রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : দ্বিতীয় অধ্যায়, চতুর্থ পর্ব ( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
দ্বিতীয় অধ্যায়, প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়, দ্বিতীয় পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়, তৃতীয় পর্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়, চতুর্থ পর্ব
ধর্মনিরপেক্ষবাদ বা সেক্যুলারিজম, যুক্তরাষ্ট্রের জাতির পিতারা এবং ধর্ম
অনেকটা প্রথাসিদ্ধ ভাবে অনুমান করা হয় অ্যামেরিকা প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতারা ছিলেন ডেইষ্ট বা একাত্মবাদী। সন্দেহ নেই অনেকেও তাই ছিলেন, যদিও বিতর্ক আছে, এদের মধ্যে সবচেয়ে মহান ছিলেন যারা, তারা হয়তো ছিলেন নিরীশ্বরবাদী । সমসাময়িক সময়ের প্রেক্ষাপটে ধর্ম নিয়ে তাদের লেখা পড়লে কোন সন্দেহর অবকাশ থাকে না, যে তাদের বেশীর ভাগই এই সময়ে নিরীশ্বরবাদী চিহ্নিত হতেন। কিন্তু সেই সময়ে তাদের নিজেদের ধর্মবিশ্বাস যাই হোক না কেন, তারা গোষ্ঠিগত ভাবে নিসন্দেহে ধর্মনিরপেক্ষবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এই অংশে আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। শরু করছি ১৯৮১ সালে সিনেটর ব্যারী গোল্ডওয়াটার এর হয়ত একটা চমক লাগানো উদ্ধৃতি দিয়ে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এই অ্যামেরিকার রক্ষণশীলতার নেতা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কত দৃঢ় তার বিশ্বাসে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ধর্মনিরেপেক্ষতান ঐতিহ্য সম্মুন্নত রাখার প্রত্যয়ে:
নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসের মত মানুষের আর তেমন কোন অনঢ় অবস্থান নেই। যীশু অথবা ঈশ্বর অথবা আল্লাহ্ অথবা যে নামেই পরিচিত হোক এই মহাশক্তিশালী সত্ত্বা, যে কোন বিতর্কে এদের মত ক্ষমতাশালী আর কিছুকে মিত্র বলে কেউ দাবী করতে পারেনা। কিন্তু অনেক শক্তিশালী অস্ত্রের মত ঈশ্বরের নাম নিজের পক্ষে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিৎ। আমাদের সারা দেশজুড়ে যে ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিস্তার লাভ করছে তারা তাদের ধর্মীয় প্রভাব খুব একটা বিচক্ষনের মত ব্যবহার করছে না। তারা দেশ পরিচালনাকারী নেতাদের শতকরা একশত ভাগ তাদের অবস্থান অনুসরন করার জন্য জোর খাটাচ্ছে। কারো যদি এইসব ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে নির্দিষ্ট কোন নৈতিক বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হয়, তারা অভিযোগ করে; ভোট কিংবা অর্থ সাহায্য দুটোই প্রত্যাহার করার হুমকি দেয় । আমি আসলেই সারা দেশজুড়ে এইসব রাজনৈতিক ধর্মপ্রচারকদের উপর বিরক্তির চরম সীমায় পৌছে গেছি, যারা নাগরিক হিসাবে আমাকে বলছে, আমাকে নীতিবান মানুষ হতে গেলে আমাকে অবশ্যই এ বি সি এবং ডি কে বিশ্বাস করতে হবে। এরা আসলে নিজেদের কি মনে করে? এবং কেমন করেই বা তারা মনে করে,আমার উপর তারা তাদের নৈতিক মুল্যবোধ চাপিয়ে দেবার অধিকার আছে বলে দাবী করতে পারে; একজন আইনপ্রণেতা হিসাবে আমি আরো ক্ষুদ্ধ হই যখন প্রত্যেকটা ধর্মগোষ্ঠীর হুমকি সহ্য করতে বাধ্য হই, যারা ভাবে তাদের কোন ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার আছে সিনেটের যে কোন অধিবেশনে আমার ভোট নিয়ন্ত্রন করার। আমি তাদের সতর্ক করে দিতে চাই আজ; আমি তাদের সর্বত্র প্রতিরোধ করবো যদি তারা তাদের নৈতিক বিশ্বাস সকল আমেরিকানদের উপর চাপিয়ে দেয় রক্ষণশীলতার দোহাই দিয়ে।(৬)
