রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : তৃতীয় অধ্যায়, প্রথম পর্ব ( অনুবাদ প্রচেষ্ঠা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins
: অধ্যায় ৩:
:ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে প্রস্তাবিত কিছু যুক্তি:
ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপনার কোন জায়গা আমাদের কোন প্রতিষ্ঠানে থাকা উচিৎ নয়। টমাস জেফারসন
ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে যুক্তিগুলো বহু শতাব্দী ধরে বিধি হিসাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংকলন করেছেন ধর্মতত্ত্ববিদরা, পরবর্তীতে যেখানে সংযোজন করেছেন অন্যরা, এমনকি ভ্রান্ত ’সাধারন কান্ডজ্ঞানের’ সরবরাহকারীরাও।
টমাস আকোয়াইনাস এর ’প্রমান সমুহ’:
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে টমাস আকোয়াইনাস যে পাচটি ’প্রমান’ দাবী করেছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে, আসলে তারা কিছুই প্রমান করেনা এবং খুব সহজেই -(যদিও বলতে ইতস্ততবোধ করছি, বিশেষ করে তার মতো এমন প্রখ্যাত কারো যুক্তি) -একে শুন্যগর্ভ প্রমান করা সম্ভব। প্রথম তিনটি মুলত একই বিষয়কে তিনবার ভিন্নভাবে বলা হয়েছে – এই তিনটি যুক্তি নিয়ে একসাথে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রত্যেকটি মুলতঃ ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার একটি অনন্ত প্রক্রিয়া বা ইনফিনিট রিগ্রেস -কোন একটি প্রশ্নের উত্তর আরেকটি পূববর্তী প্রশ্নের জন্ম দেয় -এভাবেই চলতে থাকে অনন্তকাল।
১. আনমুভড মুভার বা স্থবির চালিকাশক্তি: কিছুই সচল হতে পারেনা আগে যদি কোন চালক না থাকে। যা আমাদের ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার একটি অনন্ত প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যাবে, যার থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় – ঈশ্বর। কোন না কোন কিছুকে প্রথমে চালকের দ্বায়িত্ব নিতে হয়েছিল আর আমরা সেই প্রথম চালককে বলছি ঈশ্বর।
২. আনকসড কস বা পূর্বকারনহীন কারন: কোন কিছুই নিজে নিজে ঘটে না। প্রত্যেকটি পরিনতির একটি প্রাক কার্য্যকারন আছে, এবং এভাবে আবারো সেই ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার একটি অনন্ত প্রক্রিয়ায় দিকে ঠেলে দেয়া হবে আমাদের। তাই এটাকে শেষ করতে হবে একটি প্রথমতম কারনে, যাকে আমরা বলছি ঈশ্বর।
৩. কসমোলজিকাল আর্গুমেন্ট বা মহাজাগতিক যুক্তি: এমন কোন একটা সময় অবশ্যই ছিল যখন কোন ভৌতপদার্থেরই অস্তিত্ব ছিল না। যেহেতু বর্তমানে ভৌতপদার্থের অস্তিত্ব আছে সেহেতু নিশ্চয়ই কোন অভৌত কিছু ছিল যা বর্তমানে এসবের অস্তিত্ত্বের কারন, যাকে আমরা বলছি ঈশ্বর।
এই তিনটি যুক্তিই নির্ভর করে আছে ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার ধারনা বা ইনফিনিট রিগ্রেস এর উপরে এবং যেখানে ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে এই পশ্চাদগমনকে থামানো হয়। এই যুক্তির সমর্থনকারীরা সম্পুর্ণ অনায্যভাবে যে পূর্বধারনাটি পোষন করে, তা হলো, প্রস্তাবিত ঈশ্বর এই পশ্চাদগমনশীল যুক্তি প্রক্রিয়ার আওতামুক্ত। এমনকি যদি আমরা কাল্পনিকভাবেও কোন অসীম পশ্চাদগমনশীল একাট যুক্তি প্রক্রিয়ায় সমাপ্তকারীর অস্তিত্ত্ব সংক্রান্ত সন্দেহজনক বিলাসিতাকে শুধুমাত্র প্রয়োজনের খাতিরে পশ্রয়ও দেই, সেক্ষেত্রেও কিন্তু কোন কারনই নেই সেই কাল্পনিক সমাপ্তকারীর উপর সেইসব গুনাবলী আরোপ করা, যা আমরা স্বাধারণতঃ ঈশ্বরের উপর আরোপ করে থাকি: সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞতা, দয়াপরায়নতা, সৃষ্টির সৃজনশীলতা, এছাড়াও মানবিক ব্যপারগুলোতো আছেই যেমন, প্রার্থনা শোনা,পাপের ক্ষমা করা এবং গোপন গভীরতম চিন্তা সম্বন্ধে সম্যক ধারনা রাখা। ঘটনাচক্রে যুক্তিবিদদের কিন্তু দৃষ্টি এড়ায়নি যে, সর্বশক্তিমান আর সর্বজ্ঞতা পরস্পর বিরুদ্ধ। যদি ঈশ্বর সর্বজ্ঞ হয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই আগে থেকেই তার জানা আছে যে, তিনি কিভাবে ভবিষ্যতের গতিপথ পরিবর্তন করতে হস্তক্ষেপ করবেন তার অসীম শক্তি দ্বারা। কিন্তু তার মানে, তিনি তার হস্তক্ষেপ সম্বন্ধে কোনভাবেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন না, এর অর্থ দাড়ায় তিনি আসলে সর্বমক্তিমান নন। কারেন ওয়েন এই বুদ্ধিদীপ্ত প্যারাডক্স বা ধাধাকে সমপর্যায়ের আকর্ষনীয় একটা কবিতায় প্রকাশ করেছেন:
সর্বজ্ঞ ঈশ্বর কি পারেন, যিনি
ভবিষ্যত জানেন, তার
অসীম শক্তি দিয়ে
তার ভবিষ্যত মনকে বদলাতে?
ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার অসীম প্রক্রিয়া আর ঈশ্বরকে সেটি শেষ করার কারন হিসাবে ব্যবহার করার করার অসারতা প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বিষয়টা আরো অনেক মিতব্যায়ী হয়,যদি আমরা অন্য কিছু কল্পনা করে নেই , যেমন, একটি ’বিগ ব্যাঙ্গ সিঙ্গুলারিটি’ অথবা অন্য কোন ভৌত ধারনা যা এখনো আমাদের অজানা। একে ঈশ্বর বলে সম্বোধন করায় সবচেয়ে ভালো পরিনতি এর কোন উপযোগিতা এবং সবচেয়ে খারাপ পরিনতি হলো,একটি ক্ষতিকারক ছলনা। এডওয়ার্ড লিয়ার এর ’ক্রামববলিয়াস কাটলেট’ এর আবোলতাবোল অর্থহীন রেসিপি যেমন আমাদের আমন্ত্রন জানায়, ‘কয়েক টুকরো গরুর মাংশ যোগাড় করুন, এবার তাদের টুকরো টুকরো করে কাটুন, সবচে ক্ষুদ্রতম আকারের টুকরো করে, এরপর এদের আরো ছোট করে কাটার চেষ্টা করুন, আট কিংবা সম্ভব হলে আরো নয় বার’; কিছু পশ্চাদগমনশীল যুক্তি প্রক্রিয়া বা রিগ্রেস প্রাকৃতিকভাবেই একটি জায়গায় শেষ হয়। বিজ্ঞানীরা কল্পনা করেছিলেন, কি হতে পারে যদি আমরা খুবই ক্ষুদ্রতম টুকরো করে কাটতে পারি, ধরুন, এক টুকরো সোনার খন্ডকে, প্রথমে দুইভাগ, তারপর ক্রমাগত ভাবে আরো ক্ষুদ্রতম কোন সোনার খন্ডাংশে। এক্ষেত্রে রিগ্রেস অবশ্যই নি:সন্দেহে শেষ হবে অ্যাটম এ। সোনার টুকরা সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ এর নিউক্লিয়াস, যেখানে উনআশিটি প্রোটন আছে এবং এর চেয়ে কিছু বেশী সংখ্যক নিউট্রন আছে, যার চারপাশে ঘুরছে উনআশিটি ইলেক্ট্রন। কেউ যদি সোনাকে এর অ্যাটমের চেয়ে আরো ক্ষুদ্র অংশে কাটতে চান, সেখানে যা থাকবে, তা আর যাই হোক সোনা না। অ্যাটমই হচ্ছে ‘ক্রামববলিয়াস কাটলেট’ ধরনের কোন রিগ্রেস এর প্রাকৃতিক শেষ বিন্দু। সুতরাং এটি আদৌ স্পষ্ট না ঈশ্বর কিভাবে আকোয়াইনাসের প্রস্তাবিত রিগ্রেসের প্রাকৃতিক শেষ বিন্দু হতে পারে। সেটা হালকা ভাবে যদি বলি, আমরা পরে আরো বিস্তারিত দেখবো। আমরা বরং আকোয়াইনাসের তালিকায় ফিরে যাই।
৪.ডিগ্রী বা মাত্রা থেকে যুক্তি বা আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিগ্রী: আমরা লক্ষ্য করি যে পৃথিবী প্রতিটি জিনিসই ভিন্ন। আমরা জানি যে মাত্রা আছে সবকিছুরই, যেমন, ভালোত্ত্ব এবং উৎকর্ষতার। কিন্তু আমরা সেই মাত্রা পরিমাপ বা বিচার করি, এই বৈশিষ্টগুলোর সর্ব্বোচ্চ কোন একটি মাত্রাকে আদর্শ ধরে। মানুষ ভালো খারাপ দুটোই হতে পারে, সুতরাং চুড়ান্ত মাত্রার ভালোত্ত্ব মানুষের মধ্যে খুজে পাওয়া যায় না, সেকারনে নিশ্চয়ই কোন সর্ব্বোচ্চর অস্তিত্ব আছে যা উৎকর্ষতার একটি চুড়ান্ত মানদন্ড তৈরী করে, আমরা সেই চুড়ান্ত মানদন্ডকে বলছি ঈশ্বর।
এটা কি কোন যুক্তি হতে পারে? আপনি হয়তো বলতে পারেন, প্রত্যেকটা মানুষ তাদের গায়ের দুর্গন্ধের বিভিন্ন মাত্রা আছে, কিন্তু আমরা সেই মাত্রা মাপতে পারি, শুধু একটি নিখুত সর্ব্বোচ্চ মাত্রার দুগন্ধর একটি মানদন্ডের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে। সুতরাং নিশ্চয়ই কিছুর অস্তিত্ব আছে যা তুলনাহীনভাবে দুর্গন্ধযুক্ত এবং আমরা তাকে বলছি ঈশ্বর। অথবা যে কোন মাত্রার অন্যান্য বৈশিষ্ট ব্যবহার করুন না কেন, আপনি একই ভাবে এই ফাকা নির্বোধ কোন উপসংহারে পৌছাতে পারবেন।
