রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ: প্রথম অধ্যায়, শেষ পর্ব

(রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ: অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
প্রথম অধ্যায়: শুধু কি একটি তত্ত্ব? 
প্রথম পর্ব
 দ্বিতীয় পর্ব 
তৃতীয় পর্ব 
শেষ পর্ব

এবার সময় এসেছে ‘’’ফ্যাক্ট’ এর আভিধানিক অর্থটা পরীক্ষা করে দেখার। অক্সফোর্ড ইংলিশ অভিধান যা বলছে ( আবারও একাধিক সংজ্ঞা, যেখানে একটি প্রাসঙ্গিক):

ফ্যাক্ট: এমন কিছু যা সত্যিই ঘটেছে বা বাস্তবিকভাবেই এটাই সেই বিষয়;এমন কিছু যা নিশ্চিৎভাবে জানা আছে এই প্রকৃতির;অতএব একটি নির্দিষ্ট সত্য যা প্রকৃত পর্যবেক্ষনের বা খাটি স্বাক্ষ্যপ্রমানের মাধ্যমে প্রাপ্ত;যা শুধুমাত্র অনুমানসিদ্ধ কোন কিছু, বা ধারনা কিংবা কাহিনীর সম্পুর্ন বীপরিত;একটি অভিজ্ঞতালব্ধ উপাত্ত,যা কিনা এর উপর নির্ভর করে কোন ধারনা করা উপসংহারগুলোর থেকে পৃথক।

লক্ষ্য করুন,থিওরাম এর মত,ফ্যাক্ট এই অর্থে প্রমানিত গানীতিক থিওরেম এর মত কোন অনমনীয় অবস্থানে নেই,;গানিতীক থিওরেম, একগুচ্ছ ধরে নেয়া অ্যাক্সিওম বা স্বতঃসিদ্ধ ধারনা থেকেই অবধারিতভাবে আসছে। এছাড়া ’সত্যিকারের পর্যবেক্ষন’ এবং ’খাটি স্বাক্ষ্যপ্রমান’ ভয়ঙ্করভাবে ভ্রমপ্রবন হতে পারে এবং বিচারের আদালতে অযোগ্যভাবেই বাড়তি মর্যাদাপ্রাপ্ত।  বেশ কিছু মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এ বিষয়ে আমাদের বিস্ময়কর সব উদহারন দিয়েছে,যা বিচারকার্যে বসা যে কোন জুরির কোন স্বাক্ষীর ‘চাক্ষুষ প্রমানের’ প্রতি বাড়তি মর্যাদা দেয়ার ব্যপারে চিন্তায় ফেলে দেবে। ইলিনোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ডানিয়েল জে সিমন্স এ বিষয়ে একটি বিখ্যাত উদহারন প্রস্তুত করেছিলেন,ছয় জন তরুন তরুনী গোল করে দাড় করিয়ে পরস্পরের দিকে ছোড়ার জন্য একজোড়া বাস্কেটবল দেয়া হয়েছিল, মুলত: বলটি তারা নিজেদের মধ্যে আদান প্রদান করবে,এই বিষয়টি নিয়ে ২৫ সেকেন্ড এর একটি ভিডিও তৈরী করা হয় [৩]; এবং আমরা,যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী,তাদেরকে এই ফিল্মটি দেখানো হয়। যারা খেলছিল তারা বৃত্ত থেকে বের হচ্ছিল আবার ঢুকছিল. এছাড়াও নিজেদের মধ্যে জায়গাও পরিবর্তন করেছে বল ছুড়ে দিতে দিতে বা ধরতে ধরতে। সুতরাং দৃশ্যটি বেশ জটিল হয়ে ওঠে একসময়। এটি দেখানোর আগে দর্শকদের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়, একটি কাজ করার জন্য যা আমাদের পর্যবেক্ষন ক্ষমতার পরীক্ষা করবে। আমাদেরকে গুনতে হবে মোট কয়বার বলটি একজন থেকে আরেকজনের কাছে ছোড়া হয়েছে। ভিডিওটি দেখা শেষে,সবাই তাদের পর্যবেক্ষন করা আনুমানিক একটি মোট সংখ্যা সবাই লিখে দেয়,কিন্তু- দর্শকদের জানা ছিলনা,এটাই আসল পরীক্ষা ছিলনা।

