(রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ: অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
দ্বিতীয় অধ্যায়: কুকুর, গরু এবং বাধাকপি
প্রথম পর্ব
একজন ডারউইনের এই দৃশ্যে উপস্থিত হতে কেন এত দীর্ঘ সময় লাগলো? আসলেই কি প্রলম্বিত করেছিল মানবজাতির এই সুস্পষ্ট সহজবোধ্য ধারনাটিতে পৌছাতে; যে ধারনাটি দৃশ্যতই মনে হয় যে এর প্রায় দুই শতাব্দী আগে আমাদেরকে উপহার দেয়া নিউটনের গানীতিক ধারনাটির চেয়ে অনেক বেশী সহজবোধ্য-বা এমনকি দুই হাজার বছর আগে আর্কিমিডিসের এর ধারনাটির চেয়েও? এই প্রশ্নের জবাব হিসাবে বেশ কিছু উত্তরও প্রস্তাব করা হয়েছে ইতিমধ্যে। হয়ত আমাদের মন সচেতনভাবেই শঙ্কা বোধ করেছে, যে অকল্পনীয় পরিমান সময়ের প্রয়োজন এই বিশাল পরিবর্তনের জন্য সেটা অনুভব করে কিংবা আমরা আজ যাকে ভুতাত্ত্বিক গভীর সময় বা জিওলজিকাল ডিপ টাইম বলছি, এবং যে ব্যক্তিটি সেই সময়টা বুঝতে চাইছেন, তার জীবনকালের দৈর্ঘ্যর সাথে এটির অসামন্জষ্যতার কারনে। হয়তবা এর কারন হতে পারে ধর্মীয় দীক্ষা, যা আমাদের পিছু টেনে ধরেছিল। অথবা এর কারন হতে পারে, জীবিত অঙ্গ, যেমন চোখের অসাধারন এবং অন্য কিছু ভাবার জন্য নিরুৎসাহিত করার মত জটিলতা,যেন এটি কোন এক মাষ্টার প্রকৌশলীর করা বিশেষ ডিজাইন বা পরিকল্পনার ছলনাময়ী মায়ার নানা চিহ্ন বহন করছে। সম্ভবত এই সব কিছু্ই কোন কোন ভুমিকা পালন করেছে এই সহজ সত্যটা আমাদের বুঝতে। কিন্তু আর্ণস্ট মেয়ার (Ernst Mayr), নিও-ডারউইনিয়ান সিনথেসিসের বিখ্যাত গ্রান্ড ওল্ড ম্যান, যিনি ২০০৫ সালে ১০০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, বারবার একটি ভিন্ন সন্দেহর কথাই উচ্চারণ করেছিলেন। মায়ারের দৃষ্টিতে মুল অপরাধী প্রাচীন দার্শনিক একটি মতবাদ-যার আধুনিক নাম- এসেন্শিয়ালিজম (Essentialism),বিবর্তনের আবিষ্কারকে আটকে রেখেছিল প্লেটো মৃত হাত ( এটা অবশ্য মায়ার এর বাক্য না, তবে তার ধারনাটিকে এটি প্রকাশ করে)।
প্লেটোর মৃত হাত:
প্লেটোর দৃষ্টিভঙ্গীতে ’বাস্তবতা’ হিসাবে আমরা আসলে যা দেখছি মনে করে চিন্তা করি, তা আসলে গুহার দেয়ালে পড়া শুধু ছায়া মাত্র ,যা সৃষ্টি করেছে গুহার মেঝেতে আমাদের জ্বালানো খোলা আগুনের কম্পমান শিখা। অন্যান্য ধ্রুপদী গ্রীক দার্শনিকদের মতই প্লেটো তার অন্তরে ছিলেন একজন জিওমিটার ( যিনি জ্যামিতি বিষয়ে চর্চ্চা করেন); বালিতে আকা প্রতিটি ত্রিভুজ আসলে একটি সত্যিকারের ত্রিভুজের এসেন্স বা মৌলিক গুনাবলী বা নির্যাসের ক্রটিপুর্ণ একটি ছায়া। কোন একটি এসেন্শিয়াল ত্রিভুজের রেখাগুলো হবে বিশুদ্ধ ইউক্লিডীয় রেখা যার দৈর্ঘ্য আছে কিন্তু কোন প্রস্থ নেই, যেখানে রেখাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে অসীমভাবে সংকীর্ণ এবং যখন সমান্তরাল, তখন কখনোই তারা একবিন্দুতে মিলিত হয়না। এই এসেন্শিয়াল ত্রিভুজের কোনগুলোর সমষ্ঠী একেবারে নিখুতভাবে ঠিক দুই সমকোনের সমান, এক পিকোসেকন্ড আর্ক কম কিংবা বেশী হয়না। কিন্তু বালিতে আকা ত্রিভুজটির ক্ষেত্রে এসব সত্য নয় প্লেটোর কাছে তা শুধুমাত্র একটি আদর্শ ’এসেন্শিয়াল’ ত্রিভুজের অস্থির ছায়া মাত্র।
