদ কিনা সেটি পরীক্ষা করা হয় বেশ কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এর মাধ্যমে..১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল অবধি, অবশেষে ১৯৬০ সালে প্রথম মুখে খাওয়ার কন্টাসেপটিভ পিল অনুমোদিত হয়; এই পিলটিকে আরো কার্যকরী আর নিরাপদ করতে তিনি তার অর্থ সাহায্য অব্যাহত রাখেন। ক্যাথরিন ম্যাককরমিক এর আরো কিছু অসাধারন অবদান আছে, তিনি MIT তে তার স্বামীর নামে একটি ডরমিটরী বানান নারী শিক্ষার্থীদের জন্য, নারীদের বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিশেষ অর্থ সাহায্যরও ব্যবস্থা করেন…

Advertisements

3 thoughts on “হরমোনাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল

  1. এখানে যাদের সম্পর্কে জানলাম তাদেরকে নারী-কল্যানকামীই বলব। আর বিষয়টার সাথে পুরো মানবকল্যানই সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু হায় এদের নাম আমি জানতাম না। কোনো নারীবাদীকেও এদের নাম ও এই বিষয়গুলো তুলে ধরতে দেখি না। নারী-পুরুষ তর্কাতর্কিতেই তারা বেশি ব্যস্ত।
    কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল এর বহুল ব্যবহার যতদূর জানি হিপ্পি-মুভমেন্টে নতুন মাত্রা পায়, যা নারী স্বাধিকারের প্রসঙ্গ থেকেই উদ্ভুত। কিন্তু এর পেছনে এত মানুষ এর ভূমিকা সেটা অজ্ঞাত ছিল আমার।

    বরাবরেরই মতই নতুন কিছু, দারুন লেখা মাহবুব ভাই। শুভ কামনা।

    1. অনেক ধন্যবাদ তোমার মন্তব্যের জন্য.. নিজেদের প্রজননের উপর নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে।

      1. হ্যা, সেটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে পৃথিবীর একদা-অনুন্নত দেশগুলোর বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা দেখে। যদিও অনেক ধর্ম-সংস্কৃতির সমাজব্যবস্থা এই পদ্ধতি ব্যবহার করেও এর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s