ছবিটি দেখানোর পর,এবং সবার থেকে সংখ্যা জোগাড় করার পর,পরীক্ষক তার আসল বোমাটা ফাটালেন: আপনাদের মধ্যে কয়জন গরিলাটিকে দেখেছেন? বেশীর ভাগ দর্শকই খুব বিস্মিত হয়,কোন উত্তর দিতে পারেননা। এরপর আবার ভিডিওটি দেখানো হয়,এবার দর্শকদের কোন কিছু না গুনতে বলে আরাম করে দেখতে বলেন;দেখা গেল ঠিক ৯ সেকেন্ড এর মাথায় গরিলার স্যুট পরা একজন নির্বিকারভাবে এই তরুনতের বল দেয়া নেয়ার বৃত্তের মধ্যে ঢোকে এবং একটু থেমে ক্যামেরার দিকে তাকায়,বুকে জোরে থাপ্পড় মারে যেন চাক্ষুষ প্রমানের প্রতি একধরনে যু্দ্ধংদেহী ঘৃনা প্রকাশ করছে এবং তার পর ঠিক একই ভাবে ভাবলেশহীন ভাবে বৃত্ত থেকে বের হয়ে যায়। প্রায় নয় সেকেন্ড ধরে এটি দর্শকদের চোখের সামনে ছিল. যা ভিডিওটির এক তৃতীয়াংশ দৈর্ঘ,অথচ বেশীরভাগ দর্শকেই তা দেখেননি; বিচারের আদালতে তারা হলফনামাও দিতে পারতেন গরিলা স্যুট পরা কোন মানুষ সেই ভিডিওতে উপস্থিত ছিল না এবং তারা প্রতিজ্ঞা করে বলতে পারে তারা এই ২৫ সেকেন্ড অতিরিক্ত মনোযোগের সাথে ভিডিওটি দেখেছিরলেন; কারন তারা বল পাস করার সংখ্যাই মনোযোগ দিয়ে গুনছিলেন। এধরনের আরো বেশ কিছু পরীক্ষাও হয়েছে, একই ধরনের ফলাফলও সেখানে পাওয়া গেছে, দর্শকদের যখন সত্যটা জানানো হয়েছে তারা একই ভাবে হতভম্ব হয়েছেন অবিশ্বাসে।’ চাক্ষুশ স্বাক্ষ্যপ্রমান’, ’সত্যিকারের পর্যবেক্ষন’, ’অভিজ্ঞতার একটি উপাত্ত’ সবগুলোই হতাশাজনকভাবে অনির্ভরযোগ্য বা অনির্ভরযোগ্য হতে পারে। এবং অবশ্যই এই আন্তঃপর্যবেক্ষক অনির্ভরযোগ্যতার বিষয়টিকে স্টেজ এ জাদুকরটা ব্যবহার করে তাদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করার নানা ধরনের পরিকল্পিত কৌশল দিয়ে।


ছবি: আমাদের মধ্যে গরিলা; অসংখ্য মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার একটি, অধ্যাপক ড্যানিয়েল জে সিমন্স এর বিখ্যাত গরিলা এক্সপেরিমেন্ট (২০০৫); যা চাক্ষুষ বা আই উইটনেস স্বাক্ষ্যপ্রমানের অনির্ভরযোগ্যতার বিস্ময়কর প্রমান যুগিয়েছে।

ফ্যাক্ট এর আভিধানিক সংজ্ঞা বলছে, ’প্রকৃত পর্যবেক্ষন’ বা ’খাটি স্বাক্ষ্যপ্রমান’, প্রাপ্ত;যা শুধুমাত্র অনুমানসিদ্ধ কোন কিছু, বা ধারনা কিংবা কাহিনীর সম্পুর্ন বীপরিত ( জোর দেয়া হয়েছে এখানে);  এখানে প্রস্তাবিত ’শুধুমাত্র’ শব্দটি ব্যবহার করাটা খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক। কারন সতর্ক অনুমানসিদ্ধ উপসংহার ’প্রকৃত পর্যবেক্ষনের’চেয়ে নির্ভরযোগ্য হতে পারে, এটা মেনে নিতে আমাদের ইনটুইশন বা  স্বজ্ঞা যতই এর বিরোধীতা করুক না কেন। আমি নিজেও হতবাক হয়েছি সিমনস এর ভিডিততে গরিলাকে না দেখতে পারে এবং সত্যি অবিশ্বাস্য লেগেছে যখন দেখেছি ভিডিওতে আসলেই গরিলাটি ছিল। দ্বিতীয়বার দেখার পর খানিকটা বিষন্ন, তবে বুঝতে পেরেছি, আমি আর ভবিষ্যতে কখনোই ‘চাক্ষুষ প্রমান’ এর উপর, পরোক্ষ বৈজ্ঞানিক উপসংহারের চেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করতে অতিউৎসাহী হবো না। এই গরিলা ফিল্মটি বা এরকম কিছু হয়তো সব জুরিকে দেখানো উচিৎ যখন তারা রায় নিয়ে ভাববে। সব বিচারককেও তাই করা উচিৎ।