মায়ার এর মতে এধরনের মতবাদের একটি নিজস্ব সংস্করণ জীববিজ্ঞানকেও আক্রান্ত করেছিল। জীববিজ্ঞানের এসেন্শিয়ালিজম, টাপির এবং খরগোশ; পাঙ্গোলিন এবং ড্রমেডারিসদের এমন ভাবে ব্যাখ্যা করেছিল,যেন তারা ত্রিভুজ, রম্বস, প্যারাবোলা কিংবা ডোডেকাহেড্রনের মত নানা ধরনের জ্যামিতিক ফর্ম। অর্থাৎ যে খরগোশদের আমরা দেখছি, তা আসলে একটি ’নিখুত’ খরগোশের ধারনার বিবর্ণ একটি ছায়া:একটি আদর্শ এসেন্শিয়াল, প্লেটোনিক খরেগোশ, ধারনার জগতে নিখুত জ্যামিতিক ফর্মদের সাথে যাদের বসবাস। রক্ত মাংশের খরগোশদের মধ্যে হয়তো ভিন্নতা থাকতে পারে তবে তাদের ভিন্নতা সবসময় দেখতে হবে একটি আদর্শ খরগোশের মুল বৈশিষ্ট বা এসেন্স থেকে ক্রটিযুক্ত ব্যতিক্রম হিসাবে।
কি হতাশাজনকভাবে অবিবর্তনীয় একটি দৃশ্য! প্লেটোবাদীরা খরগোশের কোন পরিবর্তনকে মনে করেন এসেন্শিয়াল খরগোশ থেকে কোন গোলমেলে বিচ্যুতি এবং পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিরোধ থাকবেই- যেন সব আসল খরগোশই আকাশে কোন একটি এসেন্শিয়াল খরগোশের সাথে অদৃশ্য এক ইলাস্টিক কর্ড দিয়ে বাধা। জীবনের বিবর্তনীয় দৃষ্টি এর একেবারেই বীপরিত। উত্তরসুরীরা অনির্দিষ্টভাবেই তাদের পুর্বসুরী প্রানীদের বৈশিষ্ট থেকে ভিন্নতা বহন করবে, প্রতিটি ভিন্নতাই রুপান্তরিত হয় ভবিষ্যতে আরো বিচিত্রতার সম্ভাব্য পু্র্বসুরী হিসাবে । আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন তত্ত্বর স্বতন্ত্র সহআবিষ্কারক কিন্তু তার যুগান্তকারী রচনাটির নাম দিয়েছিলেন, ‘On the tendency of varieties to depart indefinitely from the original type’ বা ‘মুলরুপ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বৈচিত্রতার বিচ্যুতির প্রবণতা প্রসঙ্গে’ ।
যদি কোন আদর্শ খরগোশ এর অস্তিত্ব থাকেই, তবে এই বিশেষণ সত্যিকারের, ছটফটে, লম্ফমান, বিচিত্র ধরনের খরগোশদের পরিসংখ্যানগত সাধারন বিস্তারের একটি বেল কার্ভের মধ্যবিন্দু ছাড়া আর কোন কিছুকেই আসলে নির্দেশ করে না। এবং এই বিস্তার সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। বহু প্রজন্মান্তরে ক্রমান্বয়ে এমন কোন অবস্থার উদ্ভব হয়, যা সুষ্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়না, যখন সাধারনত যাদের আমরা খরগোশ বলি, তারা সেই রুপ থেকে এতটাই সরে যায় যে, তারা একটি ভিন্ন নামের দাবী রাখে। ’চিরস্থায়ী খরগোশত্ব’ বলে কিছু নেই, মুল বৈশিষ্ট মন্ডিত কোন খরগোশ নেই আকাশে, শুধু আছে লোমশ, লম্বা কানের, কপরোফ্যাগাস (যারা অন্যান্য নিরামিশাষী অন্য প্রানীদের মল খায়), গোফ নাচানো খরগোশদের