নিজেদের স্বপক্ষে ইতিহাসকে স্বাক্ষী করার প্রচেষ্ঠায় জাতির পিতাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বর্তমানে আমেরিকায় দক্ষিনপন্হীদের প্রচারকদের কাছে বেশ উৎসাহব্যাজ্ঞক একটি বিষয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতটা আসলে সত্যি, আমেরিকা খৃষ্টানদের দেশ হিসাবে পত্তন হয়নি, প্রথম তা সুষ্পষ্ট উল্লেখিত হয় ত্রিপোলী চুক্তিতে (ট্রিটি অব ত্রিপোলী) , ১৭৯৬ তে যা জর্জ ওয়াশিংটন সময়ে রচনা করা হয়, ১৭৯৭ সালে জন অ্যাডামস যা স্বাক্ষর করেন:
যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সরকার কোন অর্থেই খৃষ্ট ধর্মের উপর ভিত্তি করে স্থাপিত হয়নি, এবং যেহেতু এর মধ্যে মসুলমানদের আইন, ধর্ম, শান্তির বিরুদ্ধে কোন ধরনের শত্রুতা নেই, এবং পূর্বেই বলা হয়েছে মোহাম্মদের অনুসারী কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোন সময়ই কোন যুদ্ধ বা শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করেনি; উভয় পক্ষ ঘোষনা করছে যে,ধর্মীয় মতামতের কারনে উদ্ভুত কোন ঘটনাই দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্কে কখনই কোন বিঘ্নতা সৃষ্টি করবে না।
এই উদ্ধৃতির প্রথমাংশ ওয়াশিংটনের বর্তমান ক্ষমতাশীনদের মধ্যে রীতিমত শোরগোল ফেলে দিত সন্দেহ নেই কোন, কিন্তু এড বাকনার বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমান করেছেন,সেই সময় এ বিষয় নিয়ে না রাজনীতিবিদ কিংবা জনগন,কারো মধ্যে কোন মতবিরোধ দেখা যায়নি [৭]; যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের প্যারাডক্স এবং বিপরীতমুখীতা প্রায়ই দেখা যায়,ধর্মনিরপেক্ষবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দেশটি এখন খৃষ্টজগতের সবচেয়ে বেশী ধর্মনির্ভর রাষ্ট্র, অপরদিকে ইংল্যান্ড, যেখানে প্রতিষ্ঠিত চার্চ-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, সবচাইতে কম ধর্মনির্ভর রাষ্ট্রর মধ্যে একটি । আামি প্রায়ই প্রশ্নটা করি, কেন এমন হলো? এবং এর উত্তর আমার জানা নেই। আমার মনে হয়, সম্ভবত এই পরিস্থিতি হতে পারে: ইংল্যান্ড, ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, তার আন্তবিশ্বাস এবং গোত্রগত ধর্মীয় সহিংসতার ভয়ঙ্কর ইতিহাসে, প্রটেষ্টান্ট আর ক্যাথলিকরা পালাক্রমে প্রাধান্য বিস্তার করে পরস্পরকে হত্যা করেছে। আরেকটি ব্যাখার উৎপত্তি হলো একটি পর্যবেক্ষন, আমেরিকা প্রধানতঃ অভিবাসীদের সৃষ্টি একটি জাতি, এক সহকর্মী আমাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, অভিবাসীরা, ইউরোপে তাদের সম্প্রসারিত পরিবার, সামাজিক নিরাপত্তা আর স্থিতিশীলতা থেকে শিকড়চ্যুত হয়ে প্রবাসে ফেলে আসা স্বজনদের বিকল্প হিসাবে হয়তো চার্চকেই বেশী আপন করে নিতে পারে; অবশ্যই কৌতুহলোদ্দীপক একটা ধারনা যা আরো গবেষনার দাবীদার। কোন সন্দেহ নেই আমেরিকায় অনেকেই তাদের চার্চকে