স্বীকার করতেই হবে যে, অনুমান নির্ভর উপসংহার শেষ পর্যন্ত্ আমাদের ইন্দ্রিয়নির্ভর পর্যবেক্ষনের উপর ভিত্তি করেই করতে হয়। যেমন, ডিএনএ অনুক্রম করার মেশিণ থেকে প্রিন্টআউট দেখতে আমাদের চোখকে ব্যবহার করি, কিংবা সেটা হতে পারে বৃহৎ হ্যাড্রন  কোলাইডার এর প্রিন্টআ‌উট। কিন্তু -সব স্বজ্ঞার বীপরিত-কোন একটি অভিযুক্ত ঘটনা ( যেমন কোন হত্যাকান্ড) চাক্ষুষ পর্যবেক্ষিত হয়েছে কিভাবে ঘটেছে, তা কিন্তু এর পরোক্ষ প্রমানের চেয়ে আবশ্যিকভাবে বেশী নির্ভরযোগ্যতা বহন করে না ( যেমন রক্তের দাগের মধ্যে ডিএনএ প্রমান)-ঘটনার উপসংহারে পৌছানোর সুচারুভাবে পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় যদি এটিকে ব্যবহার করা হয়। ভুল কাউকে শনাক্ত করার সম্ভাবনা বেশী থাকে চাক্ষুষ প্রমানের ক্ষেত্রে, যা ডিএনএ প্রমান থেকে প্রাপ্ত পরোক্ষ উপসংহারের ক্ষেত্রে থাকে না। এবং এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা দরকার, হতাশাজনকভাবে সুদীর্ঘ তালিকা আছে, যারা চাক্ষুষ প্রমানের ভিত্তিতে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তারা নির্দোষ প্রমানিত হয়ে মুক্তি লাভ করে- কখনো বহু বছর পরে, নতুন ডিএনএ প্রমানের ভিত্তিতে। শুধু টেক্সাসেই ৩৫ জন ভুল ভাবে দোষী সাব্যস্ত মানুষ কোর্টে ডিএনএ প্রমান ‍গৃহীত হবার পর নির্দোষ প্রমানিত হয়, এবং এই সংখ্যা শুধু যারা এখনও বেচে আছে তাদের মধ্যেই [৪]; টেক্সাস যে উৎসাহে এবং দ্রুততার সাথে মৃত্যুদন্ড আইন প্রয়োগ করে ( গভর্নর থাকাকালীন সময়ে জর্জ ডাবলিউ বুশ গড়ে প্রতি পনেরো দিনে একজনের মৃত্যুদন্ডের আদেশে সই করেছেন[৫]), আমরা ধরে নিতে পারি সেই সময়ে যদি ডিএনএ প্রমানের ব্যবস্থা থাকতো, মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হওয়া আরো অনেকেই হয়তো নির্দোষ প্রমানিত হতেন।