জনসংখ্যা ছাড়া, যারা নানা আকার আয়তন, রঙ এবং আচরনের পরিসংখ্যানগত বিস্তার প্রদর্শন করে। পুরানো বিস্তারে যা দীর্ঘ কান যুক্ত প্রান্ত ছিল তা হয়তো পরবর্তী ভুতাত্ত্বিক বা জিওলজিক্যাল সময়ে একটি নতুন বিস্তারের কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারে। যথেষ্ট পরিমানে বহু সংখ্যক প্রজন্মান্তরে, সেখানে হয়ত পুর্বসুরী প্রজাতিদের বিস্তার এবং উত্তরসুরী প্রজাতিদের মধ্যে বিস্তারের মধ্যে কোন মিশ্রন বা ওভারল্যাপ থাকবে না। পুর্বসুরীদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম কানটি হয়তো উত্তরসুরী প্রজাতির ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘের কানের চেয়েও ক্ষুদ্র হতে পারে। সবকিছুই তরল বা পরিবর্তনশীল, আরেকজন গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস যেমন বলেছিলেন, কোন কিছুই নির্দিষ্ট নয়। শত মিলিয়ন বছর পর বিশ্বাস করা কঠিন হতে পারে উত্তরসুরী এই প্রজাতির কোন সময় পুর্বসুরী প্রজাতি ছিল খরগোশ। কিন্তু তারপরও বিবর্তন প্রক্রিয়ায় কোন প্রজন্মেই কোন প্রজাতির জনসংখ্যায় প্রধান টাইপটি এর আগের প্রজন্মের বা এর পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যাগরিষ্ট বা মোডাল টাইপ অপেক্ষা খুব বেশী ভিন্ন না। এইভাবে চিন্তা করার প্রক্রিয়াকেই মায়ার বলেছিলেন, পপুলেশন থিংকিং। পপুলেশন থিঙকিং, তার মতে, এসেন্শিয়ালিয়ালিজম এর অ্যান্টিথিসিস। স্বান্তনার অযোগ্য সময় পরে একজন ডারউইন এর দৃশ্যে আসার কারন-আমরা সবাই, হতে পারে গ্রীকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বা অন্য কোন কারনে, আমাদের মানসিক ডিএনএতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে লেখা ছিল এই এসেন্শিয়ালিজম।
প্লেটোবাদী পট্টি দিয়ে ঢাকা মনে, একটি খরগোশ হচ্ছে একটি খরগোশ হচ্ছে একটি খরগোশ; এমন কোন কিছু যদি প্রস্তাব করা হয়, খরগোশজাত আসলে চলমান মেঘের মত পরিবর্তনশীল পরিসংখ্যানগত গড়পড়তার বৈশিষ্ট সম্পন্ন বা বর্তমানে দেখা খরগোশ এক মিলিয়ন বছর আগের বা পরের কোন গড়পড়তা খরগোশ থেকে যে ভিন্ন হতে পারে, বিষয়টা মনে হয় একটি অন্তস্থ ট্যাবু বা প্রতিষিদ্ধকে লঙ্ঘন করে। আসলেই, মনোবিজ্ঞানীরা যারা ভাষার ডেভোলপমেন্ট নিয়ে গবেষনা করেন তারা বলছেন,শিশুরা মুলত প্রাকৃতিকভাবেই এসেন্শিয়ালিস্ট। হয়তো তাদের তা হতে হয় মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে, যখন তাদের পরিণত হবার প্রক্রিয়ায় মন বিভিন্ন জিনিসকে শ্রেনীবিন্যস্ত করার চেষ্টা করে আলাদা আলাদা শ্রেনীতে,যাদের প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট নাম বাচক বিশেষ্যর প্রয়োজনীয়তা আছে। অবাক হবার কোন কারন নেই, জেনেসিসের পুরাণ কাহিনীতে অ্যাডামের প্রথম কাজই ছিল সব প্রানীদের নামকরণ করা।