৫. দি টেলিওলজিক্যাল বা পরমকারনবাদের যুক্তি বা ডিজাইন বা পরিকল্পনা থেকে যুক্তি বা আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন: এই পৃথিবীতে সবকিছু, বিশেষকরে জীবন আছে এমন সবকিছু, দেখলে দেখে মনে হয় যেন তাদের ডিজাইন বা পরিকল্পনা করে বানানো হয়েছে। কোন কিছুই কিন্তু আমাদের দেখে মনে হয় না ডিজা্ইন করা হয়েছে, যদি না তাদের আসলেই ডিজাইন করা হয়ে থাকে। সেকারনে অবশ্যই কোন ডিজাইনারের অস্তিত্ব আছে এবং আমরা তাকে বলি ঈশ্বর। আকোয়াইনাস নিজেই একটি তীরের নিশানার দিকে ধাবমান হবার অ্যানালোজী ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু আধুনিক হিট-সিকিং অ্যান্টি এয়ার ক্র্যাফট মিসাইলের বা তাপ-সন্ধানী বিমান ধ্বংশকারী ক্ষেপনাস্ত্র মনে হয় তার উদ্দেশ্যর সাথে বেশী যথাযুক্ত হতো।
এই ‘আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন’, তার এই একটি মাত্র যুক্তি যা আজো প্রায়ই ব্যবহৃত হচ্ছে। এবং অনেকের কাছে এটি চুড়ান্ত নকডাউন আর্গুমেন্ট বা তর্ক জয়কারী যুক্তি। তরুন চার্লস ডারউইনকেও একসময় এই যুক্তিটি আকর্ষন করেছিল, কেমব্রিজে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র থাকাকালীন তিনি যখন উইলিয়াম পেইলীর ন্যাচারাল থিওলজী বইটি পড়েছিলেন। পেইলীর জন্য দুর্ভাগ্য,কারন পরিণত ডারউইন তার যুক্তি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত বুদ্ধিমত্তাপুর্ণ যুক্তি দ্বারা কোন লোকপ্রিয় বিশ্বাসের এভাবে ভয়াবহ পরাজয়ের নজির আর নেই শুধু মাত্র চার্লস ডারউইনের ’আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন‘কে অযৌক্তিক প্রমান করে ধরাশায়ী করা ছাড়া। খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল ব্যাপারটা। ডারউইনের কল্যাণে, এই উক্তিটি আর সত্য নয়; কোন কিছুই কিন্তু আমাদের দেখে মনে হয় না ডিজা্ইন করা হয়েছে, যদি না তাদের আসলেই ডিজাইন করা হয়ে থাকে। । প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে অসাধারন ডিজাইন সমতুল্য উদহারন, কল্পনাতীত জটিলতা আর আভিজাত্য। এবং এই সব বিখ্যাত সিউডো ডিজাইন( বা আপাত দৃষ্টিতে ডিজাইন মনে হলে ডিজাইন না) তালিকায় আছে স্নায়ুতন্ত্র, বড় অর্জন বাদ দিয়ে, যার ছোটখাট কিছু অর্জনের মধ্যে আছে – গোল সিকিং ( কোন উদ্দেশ্য নির্ভর)আচরণ, যা এমনকি ক্ষুদ্রতম কীট বা ইনসেক্টদের মধ্যে, মনে হতে পারে সাধারন লক্ষ্যকে নিশানা করে যাওয়া তীর অপেক্ষা মনে হতে আরো উন্নত জটিল হিট সিকিং ক্ষেপনাস্ত্রের মত। ৪ র্থ অধ্যায়ে আমি আবারো এই আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইনে ফিরে আসবো।
(((((((((((((((((((((((((((((((((চলবে))))))))))))))))))))))))))))))))))))))