এই বইটি এধরনের অনুমানসিদ্ধ উপসংহার বা ইনফারেন্স গুরুত্বর সাথে বিবেচনা করবে, শুধু অনুমান নির্ভর নয়, বরং সঠিক প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক অনুমানসিদ্ধ উপসংহার। এবং আমি বইটিতে আমি দেখাবো বিবর্তন যে একটি ফ্যাক্ট বা সত্য, এই ইনফারেন্সের বিতর্কাতীত শক্তি। অবশ্যই বিবর্তনীয় পরিবর্তনের সুবিশাল একটি অংশ সরাসরি চাক্ষুষ প্রমানের পর্যবেক্ষনের কাছে অদৃশ্য। এর বেশীর ভাগই ঘটে গেছে যখন আমাদের জন্মই হয়নি। এছাড়াও এর অতি ধীরগতির কারনে কারো সংক্ষিপ্ত জীবনকালে এটি চাক্ষুষ দেখাও সম্ভব না। একই ভাবে আফ্রিকা আর দক্ষিন আমেরিকার ক্রমশ একে অপরের কাছ থেকে অবিশ্রান্তভাবে দুরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়ার বিষয়টি সত্য, এতো ধীরে যা ঘটছে, আমাদের নজরে তা পড়বে না। কন্টিনেন্টাল ড্রিফট এর মতই বিবর্তনের ক্ষেত্রেও ঘটনার পরের উপসংহারই আমাদের কাছে ঘটনার প্রমান বহন করছে, সুস্পষ্ট কারনেই এই ঘটনা ঘটে যাবার আগ পর্যন্ত আমাদের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু এক ন্যানো সেকেন্ডের জন্যও এই ইনফারেন্সের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। আফ্রিকা এবং দক্ষিন আমেরিকার ধীরে ধীরে এই ব্যবধান বৃদ্ধির ব্যপারটা প্রতিষ্ঠিত একটি সত্য, সাধারন ভাষায় ফ্যাক্ট বলতে যা বোঝায়, তেমনই ফ্যাক্ট হচ্ছে, সজারু আর ডালিমের এবং  আমারা একই সাধারণ বংশের ইতিহাস বহন করছি।

আমরা হচ্ছি সেই গোয়েন্দাদের মত, যারা অপরাধ ঘটে যাবার পরেই অপরাধের ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। খুনীর করা অপরাধ ততক্ষনে অতীতের অংশ, গোয়েন্দাদের কোন উপায় থাকে আসল ঘটনাকে স্বচক্ষে দেখবার। যাই হোক না কেন, গরিলার সেই ভিডিও পরীক্ষা এবং আরো এরকম কিছু উদহারন আমাদের শিখিয়েছে আমাদের নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে। গোয়েন্দারা যা পায় সেটা হলো ঘটনার কিছু অংশ, যা রয়ে গেছে সেই দৃশ্যে, এবং সেই সব কিছুর উপর অনেকটুকুই ভরসা করা যেতে পারে। সেখানে পায়ের চিহ্ন আছে, হাতের চিহ্ন আছে (এবং ইদানীং ডিএনএ র অনন্য চিহ্নও আছে), রক্তের দাগ, চিঠিপত্র, ডায়েরী।  এটা এবং এটা যদি ইতিহাস হয় তাহলে পৃথিবী যেমনটা হওয়া উচিৎ পৃথিবী তেমন, কিন্তু ওটা এবং ওটা, অন্য ইতিহাস এই বর্তমানকে ব্যাখ্যা করে না।

থিওরী শব্দটির দুটির আভিধানিক অর্থ অসেতুবন্ধনযোগ্য কোন মহাবিভাজন নয়, অনেক ঐতিহাসিক উদহারনই তা প্রমান করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে থিওরামের জন্ম হয় শুধুমাত্র হাইপোথিসিস দিয়েই। যেমন কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্টে এর তত্ত্ব,  যার যাত্রা শুরু করেছিল বিদ্রুপ আর প্রতিকুলতার মুখে, তবে ধীরে ধীরে সংগ্রামী এবং কষ্টকর পদক্ষেপে এটি থিওরামের মর্যাদা স্পর্শ করেছে, পরিনত হয়েছে বিতর্কের উর্ধে একটি ফ্যাক্টে। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীতে এটি কোন কঠিন ব্যপার না। অতীতে কিছু বিশ্বাস করা ধারনা আজ যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে ভ্রান্ত কিন্তু তার মানে এই না যে, আমাদের ভয় করতে হবে ভবিষ্যত প্রমান, আমাদের বর্তমান বিশ্বাসকেও ভুল প্রমান করবে। আমাদের বর্তমান বিশ্বাসগুলোর ঠিক কতটুকু প্রবনতা আছে মিথ্যা হবার, অনেক কিছুর মধ্যে তা নির্ভর করছে, কত মজবুত প্রমানের ভিত্তিতে এখন তা দাড়িয়ে আছে। মানুষ একসময় চিন্তা করেছে, সুর্য পৃথিবীর চেয়ে ছোট, কারন তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমান ছিল না। এখন আমাদের কাছে প্রমান আছে, যা আগে ছিল না, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমান করছে সুর্যের আকারের বিশালতা, এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে পারি, এই প্রমান কখনোই মিথ্যা প্রমানিত হবে না। এটি কোন সাময়িক হাইপোথিসিস না, যা আপাতত: টিকে আছে মিথ্যা প্রমান করতে না পারা ব্যর্থতার উপর। বহু কিছু সম্বন্ধেই আমাদের বর্তমান বিশ্বাসের অনেক কিছুই মিথ্যা প্রমানিত হতে পারে, কিন্তু আমরা পুর্ন আত্মবিশ্বাসের সাথে কিছু নির্দিষ্ট ফ্যাক্ট বা সত্যের তালিকা তৈরী করতে পারবো যা কখনোই মিথ্যা প্রমানিত হবে না। বিবর্তন আর সুর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব সেই তালিকায় সবসময় না থাকলেও এখন তারা সেই তালিকায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে।