মায়ারের মতে এজন্য অবাক হবার মত কিছু নেই কেন উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাদের ডারউইনের জন্য। নাটকীয়ভাবে যদি বলতে চাই বিবর্তন কত বেশী এসেন্শিয়ালিজম বিরোধী তাহলে এটি বিবেচনা করুন: জনসংখ্যা ভিত্তিক বা ’পপুলেশন থিংকিং’ এর বিবর্তনীয় দৃষ্টি ভঙ্গীতে, প্রতিটি প্রানী অন্য প্রতিটি প্রানীর সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমন,খরগোশ আর চিতাবাঘ, মধ্যবর্তী একটি অসংখ্য পজাতির সুদীর্ঘ শৃঙ্খল দ্বারা তারা যুক্ত,যে শৃঙ্খলে পাশাপাশি থাকা প্রজাতিগুলো পরস্পরের সাথে এত বেশী সদৃশ্যতা বহন করে যে, শৃঙ্খলটির প্রতিটি সংযুক্তিকে প্রতিনিধিত্বকারী প্রানীরা এই শৃঙ্খলে তাদের নিকটবর্তী প্রতিবেশী প্রানীর সাথে নীতিগতভাবে প্রজননক্ষম, যা প্রজননক্ষম পরবর্তী প্রজন্ম তৈরী করে। এসেন্শিয়ালিষ্টদের প্রতিষিদ্ধকে এর চেয়ে ভালোভাবে আর লঙ্ঘন করা সম্ভব না। আর এটা কিন্তু কোন অস্পষ্ট, শুধু কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ চিন্তার পরীক্ষা না। বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে, আসলেই মধ্যবর্তী প্রানীদের একটি শৃঙ্খল বা ধারা খরগোশ আর চিতা বাঘদের যুক্ত করেছে, যাদের প্রত্যেকেরই অস্তিত্ব ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন প্রজাতিদের সুদীর্ঘ এই ক্রম পরম্পরার ধারাবাহিকতায় তাদের প্রত্যেককেই তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রজাতির সাথে একই শ্রেনীতে বিন্যস্ত করা যাবে। আসলেই পুরো এই ধারাবাহিকতায় এর একপাশের নিকটতম প্রতিবেশী প্রজাতির সন্তান এর অপর পাশের নিকটতম প্রতিবেশী প্রজাতির পিতামাতা। তারপরও এই পুরো ধারাটি খরগোশ এবং চিতাবাঘ এর মধ্যে তৈরী করেছে একটি অবিচ্ছিন্ন বন্ধন; যদিও, আমরা পরে দেখবো কখনোই এমন কোন প্রজাতি ছিলনা যাকে বলা যেতে পার ‘ রাবিপার্ড’ ( খরগোশ চিতাবাঘের মিশ্রন); একই রকম সেতুবন্ধন আছে খরগোশ থেকে ওমব্যাট কিংবা চিতাবাঘ থেকে লবস্টার অবধি, প্রতিটি প্রানী প্রজাতি এবং উদ্ভিদ প্রজাতির পরস্পরের মধ্যে। আপনি সম্ভবত নিজেই যুক্তি দিয়ে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন বিবর্তনীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে কেন আমরা এই বিস্ময়কর উপসংহারে উপনীত হই। যাইহোক আমি বরং বিষয়টা স্পষ্ট করি, আমি এর নাম দেব, হেয়ার পিন বা চুলের কাটা চিন্তার পরীক্ষা (হেয়ার পিনের U আকৃতিটি মনে রাখুন)।
একটা খরগোশ কল্পনা করুন, যে কোন স্ত্রী খরগোশ (কাল্পনিকভাবে আপাতত স্ত্রী লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি সুবিধার জন্য, অন্য লিঙ্গ হলেও যুক্তিটির কোন হের ফের হোতো না; এবার তারপাশে তার মা কে রাখুন, এবার মার পাশে তার নানীকে রাখুন, এরপর তার নানীর মা, এভাবে সময়ে পিছনের দিকে যেতে থাকুন, অনেক অনেক বছর অতীতের দিকে, আপাতদৃষ্টিতে প্রায় অসীম যার শেষ নেই