স্থানীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসাবে মনে করে, যার আসলেই সম্প্রসারিত পরিবারের মত বেশ কিছু গুনাবলী আছে। আরো একটি হাইপোথেসিস হলো প্যারাডক্সীয়ভাবে আমেরিকার ধর্মীয় উদ্দীপনার উৎস দেশটির সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। যেহেতু আমেরিকা আইনগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্ম সম্পুর্নভাবে পরিনত হয়েছে স্বাধীন উদ্যোগে; প্রতিদ্বন্দী চার্চগুলো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে কংগ্রেগেশনের আকৃতি বা সদস্য সংখ্যা বাড়াতে, বলাবাহুল্য সেই সাথে মোটা উপার্জনের ও কোন অংশেই কম নয়। এই প্রতিযোগীতা চলে বাজারের আক্রমনাত্মক ক্রয়-বিক্রয়ের বা মার্কেটিং কৌশলের মতই। সাবানের গুড়া বিক্রী যেমন করে চলে, ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও তেমন। আর এর ফলাফল বর্তমানে প্রায় কম শিক্ষিত শ্রেনীর মধ্যে বিস্তৃত ব্যপক আকারের ধর্মীয় উন্মাদনা। অপরদিকে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত চার্চের অভিরক্ষনে ধর্ম সামাজিক আচারের চেয়ে খুব বেশী কিছু না, আদৌ একে ধর্মীয় একটি বিষয় হিসাবে সহজে চিহ্নিত করা যাবে না। গাইলস ফ্রেজার একজন অ্যাংলিক্যান ভাইকার (ধর্মযাজক) ও একই সাথে অক্সফোর্ডে দর্শনের টিউটর, এই ইংরেজ আচারের সুন্দর ব্যাখা দিয়েছিলেন গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি লেখায়, যার শিরোনাম, দি এস্টাবলিশমেন্ট অফ দি চার্চ অব ইংল্যান্ড টুক গড আউট অ্ফ দি রেলিজিয়ন বাট দেয়ার আর রিস্ক ইন মোর ভিগোরাস অ্যাপ্রোচ টু ফেথ:
একটা সময় ছিল যখন গ্রামের ভাইকার ইংরেজী নাটকের নিয়মিত চরিত্র ছিল, এই চা-পানকারী, নীরিহ, ক্ষ্যাপাটে, পালিশ করা জুতা পরা মানুষটা তার ভদ্র ব্যবহার সহ এমন একটি ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করত, যা আদৌ ধর্মপরায়ন না এমন ধরনের মানুষরা তেমন কোন অসস্তি বোধ করত না। তিনি আদৌ ধর্মনাশ হচ্ছে বলে অতিরিক্ত চিন্তিত হতেন না বা আপনাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতেন না, আপনি কি রক্ষা পেতে চান। কোন সর্বশক্তিমান এর পক্ষে চার্চের পালপিট থেকে ধর্মযুদ্ধ শুরু করা বা রাস্তার পাশে বোমা পেতে রাখাতো বহু দুরের কথা।
(বেটজেমান এর ‘আমাদের পাদ্রী’ র ছায়া আছে এই বর্ণনায়, প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে আমি যে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম); ফ্রেজার আরো বলেন যে, এই ভদ্র ভাইকার আসলে এক বিশাল প্রকৃতঅর্থে বিশাল সংখ্যক ইংরেজদের জন্য খৃষ্টধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করেছে। তিনি তার রচনাটি শেষ করেন দুঃখ প্রকাশ করে যে ইদানীং ধর্মকে পুনরায় বেশী গুরুত্ব দেবার প্রবণতা লক্ষ্য করা করা যাচ্ছে এবং তার শেষ বাক্যটি ছিল সাবধানবানী: ‘চিন্তার বিষয় হল, কয়েক শতাব্দী ধরে সুপ্ত ইংরেজদের ধর্মীয় উন্মাদনার দানবটাকে না আমরা আবার প্রাতিষ্ঠানিক বাক্স থেকে মুক্ত করে দেই।’
((((((((((((((((((((((((চলবে)))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))))
[৬]Congressional Record, 16 Sept. 1981.
[৭]http://www.stephenjaygould.org/ctrl/buckner_tripoli.html.