জীববিজ্ঞানীরা অনেক সময়ই বিবর্তনের ’ফ্যাক্ট’ ( সকল জীবিত প্রানী সম্পর্কযুক্ত) এবং যে ’ থিওরী বা তত্ত্ব’ বলছে কিভাবে এই প্রক্রিয়াটি চালিত হয় ( সাধারনদ: এটা বলতে তারা বোঝান প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং হয়তো এর সাথে প্রতিদ্বন্দী কিছু তত্ত্ব, যেমন লামার্কে ’ব্যবহার এবং অব্যবহার’ তত্ত্ব এবং ’ অর্জিত বৈশিষ্টের  উত্তরাধিকার’ তত্ত্ব) এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করেন।  ডারউইন নিজে কিন্তু দুটিকেই থিওরী হিসাবে ভেবেছিলেন, পরীক্ষামুলক হাইপোথিসিস নির্ভর আনুমানিক ধারনা হিসাবে। কারন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে পাওয়া প্রমান গুলো যথেষ্ট ছিল না এবং তখনও সন্মানিত কোন বৈজ্ঞানি, বিবর্তন আর প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে একে আর প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই, বিবর্তনের ফ্যাক্ট নিয়ে আর কোন তর্ক করারও উপায় নেই- এটি এখন একটি থিওরাম বা সুস্পষ্টভাবে সমর্থনপ্রাপ্ত একটি ফ্যাক্ট বা বাস্তব সত্য। এবং এখনও যেখানে ( সামান্য) বিতর্ক করা যেতে পারে, সেটা হলো,  প্রাকৃতিক নির্বাচনই কি এর একমাত্র প্রধান চালিকা শক্তি কিনা ।

ডারউইন তার আত্মজীবনীতে ব্যাখ্যা করেছিলেন[৬], কিভাবে ১৮৩৮ সালে ম্যালথাসের এর ‘অন পপুলেশন’ বইটি, তার ভাষায় ’আনন্দের জন্য’(যদিও ম্যাট রিডলী সন্দেহ করেন,তার ভাই ইরাসমাস এর খুবই বুদ্ধিমান বন্ধু হ্যারিয়েট ম্যার্টিনোর প্রভাবে [৭]) পড়ার সময় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি সম্বন্ধে অনুপ্রেরণা লাভ করেন, ’এখানেই অবশেষে আমি একটা তত্ত্ব খুজে পাই, যেটা নিয়ে আমি কাজ করতে পারি’; ডারউইনের কাছে প্রাকৃতিক নির্বাচন ছিল একটা হাইপোথিসিস,যা ঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে,বিবর্তনের ব্যাপারেও তার মতামত ছিল প্রায় একই রকম।যা আজ আমরা বিবর্তনের ফ্যাক্ট বলছি. ১৮৩৮ সালে সেটি ছিল একটি হাইপোথিসিস, যার জন্য প্রমান সংগ্রহের প্রয়োজন ছিল। ১৮৫৯ সালে যখন ডারউইন ’অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রকাশ করেন,তিনি বিবর্তনের স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমান জোগাড় করেছিলেন,যদিও তখনও প্রাকৃতিক নির্বাচন বিষয়টি ফ্যাক্ট এর মর্যাদা পাবার পথ ছিল আরো দীর্ঘতর। আসলেই,এই হাইপোথিসিস থেকে ফ্যাক্টের পর্যায়ে এর উন্নতি করাটাই ডারউ্ইনকে তার বিখ্যাত বইটির প্রায় পুরোটা জুড়েই ব্যস্ত রেখেছিলো। এবং সেই উন্নতির প্রক্রিয়া চলেছে বর্তমান পর্যন্ত, আজ, কোন যুক্তিসঙ্গত মনে আর কোন সন্দেহ অবশেষ থাকেনি এবং বিজ্ঞানীরা কথা বলেছেন,অন্ততপক্ষে অনানুষ্ঠানিকভাবে, বিবর্তনের ’ফ্যাক্ট’ নিয়ে। সব সন্মানিত জীববিজ্ঞানীরাই অবশেষে একমত হন, প্রাকৃতিক নির্বাচন এর সবচেয়ে প্রধান চালিকা শক্তি -যদিও কিছু জীববিজ্ঞানী,অন্যদের চেয়ে যারা খানিকটা বেশী দাবী করেন – এটাই একমাত্র চালিকা শক্তি নয়। এমনকি যদিও বলা হয় এটা একমাত্র চালিকা শক্তি নয়, তবে আমি এখনও খুব সিরিয়াস কোন জীববিজ্ঞানীর দেখা পাইনি,’অ্যডাপটিভ বিবর্তন’ -ক্রমশ ইতিবাচক উৎকর্ষের দিকে যে বিবর্তন -তার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি বিকল্প প্রক্রিয়াকে তারা ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন।