এমন দীর্ঘ স্ত্রী খরগোশদের একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা, প্রত্যেকেই তার মা এবং মেয়ের মধ্যে স্যান্ডউইচ হয়ে আছে, এই সারি অনুসরন ধরে আমরা যদি অতীতের দিকে যেতে থাকি, আমরা একসময় লক্ষ্য করবো, যে প্রাচীনতর খরগোশদের আমরা অতিক্রম করছি তারা সামান্য কিছু ভিন্ন আমাদের পরিচিত আধুনিক খরগোশদের তুলনায়। এই পরিবর্তনের গতি কিন্তু এতো ধীর যে আমরা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের পরিবর্তনের ট্রেন্ড বা প্রবণতাটা সহজে ধরতে পারবো না, যেমন আমাদের ঘড়ির ঘন্টার কাটার গতিটা আমাদের চোখে পড়ে না এবং কোন শিশুর বড় হয়ে ওঠাটা যেমন আমরা দেখিনা, শুধু মাত্র আমরা পরে দেখতে পারি, শিশুটি কৈশোরে পৌছেছে, আরো পরে একজন পুর্ণবয়স্ক মানুষে রুপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া বাড়তি একটা কারন, কেন আমরা খরগোশদের একপ্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতাটা লক্ষ্য করিনা তা হলো, কোন এক শতাব্দীতে বর্তমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্যারিয়েশন বা ভিন্নতা সাধারনত মা এবং কন্যাদের মধ্যেকার ভিন্নতার চেয়ে বেশী, সেকারনে আমরা যদি রুপকার্থে বলা সেই ঘড়ির ’ঘন্টার কাটার’ গতিটাকে সুস্পষ্ট ভাবে পৃথক করে বোঝার চেষ্টা করি মার সাথে কন্যদের পার্থক্য তুলনা করে অথবা এমনকি নানীদের তাদের নাতনীদের সাথে তুলনা করে। এই ক্ষুদ্র পার্থক্যগুলো যা আমরা হয়তো দেখতে পেতাম, তা আসলে ঢাকা পড়ে যায় মাঠের মধ্যে আনন্দে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করা খরগোশদের অন্য বন্ধু আর আত্মীয়দের মধ্যে আরো বেশী ভিন্নতার আড়ালে।
তাসত্ত্বেও, আমরা সময়ের ধারায় যতই অতীতে যাবো, ধীরে ধীর, সহজে বোঝা যায় না এমন কিছু পরিবর্তন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ঘটতে থাকে, এবং আমরা এমন পুর্বসুরী প্রানীদের দেখতে পাবো, যারা ক্রমান্বয়ে কম খরগোশ সদৃশ হতে থাকবে এবং শ্রিউ (Shrew,এক ধরনের ইদুর সদৃশ প্রানী) সদৃশ ( বা এমন কিছু যা কোনটারই সদৃশ নয়) হতে থাকে ক্রমান্বয়ে। এই ধরনের প্রানীদের কোন একটিকে আমি বলবো হেয়ার পিন বেন্ড (চুলের কাটার বাকানো অংশ), এর কারনটি স্পষ্ট হবে সময়ক্রমে। এই প্রানীটি হবে সবচেয়ে নিকটবর্তী অতীতের কমন পুর্বসুরী প্রানী (এই স্ত্রী খরগোশদের ধারায়, কিন্তু সেটা জরুরী না), যা খরগোশ এবং চিতাবাঘ দুই লিনিয়েজ এর যোগসুত্রে দাড়িয়ে। আমরা ঠিক জানিনা এরা কেমন দেখতে ছিল, বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই এর অস্তিত্ব ছিল এবং সব প্রানীদের মতই, এটিও তার মা ও কন্যার মত একই প্রজাতির সদস্য। আরো পেছনে আমরা হাটতে থাকি, শুধু এখানে চুলের কাটা বা হেয়ার পিন এর বাকা জায়গায় দিক আমরা পরিবর্তন করছি এবং এবার সময়ের সাথে হাটছি চিতা বাঘদের দিকে (যেহেতু হেয়ার পিনে অসংখ্য এবং বিচিত্র উত্তরসুরী প্রানীদের বংশধারার উদ্ভব হয়েছে, আমরা ক্রমাগতভাবে যখন প্রজাতির দ্বিবিভাজনের রাস্তায় আসবো, এবং আমাদের সেই মোড়গুলোতে বেছে নিতে হবে যে রাস্তাগুলো আমাদের চিতাবাঘের বংশধারার দিকে নিয়ে আসবে); এবার আমাদের সম্মুখ যাত্রায় প্রতিটি শ্রিউ সদৃশ্য প্রানীর লাইনে পরবর্তী প্রানিটি হবে তার কন্যা এবং ধীরে ধীরে, খুব সহজে অনুভুত হবে না এমন পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ্ই শ্রিউ সদৃশ্য প্রানীও বিবর্তিত হবে নানা অন্তবর্তীকালীন প্রজাতির ধারাবাহিকতায়, যারা কোন আধুনিক প্রানীদের সাথে সদৃশ নাও হতে পারে, তবে বংশধারার ধারায় তারা পাশাপাশি প্রজন্মের প্রানীদের সাথে অনেকবেশী সদৃশ্য। এভাবে খানিকটা স্টোটদের (Stoat) মত অন্তবর্তীকালীন প্রানীদের এই ধারায় অতিক্রম করার পর কোন ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন চোখে না পড়া ছাড়াই ধীরে ধীরে আমরা এই লাইনে চিতাবাঘের কাছে পৌছে যাবো।
এই চিন্তার পরীক্ষার ব্যপারে অনেক কিছু বলার আছে; প্রথমত, আমরা খরগোশ থেকে চিতাবাঘের দিকে হাটার পথ বেছে নিয়েছি, কিন্তু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি,আমরা সজারু থেকে ডলফিনও বেছে নিতে পারতাম, ওয়ালাবি থেকে জিরাফ কিংবা মানুষ থেকে হ্যাডক। মুল বিষয়টি হলো, যে কোন দুটি প্রানীর জন্য অবশ্য হেয়ার পিনের মত একটা পথ থাকে যা তাদের সংযোগ করছে, কারন প্রতিটি প্রজাতি কোন একটি প্রানীকে তাদের পুর্বসুরী হিসাবে অন্য সব প্রজাতির সাথে ভাগাভাগি বা শেয়ার করে। আমাদের শুধু অতীতমুখী হয়ে সেই পথটা অনুসরণ করতে হবে, এক প্রজাতি থেকে তাদের ভাগ করে নেয়া সাধারন পুর্বসুরী প্রানীর দিকে, এরপর হেয়ার পিনের বাক টা ধরে অন্য প্রজাতির দিকে সামনে আগাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লক্ষ্য করুন আমরা শুধু সীমাবদ্ধ আছি সেই প্রানীদের শৃঙ্খলকে শনাক্ত করতে যা একটি আধুনিক প্রানীকে আরেকটি আধুনিক প্রানীর সাথে সংযুক্ত করছে; আমরা অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে কোন খরগোশ থেকে চিতাবাঘের বিবর্তিত হবার কথা বলছি না। এই চিন্তার অনুশীলনীর প্রেক্ষাপটে আপনি হয়তো বলতে পারেন আমরা পেছন দিকে বিবর্তিত বা ডিইভোলভ হচ্ছি হেয়ার পিন এর বাক পর্যন্ত তারপর সামনের দিকে বিবর্তিত হচ্ছি সেখান থেকে চিতাবাঘের দিকে। পরবর্তী অধ্যায়ে দেখবো কেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা জরুরী, বার বার……আধুনিক প্রজাতি থেকে আধুনিক কোন প্রজাতির বিবর্তন হচ্ছেনা। তারা শুধু কমন কোন পুর্বসুরীকে শেয়ার করে অতীতের কোন একটি সময়ে। তারা আসলে কাজিন, এটাই, আমরা পরবর্তীতে দেখবো, সবচেয়ে অসস্থিকর একটা অভিযোগটির উত্তর: ’যদি মানুষ শিন্পান্জি থেকে বিবর্তিত হয়, তাহলে কেন এখন শিম্পান্জি আছে’?
