জীনের ঠিকানা ডিএনএ তে …..
১৯৪৪ সালে রকফেলার ইন্সস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চের তিন বিজ্ঞানীর একটি টীম, দুইজন ক্যানাডীয় ওসওয়াল্ড অ্যাভরী, কলিন ম্যাকলয়েড এবং একজন অ্যামেরিকান ম্যাকলীন ম্যাককার্টি, প্রথম বারের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান করেন যে জেনেটিক তথ্য ( তখনকার ভোকাবুলারী যা পরিচিত ট্রান্সফর্মিং ফ্যাক্টর হিসাবে) বহন করে ডিএনএ। ১৯৩০ এবং ১৯৪০ এর দশকে তাদের এই ধারাবাহিক পরীক্ষাগুলো, যার ফলাফল তারা প্রকাশ করেন ১৯৪৪ সালে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে পরিচিত অ্যাভরী – ম্যাকলয়েড – মাককার্টি এক্সপেরিমেন্ট হিসাবে। এই পরীক্ষাটির নেতৃত্ব দেন ওসওয়াল্ড অ্যাভেরী।

ফ্রেডেরিক গ্রিফিথ
অ্যাভরীর এই গবেষনার পুর্বসুরী গবেষনাটা ছিল ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ প্যাথলজিষ্ট ফ্রেডেরিক গ্রিফিথ এর একটি এক্সপেরিমেন্ট। তিনি দেখেছিলেন যদি কোন ইদুরকে virulent বা ক্ষতি করতে সক্ষম Streptococcus pneumoniae ব্যাক্টেরিয়ার স্ট্রেইনকে নিষ্ক্রিয় করে, জীবিত কিন্তু কোন ক্ষতি করে না স্ট্রেইনের Streptococcus pneumoniae মিশ্রন করে ইনজেক্ট করা হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে ইদুরগুলোকে এই ব্যাক্টেরিয়া মেরে ফেলছে; গ্রিফিথ ব্যাক্টেরিয়ার এই জেনেটিক তথ্য আদান প্রদান ( যা নীরিহ ব্যাক্টেরিয়াকে ভয়ঙ্কর ব্যাক্টেরিয়াতে রুপান্তর করে) এর প্রক্রিয়াকে নাম দিলেন ট্রান্সফর্মেশন। সেই সময় বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল বংশগতির বৈশিষ্টগুলো বহন করে প্রোটিন। অ্যাভরীর টিম যখন ব্যাক্টেরিয়ার ডিএনএ বিশুদ্ধভাবে আলাদা করে প্রমান করেন গ্রিফিথের এই ট্রান্সফর্মেশনের জন্য দায়ী কোন প্রোটিন না বরং এর ডিএনএ, যা এর বংশগতির বৈশিষ্ট বহন করে। যুগান্তকারী এই গবেষনাটি প্রকাশ করা হয় Jounal of Experimental Medicine এ ১৯৪৪ সালে।

ওসওয়াল্ড থিওডোর অ্যাভরী
তাদের এই পরীক্ষা অন্য বিজ্ঞানী নিশ্চিৎ করলেও, ডিএনএ কে বংশগতির বাহক হিসাবে মেনে নিতে খুব একটা রাজী ছিলেন না কেউই। তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজ্ঞানীরা মনে করতেন ক্রোমোজোমের মধ্যে থাকা প্রোটিনই বংশগতির বাহক। অ্যাভরীর এই গবেষনাটা বেশীর ভাগ বৈজ্ঞানিক সমাজ সেই সময়ে গুরুত্ব দেয়নি। জেনেটিক্স রিসার্চে এটি কোন পরিবর্তনই আনতে পারেনি সেই সময়। ঐতিহাসিকরা মনে করেন এর একটা কারন হতে পারে তখনও জীনের রাসায়নিক গঠন নিয়ে সেভাবে কাজ শুরু হয়নি, ক্ল্যাসিক্যাল জেনেটিক্স জিনের আচরণ নিয়েই মুলত: ব্যস্ত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে আলফ্রেড হারশী ব্যাকটেরিওফাজ নিয়ে গবেষনা করে আবার প্রমান করেন ডিএনএ এর গুরুত্ব। অ্যাভরীর যেমন কোন বিজ্ঞানীদের মধ্যে নেটওয়ার্ক ছিলনা আলফ্রেড হারশীর ছিল বিশাল নেটওয়ার্ক, আর কোন বড় চ্যালেন্জ ছাড়াই ডিএনএ গবেষনা জগতে তার যোগ্য আসনটি পায়।

কলিন মানরো ম্যাকলয়েড

ম্যাকলীন ম্যাককার্টি
বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে অ্যাভেরীর পরীক্ষাকে মুল্যায়ন করেছেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। যেমন দীর্ঘদিন ধরে মেন্ডেলের গবেষনা কারো নজরে আসেনি, অ্যাভরীর গবেষনার ভাগ্যেও সেটা জোটে। অনেকেরই মতে অ্যাভরীর এই পরীক্ষা মলিকিউলার জেনেটিক্স এর সুচনা করেছিল। অ্যাভরীর গবেষনা নোবেল ফাউন্ডেশনও উপেক্ষা করেছিল, পরবর্তীতে ফাউন্ডেশনটি জনসমক্ষে এর জন্য আক্ষেপ করেছিল। আরেক নোবেল বিজয়ী আর্ন তিসেলিয়াস এর মতে Avery was the most deserving scientist not to receive the Nobel Prize for his work, পরবর্তীতে বিখ্যাত জীনবিজ্ঞানী জশুয়া লেডেরবার্গ বলেন, The work of Avery and the members of his team at the Rockefeller Institute ( was ) the historical platform of modern DNA research (and) betokened the molecular revolution in genetics and biomedical science generally.”
ওসওয়াল্ড থিওডোর অ্যাভরী যখন ১৯৪৪ সালে তার ১৫ বছরের গবেষনাটি প্রকাশ করেন তার বয়স ছিল ৬৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি থাইরয়েডের অসুখে অসুস্থ্য ছিলেন। শেষ জীবনে টেনেসীতে তার ভাইয়ের বাসার পাশে বাসা ভাড়া করে থাকতেন। চিরকুমার খুবই অর্ন্তমুখী ক্যানাডায় জন্ম নেয়া এই বিজ্ঞানী ৭৭ বছর বয়সে ১৯৫৫ সালে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ।