এই বইয়ের বাকী অংশে,আমি প্রমান দেবার চেষ্টা করবো যে বিবর্তন একটি অনস্বীকার্য ফ্যাক্ট এবং এর বিস্ময়কর ক্ষমতা,সরলতা আর সৌন্দর্যর মাহাত্ম বর্ণনা করবো। বিবর্তন আমাদের ভিতরে,আমাদের চারপাশে,আমাদের পরস্পরের মধ্যে এবং এর কাজ হাজার মিলিয়ন বছরের অতীতের স্বাক্ষী পাথরের মধ্যে গাথা আছে। যেহেতু আমরা এত দীর্ঘ দিন বেচে থাকি না, যে চোখের সামনে বিবর্তনকে ঘটতে দেখবো, এজন্য এই পরিস্থিতিতে ব্যাখ্যার জন্য সেই গোয়েন্দার রুপকটাই পুনব্যবহার করা যেতে পারে,যিনি ঘটনা ঘটার পর ঘটনাস্থলে এসে এ সংক্রান্ত কোন বিষয়ে অনুমানসিদ্ধ একটি উপসংহারে পৌছান ঘটনাস্থলে পাওয়া নানা আলামত পর্যবেক্ষন এবং পরীক্ষা করে। বিজ্ঞানীদের বিবর্তনের ফ্যাক্টের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যে প্রমানগুলো সহায়তা করেছে, তার পরিমান তুলনামুলকভাবে অনেক বেশী,আরো বেশী নির্ভরযোগ্য এবং যে কোন আইনের আদালতে,যে কোন শতাব্দীতে,কোন অপরাধ প্রতিষ্ঠিত করার কখনো ব্যবহৃত হয়েছে এমন যে কোন ’চাক্ষুষ প্রমান’ এর চেয়েও যা অনেক বেশী বিশ্বাসযোগ্য,আরো বেশী বিতর্কের উর্ধে।

সকল যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের উর্ধে প্রমান? ’যুক্তিসঙ্গত’ সন্দেহ? এটা মনে হয় সবসময়ের জন্যই একটি উনোক্তি।

((((((((((((((((((((((((((প্রথম পর্ব সমাপ্ত , চলবে)))))))))))))))))))))))))))))))))))))

_________________________________

[৩] A famous example was prepared by Professor Daniel J. Simons at the University of Illinois: Simons and Chabris (1999).
[৪]  The Innocence Project, http://www.innocenceproject.org.
[৫]  ‘Bush’s lethal legacy: more executions’, Independent, 15 Aug.2007
[৬]  Darwin, C. 1887a. The Life and Letters of Charles Darwin, vol. 1. London: John Murray
[৭]  Matt Ridley, ‘The natural order of things’, Spectator, 7 Jan. 2009.


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 32 other followers