তৃতীয়, হেয়ার পিনের সেই (পুর্বসুরী প্রানী) থেকে আমাদের সন্মুখ যাত্রায় আমরা কোন পুর্বপরিকল্পনা ছাড়াই বেছে নিয়েছি সেই পথ যা চিতাবাঘের দিকে আমাদের নিয়ে যাবে। বিবর্তন ইতিহাসের এটা প্রকৃত পথ। আমরা অসংখ্য শাখা প্রশাখা আর পথকে সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছি, কিন্তু-একটা গুরুত্বপুর্ন যে পয়েন্টটাকে আমি আবার পুণরাবৃত্তি করছি- যে সব পথ দিয়ে গেলে আমরা অগনিত বিবর্তনীয় শেষ বিন্দুতে পৌছাতে পারতাম, কারন হেয়ার পিন এর বাকের প্রাণীটি শুধুমাত্র খরগোশ বা চিতাবাঘের আদি পুর্বসুরী প্রানীনা, বেশ বড় অংশের আধুনিক স্তন্যপায়ীদের উত্তরসুরীও বটে।
চতুর্থ বিষয়টি, যা আমি আগেই জোর দিয়েছি, তা হলো, এই হেয়ার পিন এর দুই প্রান্তের প্রজাতির মধ্যে যতই বিশাল পার্থক্য থাকুক না কেন –খরগোশ এবং চিতাবাঘ- এদের যুক্ত করা প্রজাতির শৃঙ্খলে প্রজাতির প্রতিটি সদস্য এই শৃঙ্থলে তার নিকটবর্তী প্রতিবেশী সদস্যদের অনুরুপ, মা এবং মেয়ের যেমন হওয়া উচিৎ। এবং আমি আগে উল্লেখ করেছিলাম, সেই প্রজাতির জনগোষ্ঠীর অন্যান্য টিপিক্যাল সদস্যদের চেয়ে এই শৃঙ্খলে তাদের নিকটবর্তী সদস্যের সাথে আরো বেশী সদৃশ্য।
আপনি দেখতে পাচ্ছেন এই চিন্তার এক্সেপেরিমেন্ট প্লেটোনিক আদর্শ ফর্মের অভিজাত গ্রীক মন্দিরের ধারনা অসারতা কিভাবে প্রমান করছে। এবং আপনি বুঝতে পারবেন কিভাবে, যদি মায়ার এর ধারনা সঠিক হয়ে থাকে;মানবজাতির মধ্যে এসেন্শিয়ালিজম এর প্রাকধারনার সুবিশাল প্রভাব বিদ্যমান, এবং মায়ার হয়তো ঠিক বলেছিলেন আমরা কেন ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তনকে হজম করতে পারিনা।
এই এসেন্শিয়ালিজম শব্দটার জন্ম কিন্তু ১৯৪৫ এর আগে হয়নি, সুতরাং ডারউইনের জানা ছিলনা। কিন্তু তিনি প্লেটোর এই মতবাদের জীববিজ্ঞানীয় সংস্করণটি সম্বন্ধে ভালোই জানতেন, ইমমিউটেবিলিটি অ্ফ স্পিসিস; বা প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতা’, এবং তার সব প্রচেষ্টার একটা বড় অংশই এর সাথে যুদ্ধ করতেই অতিবাহিত হয়েছে। আসলে ডারউইনের বেশ কটি বই পড়লে,‘অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ থেকে বরং বেশী অন্যগুলো– ভালো করে বুঝতে পারা যায়, কি বিষয়ে তিনি কথা বলছেন,যদি বিবর্তন সম্বন্ধে আধুনিক প্রাকধারনা থেকে কেউ মনকে মুক্ত করতে পারেন এবং মনে রাখতে হবে তার পাঠকের একটা বিশাল অংশই ছিল এনেন্শিয়ালিস্ট যারা কখনোই প্রজাতির অপরিবর্তিনশীলতাকে সন্দেহ করেননি। প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতা ধারনার বিরুদ্ধে ডারউইনের সবচে জোরালো প্রমান ছিল ডোমেস্টিকেশন বা গৃহপালিতকরণ প্রক্রিয়া এবং এই গৃহপালিতকরন প্রক্রিয়াটাই ববে এই অধ্যায়ের বাকী অংশের মুল বক্তব্য।
((((((((চলবে))))))))))))))))))))))))))))))











